ভ্যাকসিন কিনতে আরো ৫৬৫৯ কোটি টাকা বরাদ্দ

করোনা ভাইরাসের টিকা আমদানির জন্য আরো ৫ হাজার ৬৫৯ কোটি ৭ লাখ টাকা বরাদ্দ দিয়ে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় ‘কোভিড-১৯ রেসপন্স অ্যান্ড প্যানডেমিক প্রিপেয়ার্ডনেস’ প্রকল্পের সংশোধনী অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এর ফলে প্রকল্পটির মোট বরাদ্দ দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ৭৮৬ কোটি ৫৯ লাখ টাকা। গতকাল মঙ্গলবার গণভবন থেকে ভার্চুয়াল পদ্ধতিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে একনেক বৈঠকে এই সংশোধনী অনুমোদন দেওয়া হয়।

শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলনকক্ষে অনুষ্ঠিত বৈঠক শেষে সংবাদ সম্মেলনে পরিকল্পনমন্ত্রী এম এ মান্নান বলেন, গত এপ্রিল মাসে করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় জরুরি ভিত্তিতে ১ হাজার ১২৭ কোটি ৫২ লাখ টাকায় প্রকল্পটি অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। সে সময় মাত্র দুই দিনের মধ্যে জরুরিভাবে প্রকল্পটি একনেক সভায় নিয়ে আসা হয়েছিল। গতকালের সভায় টিকা আমদানি, রক্ষণাবেক্ষণসহ অন্যান্য কাজের জন্য অতিরিক্ত ৫ হাজার ৬৫৯ কোটি টাকা বাড়িয়ে সংশোধন করা হলো। গত বছরের এপ্রিলে শুরু হওয়া প্রকল্পটির মেয়াদ ধরা হয়েছে ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত। এই অতিরিক্ত অর্থায়নের জন্য বিশ্বব্যাংক ৫০ কোটি ডলার (৪ হাজার ২৫০ কোটি টাকা) এবং এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (এআইআইবি) ১০ কোটি ডলার (৮৫০ কোটি টাকা) দেবে। আর সরকার নিজস্ব তহবিল থেকে ১৭২ কোটি টাকার জোগান দেবে।

সভায় জানানো হয়েছে, শুধু ভ্যাকসিন সংগ্রহে খরচ হবে ৪ হাজার ২৩৬ কোটি ৪২ লাখ টাকা। বাকি টাকা সংরক্ষণ ও প্রয়োগসহ প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়াতে ব্যবহার করা হবে। বাড়তি বরাদ্দের মাধ্যমে ২৭টি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পিসিআর মেশিনসহ আধুনিক মাইক্রোবায়োলজি ল্যব স্থাপন এবং আরটি-পিসিআর কিট, এন্টিজেন কিট ও স্বাস্থ্য সুরক্ষাসামগ্রী ক্রয় করা হবে। সেই সঙ্গে রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর) এবং বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ট্রপিক্যাল অ্যান্ড ইনফেকসাস ডিজিজেস (বিআইটিআইডি) চটগ্রামে আধুনিক ল্যাব স্থাপন করা হবে। ৪৩টি জেলা সদর হাসপাতালে ২০ শয্যাবিশিষ্ট আইসোলেশন ইউনিট স্থাপন, ১০টি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ১০ শয্যাবিশিষ্ট ক্রিটিক্যাল কেয়ার ইউনিট (আইসিইউ), ঢাকা ও চট্টগ্রাম সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে পাঁচ শয্যার ক্রিটিক্যাল কেয়ার ইউনিট স্থাপন ছাড়াও দেশের পাঁচটি পোর্ট অব এন্ট্রিতে (বিমান ও স্থলবন্দর) মোট সাতটি মেডিক্যাল স্ক্রিনিং ইউনিট স্থাপন করা হবে। প্রকল্পটির আওতায় ৬৪টি সিভিল সার্জন অফিসে রোগতত্ত্ব ইউনিট স্থাপন, ২৭টি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ইনফেকশন ডিজিজ ইউনিট স্থাপন করা হবে। ৬২টি জেলা হাসপাতালে ইনফেকশন প্রিভেনশন অ্যান্ড কন্ট্রোল ইউনিট স্থাপন করা হবে। এছাড়া ৩০টি সরকারি হাসপাতালে সেন্ট্রাল তরল মেডিক্যাল অক্সিজেন সিস্টেম স্থাপন ছাড়াও স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো হবে।

এক প্রশ্নের উত্তরে পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘চুক্তি অনুযায়ী টিকা পাওয়া যাবে। আমরা আশা করছি এবং বিশ্বাস করি, ভ্যাকসিন আমরা পাব।’ সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্যসেবা সচিব মো. আব্দুল মান্নানের কাছে টিকা ক্রয়ের চুক্তির বিষয়ে সাংবাদিকেরা প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, ‘ভ্যাকসিন আনার প্রক্রিয়া যা-ই হোক না কেন, আমরা সময়মতো তা পাব।’ পরিকল্পনা কমিশনের আর্থসামাজিক অবকাঠামো বিভাগের সদস্য আবুল কালাম আজাদ অনুমোদন পাওয়া এই প্রকল্পের বিভিন্ন তথ্য তুলে ধরে বলেন, দেশে ১৮ বছরের বেশি বয়সি ১৩ কোটি ৭৬ লাখ মানুষকে টিকার আওতায় আনা হবে। এর অংশ হিসেবে প্রাথমিকভাবে ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউট থেকে ৩ কোটি ডোজ টিকা আমদানি করা হচ্ছে। মহামারির অগ্রাধিকার বিচারে স্বাস্থ্যকর্মী, শ্রমঘন এলাকা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, গণমাধ্যমকর্মীসহ সবাইকে পর্যাক্রমে এই টিকার আওতায় আনা হবে।

একনেক সভায় তিনটি সংশোধিত ও তিনটি নতুন প্রকল্প অনুমেদান দেওয়া হয়েছে। সংশোধিত প্রকল্পে বাড়তি বরাদ্দ এবং নতুন প্রকল্পের বরদ্দ মিলিয়ে ব্যয় ধরা হয়েছে ৯ হাজার ৫৬৯ কোটি ২৩ লাখ টাকা। অনুমোদিত অন্য প্রকল্পগুলো হলো—১ হাজার ১০৩ কোটি টাকা ব্যয়ে জেলা পর্যায়ে আধুনিক তথ্য কমপ্লেক্স নির্মাণ (প্রথম পর্যায়) প্রকল্প, ১৫৭ কোটি ৮৮ লাখ টাকা ব্যয়ে সুন্দরবন সুরক্ষা প্রকল্প, ২ হাজার ২৭৯ কোটি ৯৯ লাখ টাকা ব্যয়ে ভূমিকম্প ও অন্যান্য দুর্যোগকালে অনুসন্ধান, উদ্ধার অভিযান পরিচালনা এবং জরুরি যোগাযোগের জন্য যন্ত্রপাতি সংগ্রহ (তৃতীয় পর্যায়) প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এছাড়া জেলা মহাসড়কসমূহ যথাযথ মান ও প্রশস্ততায় উন্নীতকরণ (সিলেট জোট) প্রকল্পটির ব্যয় ১২২ কোটি ৮২ লাখ টাকা বাড়িয়ে প্রথম সংশোধনী অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এর মূল ব্যয় ধরা ছিল ৫৩৯ কোটি ৩০ লাখ টাকা। এছাড়া চিটাগাং সিটি আউটার রিং রোড প্রকল্পের তৃতীয় সংশোধনী অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এর ফলে দ্বিতীয় সংশোধনী থেকে ব্যয় বেড়েছে ২৪৯ কোটি ৮১ লাখ টাকা।

প্রকল্পের মেয়াদ বারবার বাড়ায় ক্ষুব্ধ প্রধানমন্ত্রী

একনেক সভায় কুষ্টিয়া মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল স্থাপন প্রকল্পের দ্বিতীয় সংশোধিত প্রস্তাব উপস্থাপন করা হলে প্রধানমন্ত্রী ঐ প্রকল্পের মেয়াদ বারবার বাড়ানোর কারণে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বিষয়টি তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। এ বিষয়ে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান সাংবাদিকদের বলেন, ‘প্রায় ১১ বছর ধরে প্রকল্পটি চলছে, কিন্তু শেষ হচ্ছে না। প্রকল্পের অগ্রগতিতে প্রধানমন্ত্রী অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন, এটা গ্রহণযোগ্য নয়। এ ধরনের প্রকল্প আমরা গ্রহণ করব না। প্রধানমন্ত্রী প্রকল্পটির বিষয়ে বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) দিয়ে তাত্ক্ষণিক তদন্ত করতে নির্দেশনা দিয়েছেন। এর পাশাপাশি আর্থিক ও অন্যান্য বিষয় সরকারি অন্যান্য সংস্থা দিয়ে তদন্ত করতে বলেছেন।’