পিকে হালদারের মাসহ ২৫ নাগরিকের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা

সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা পাচার করে কানাডায় পালিয়ে থাকা প্রশান্ত কুমার হালদারের (পি.কে) সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে ২৫ নাগরিকের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে হাইকোর্ট।

এ আদেশ বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে ইমিগ্রেশন পুলিশসহ সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে বলা হয়েছে। এ সংক্রান্ত আবেদনের প্রেক্ষিতে বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদার ও বিচারপতি আহমেদ সোহেলের হাইকোর্ট বেঞ্চ গতকাল মঙ্গলবার এ আদেশ দেন। প্রয়োজনে তদন্তের স্বার্থে যে কোন সময় এসব নাগরিকদের জিজ্ঞাসাবাদ করতে দুদককে বলা হয়েছে। আদালত বলেন, কারো প্রতি আমাদের ইতিবাচক বা নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি নাই। সবাই আমাদের কাছে সমান। মামলার নথিপত্রে যে তথ্য-উপাত্ত আসবে সেভাবেই আমরা বিচার কাজ পরিচালনা করব। 

হাইকোর্টের আদেশে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর এসকে সুর চৌধুরী, হারুনুর রশিদ, উজ্জ্বল কুমার নন্দী, সামি হুদা, অমিতাভ অধিকারী, অবন্তিকা বড়াল, শামীমা (আইএলএফএসএল), রুনাই (আইএলএফএসএল), ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের সাবেক চেয়ারম্যান এন আই খান, সুকুমার মৃধা (ইনকাম ট্যাক্স আইনজীবী), অনিন্দিতা মৃধা, তপন দে, স্বপন কুমার মিস্ত্রি, অভিজিৎ চৌধুরী, রাজিব সোম, ব্যাংক এশিয়ার সাবেক পরিচালক ইরফান উদ্দিন আহমেদ, অঙ্গন মোহন রায়, নংঙ্গো চৌ মং, নিজামুল আহসান, মানিক লাল সমাদ্দার, সোহেল সামস, মাহবুব মুসা, এ কিউ সিদ্দিকী, মোয়াজ্জেম হোসেন ও পিকে হালদারের মা লিলাবতী হালদারের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। এদিকে পিকে হালদারের বিরুদ্ধে রেড অ্যালার্ট জারি করতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট শাখা হতে প্রয়োজনীয় নথি ইন্টারপোলের সদর দপ্তরে পাঠানো হয়েছে বলে আদালতকে অবহিত করেছে রাষ্ট্রপক্ষ। 

পিপলস লিজিং থেকে শতশত কোটি টাকা বেহাতের সঙ্গে জড়িত পিকে হালদার ও তার  ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা চেয়ে হাইকোর্টে আবেদন করেন পাঁচ আমানতকারী। পিপলস লিজিংয়ে অর্থ আমানত রেখে এখন ফেরত না পেয়ে তারা দুর্বিষহ জীবনযাপন করছেন। সেই জীবনযাপনের বর্ণনা এফিডেভিট আকারে হাইকোর্টে দাখিল করে উক্ত নির্দেশনা চান সাবেক প্রধান বিচারপতি মোস্তফা কামালের মেয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক নাশিদ কামালসহ পাঁচ আমানতকারী। ঐ আবেদনের উপর শুনানি করেন দুদক কৌসুলি খুরশীদ আলম খান, রাষ্ট্রপক্ষে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল একেএম আমিন উদ্দিন মানিক ও দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা পাওয়া উজ্জ্বল কুমার নন্দী ও অমিতাভ অধিকারীর পক্ষে মো. মোশাররফ হোসেন ও হারুন-অর রশিদ। 

শুনানিতে দুদক কৌসুলি বলেন, গত ২৮ ডিসেম্বর পিকে হালদারের ঘনিষ্ঠ অবন্তিকা বড়ালকে দুদকে হাজির হতে বলা হয়। কিন্তু তিনি হাজির হননি। এখন তাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এই অবন্তিকা যদি সৎ হতেন তাহলে দুদকে হাজির হয়ে বক্তব্য দিতেন। তিনি বলেন, যেদিন দুদকে অবন্তিকাকে হাজির হতে বলা হয়েছে সেদিনই পিকে হালদার বেসরকারি একাত্তর টিভিতে হাজির হয়ে নিজের পক্ষে সাফাই গায়। দুদক সোমবার অঙ্গন মোহনকে গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে নিয়েছে। এ পর্যায়ে আদালত বলেন, কতজনকে এ পর্যন্ত নোটিশ দিয়েছেন। দুদক কৌসুলি বলেন, অনেককেই দেওয়া হয়েছে। এদের জিজ্ঞাসাবাদ করলে অনেক কিছুই বেরিয়ে আসতে পারে। এজন্য দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দরকার। আদালত বলেন, পিকে হালদারের নামে কিকি প্রতিষ্ঠান রয়েছে এবং এগুলোর মধ্যে কোনগুলো নাম সর্বস্ব সেগুলোর তালিকাও আদালতে দিন। আর বিদেশে কে পালিয়ে গিয়েছে? 

দুদক কৌসুলি বলেন, পিকে হালদার ও তার ভাই প্রীতিশ কুমার হালদার। ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল আমিন উদ্দিন মানিক বলেন, বিদেশে যাতে আর কেউ পালিয়ে যেতে না পারেন সেজন্য ঐ তালিকা অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া দরকার। উজ্জ্বল কুমার নন্দীর আইনজীবী মোশাররফ হোসেন বলেন, দুর্নীতির সংশ্লিষ্টতা পেলে দুদক যে কাউকে ডাকতে পারে। তবে আমার মক্কেল একবার দুদকে হাজির হয়েছেন। এখন পর্যন্ত কিছু পাওয়া যায় নি। পিকে হালদারের জন্য এতগুলো মানুষ কষ্ট করবে সেটা হতে পারে না। তার সঙ্গে কাদের সম্পৃক্ততা আছে তাদের ব্যাপারে আমাদের কোন অনুকম্পা নাই। আদালত বলেন, যারা ভিকটিম (আমানতকারী) তাদের আবেদনগুলো নিষ্পত্তি করতে চাই। মোশাররফ হোসেন বলেন, আমানতকারীদের টাকাগুলো ফেরত পাওয়া জরুরি। তারা অনেক কষ্টে আছেন। তবে আমানতকারীদের আবেদনের প্রেক্ষিতে যদি দুদককে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দেওয়া হয় তাহলে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে। আর আমার মক্কেলকে যেন হয়রানি করা না হয় সেটা আদেশে উল্লেখ করে দিন। দুদক কৌসুলি বলেন, উজ্জ্বল কুমার ও অমিতাভ অধিকারী এই মামলায় পক্ষভুক্ত হয়েছে বিচারকে বাধাগ্রস্থ করার জন্যই। তারা তদন্তকে বাধাগ্রস্থ করার চেষ্টা করছেন। 

ডিএজি বলেন, হয়রানি বলতে উনি কি বোঝাচ্ছেন। দুর্নীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকলে যে কোন সময় গ্রেপ্তার করবে দুদক। মোশাররফ হোসেন বলেন, আমার ঘাড়ে কয়টা মাথা আমি দুদকের তদন্তকে বাধাগ্রস্থ করব। 

আদালত বলেন, এদেরকে অভিযুক্ত করা হচ্ছে না। তদন্তের স্বার্থে দুদক ডাকতেই পারে। আপনাদের ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ার কোন সুযোগ নাই। এরপরই হাইকোর্ট দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞার আদেশ দেয়। 

ইত্তেফাক/এমএএম