কী নিষ্ঠুর এই পৃথিবী!

কোভিড-১৯ বিশ্ব মহামারি হিসাবে দেখা দিবার পর হইতে বিশ্ব জুড়িয়া বিভিন্ন পরীক্ষাগারে ইহার ভ্যাকসিন বা টিকা তৈরির প্রতিযোগিতা শুরু হয়। ইতিমধ্যে মানবদেহে কয়েকটি টিকার প্রয়োগ শুরু হইতেই কে কাহার পূর্বে টিকা পাইবে তাহা লইয়াও শুরু হইয়া গিয়াছে প্রতিযোগিতা। এই প্রতিযোগিতায় স্বাভাবিকভাবেই আগাইয়া আছে ধনী দেশগুলি। আর ইহার বিপরীতে গরিব দেশগুলি কেবল চাতকের মতো চাহিয়া আছে। করোনা টিকার জন্য তাহাদের অপেক্ষার অবসান কখন হইবে তাহা কেহ জানেন না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গত ২৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী সারা বিশ্বে এখন করোনার ২৩২টি টিকা লইয়া কাজ চলিতেছে। তন্মধ্যে ৬০টি টিকা মানবদেহে পরীক্ষার বিভিন্ন ধাপে রহিয়াছে। তবে বর্তমানে আলোচনায় রহিয়াছে ছয়টি টিকা। এই টিকাগুলি হইল—যুক্তরাষ্ট্রের ঔষধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ফাইজার ও মডার্নার দুইটি টিকা, যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও ঔষধ প্রতিষ্ঠান অ্যাস্ট্রাজেনেকার যৌথভাবে উদ্ভাবিত টিকা, রাশিয়ার গামালেয়া রিসার্চ ইনস্টিটিউটের উদ্ভাবিত টিকা স্পুতনিক-ভি এবং চীনের সিনোভ্যাক ও সিনোফার্মের টিকা। ভারত বায়োটেকের উদ্ভাবিত টিকাও আছে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।

আলোচনায় যতই থাকুক, বিশ্বের অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলিকে করোনা ভ্যাকসিনের জন্য শেষ পর্যন্ত অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় থাকিতে হইবে। প্রথমত, এই দেশগুলি নিজেরা টিকা আবিষ্কারে সক্ষম নহে। দ্বিতীয়ত, টিকা ক্রয়ের জন্য অনেকের পর্যাপ্ত অর্থও নাই। কিংবা অর্থ থাকিলেও উত্পাদনস্বল্পতার কারণে তাহারা চাহিদা অনুযায়ী টিকা পাইবে না। কেননা টিকা আবিষ্কারের পূর্বেই অনেক ধনী ও উন্নত দেশ টিকার জন্য অগ্রিম অর্থ দিয়া রাখিয়াছে। এই জন্য করিয়াছে চুক্তিও। এখানে অভিযোগ উঠিয়াছে যে, ধনী দেশগুলি টিকা ক্রয় করিয়া হুমকিতে ফেলিয়াছে দরিদ্র দেশগুলিকে। পিপলস ভ্যাকসিন অ্যালায়েন্স নামের একটি জোট সম্প্রতি জানাইয়াছে যে, ধনী দেশগুলির মোট জনসংখ্যা বিশ্বের মোট জনসংখ্যার মাত্র ১৪ শতাংশ। অথচ তাহারা টিকা কিনিয়াছে মোট চাহিদার ৫৩ শতাংশ। ফলে নিম্ন আয়ের দেশগুলিতে টিকা লইয়া মারাত্মক সংকট ও বিশৃঙ্খলা দেখা দিবে। যুক্তরাষ্ট্রের ডিউক ইউনিভার্সিটির ডিউক গ্লোবাল হেলথ ইনোভেশন সেন্টারের হিসাব মতে, বিশ্ব জুড়িয়া বিভিন্ন দেশ ও সংস্থা এই পর্যন্ত ৭২৫ কোটি ডোজ টিকা আগাম ক্রয় করিয়া রাখিয়াছে। ইহার মধ্যে রহিয়াছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, যুক্তরাজ্য, জাপান ও ব্রাজিলের নাম। অবশ্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কোভ্যাক্স কর্মসূচির আওতায় ২০০ কোটি ডোজ টিকা সংগ্রহ করিতেছে। এই টিকা সমহারে বণ্টনের উদ্যোগ লইতে হইবে।

বিশ্ব মহামারি করোনা প্রথম হইতেই মানুষকে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখাসহ এমন সকল শিক্ষা দিয়া আসিতেছে যাহা মানুষকে করিয়া তুলিতেছে স্বার্থপর ও আত্মকেন্দ্রিক। বিশ্বপরিমণ্ডলেও তাহার নেতিবাচক প্রভাব লক্ষণীয়। সকলে নিজেকে লইয়াই এখন ব্যস্ত। ‘চাচা আপন প্রাণ বাঁচা’ বা ‘আপনি বাঁচিলে পরের নাম’—এমন প্রবাদবাক্যই হইয়া উঠিয়াছে আজিকার মূলমন্ত্র। ফলে গরিব দেশগুলির প্রতি উন্নত দেশগুলির ফিরিয়া তাকাইবার সময় নাই। কী নিষ্ঠুর ও নির্মম পৃথিবীতে আমরা বসবাস করিতেছি! গরিব দেশগুলির ভাগে কিছু হইলেও টিকা দেওয়া দরকার। টিকা উত্পাদনকারী প্রতিষ্ঠান ও দেশগুলিকে মানবতার খাতিরে এই বিষয়টি অবশ্যই ভাবিয়া দেখিতে হইবে। যেই সকল টিকার ব্যবহার শুরু হইয়াছে তাহাও যে ১০০ ভাগ কার্যকর তাহা নহে। বলা হইতেছে, কোনো কোনো টিকায় অ্যালার্জিসহ বিভিন্ন সাইড অ্যাফেক্ট বা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। তাহার পরও করোনা টিকার জন্য আমরা মরিয়া হইয়া উঠিয়াছি। তবে টিকা সংগ্রহ ও প্রয়োগে সর্বাত্মক চেষ্টার পাশাপাশি করোনা প্রতিরোধে স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ ও সচেতনতার বিষয়টি পূর্বের মতোই অব্যাহত রাখিতে হইবে।