বই

রাবেয়া খাতুনের সুমন ও মিঠুর গল্প

আশৈশব যাঁদের লেখা পড়ে আসছি তাঁদের একজন রাবেয়া খাতুন। গল্প-উপন্যাস এবং কিশোর সাহিত্য—অজস্র তাঁর রচনা। খুব কম নারী লেখকই তাঁর মতো পূর্ণ লেখক হয়ে উঠেছেন। প্রকৃত লেখকের যা কর্ম তিনি তাই সম্পাদন করেছেন।

রাবেয়া খাতুনের প্রথম বই ‘মধুমতী’ প্রকাশিত হয়েছে সেই ষাট দশকে। প্রায় ষাট বছর আগে। তাঁর লেখা পড়তে পড়তে অনেক কিশোর এখন বৃদ্ধ হয়ে গেছেন। এমন বিরল ও দীর্ঘকালীন লেখক খুব বেশি পাওয়া যায় না। আমার পরম সৌভাগ্য যে, লেখক রাবেয়া খাতুনের সঙ্গে অনেক নিবিড়, আন্তরিক, সৌহার্দ্যপূর্ণ সময় কাটিয়েছি। একসময় রাবেয়া খাতুনের সঙ্গে প্রায়ই কলকাতা যেতাম। ভালো সিনেমা দেখতাম। হোটেলের স্যুটে বা সুইমিং পুলের ধারে বসে দীর্ঘ আড্ডা দিয়েছি। রাবেয়া খাতুনের সঙ্গে ব্যাংককে গেছি একবার। শপিং-এ গেছি। তারপর এক কফি শপে। তখন তিনি তার প্রেমের কিছু গল্প বললেন। কোন কোন বিখ্যাত লেখক কিভাবে তাঁর প্রতি দুর্বল হয়ে পড়েছিল সেই গল্প। আমি মুগ্ধ শ্রোতার মতো তা শুনছিলাম।

এই জীবনে রাবেয়া খাতুনের সঙ্গে অনেক কাজ করেছি। তাঁর স্বামী ফজলুল হক স্মরণে ‘ফজলুল হক স্মৃতি পুরস্কার’ প্রবর্তন, প্রতি বছর তাঁর জন্মদিন উপলক্ষ্যে বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন (যদিও তিনি তা করতে দিতে চাননি), তাঁর গ্রন্থ প্রকাশ, তাঁর লেখালেখি—এসবের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছি আমি। তাঁর অনেক ভালো উপন্যাস হয়তো পাঠকদের সচেতন চোখের আড়ালে রয়ে গেছে। এ প্রসঙ্গে রাবেয়া খাতুন বলেন, সবার মনের গঠন এক রকম নয়। সবাই সবকিছু বুঝে উঠতে পারে না। তুমি যে ‘শঙ্খ সকাল প্রকৃতি’ পড়ে মুগ্ধ হয়েছ, ওটা সিরিয়াস লেখা। সবার ভালো লাগবে না।

দুই.

রাবেয়া খাতুন ছোটদের জন্য খুব বেশি লেখেননি। ষাট দশকে একটা বিখ্যাত কিশোর-উপন্যাস লিখেছিলেন। নাম ‘দুঃসাহসিক অতিথি’। এই কাহিনি নিয়ে আমাদের দেশের প্রথম শিশু চলচ্চিত্র নির্মাণ হয়। নাম ভূমিকায় অভিনয় করেন ফরিদুর রেজা সাগর ও কেকা ফেরদৌসী। দুঃসাহসিক অভিযানের অনেক ধরনের প্রকাশনা আছে।

রাবেয়া খাতুনের আরেকটি বই—একসময় খুব আলোচিত হয়। বইটির নাম ‘সুমন ও মিঠুর গল্প’। শিশু একাডেমি থেকে প্রকাশিত। ছবি এঁকেছিলেন শিল্পী হাশেম খান। ডাবল ক্রাউন সাইজে ছাপা প্রথম সংস্করণের ছবি এখনো চোখে লেগে আছে।

সুমন ও মিঠু দুই ভাইবোনের গল্প। সুমনের নতুন মা অর্থাত্ মিঠুর মা। গ্রামের পটভূমিতে তাদের বেড়ে ওঠা। শীতকাল, বর্ষাকাল, সুমনের দুরন্তপনা, হারিকেন জ্বালিয়ে লেখাপড়া, সর্ষে তেলে মুড়ি মাখানো, বন্ধু পিকলুর ভালোবাসা, শহরে মধুর আদর, সামাদ স্যার, অঙ্ক পড়া, বনে বাদাড়ে জঙ্গলে পালিয়ে যাওয়া— এইসব নানা টুকরো টুকরো ছবির মধ্যে দিয়ে লেখক জীবনের গল্প শুনিয়েছেন আমাদের। কাহিনির মধ্যে নাটকীয়তা আছে। শুরুতেই সুমন কিভাবে হারিয়ে গেল—তারই গল্প। সুমনের মায়ের মৃত্যুদৃশ্যটাও বড় করুণ ও দরদি।

নতুন মায়ের আগমনে মন খারাপ হয়ে যায় আমাদের। কিন্তু নতুন মায়ের সঙ্গে সুমনের ভালোই সম্পর্ক। পরীক্ষার ফল ভালো করলে নতুন মা পীরের দরগায় শিন্নি মানত করেন।

সুমন ও মিঠুর মধ্যে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মধুর ও আনন্দময় ভাইবোনের সম্পর্ক ভারী হতে থাকে। দুজনের সম্পর্ক গাঢ় হতে থাকে। সুমনের কঠিন অসুখ করে। মিঠু খুব চিন্তিত—দাদা তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে ওঠো। আমরা আবার একসাথে খেলবো। ঘুরে বেড়াবো।

শেষ দৃশ্যে পিকলুর আগমন। পরীক্ষার ফল ঘোষণা হয়েছে। সুমন প্রথম স্থান অধিকার করেছে। অত্যন্ত মানবিক একটি গল্প।

গল্পের মধ্যে প্রচ্ছন্নভাবে ‘MORAL’ আছে। মানবিক সম্পর্কের মাহাত্ম্য বর্ণনা করা হয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা—বইটিতে বাংলাদেশ আছে। খুব সাবলীল বর্ণনায় গ্রামের জীবনকে তুলে এনেছেন লেখক।

বলতে লজ্জা নেই—আমাদের শিশুসাহিত্যে ধার করা গল্প বেশি লিখিত হয়েছে। ভূতের গল্প, ফ্যান্টাসি, অভিযান কাহিনি—কোনোকিছুর সঙ্গে আমাদের বহমান জীবনের কোনো সম্পর্ক নাই।

আমাদের জীবন, পরিপার্শ্ব, মানুষ—সব লেখাতেই মূর্ত হয়ে ওঠে। রাবেয়া খাতুন বড় লেখক। তিনি জানেন, মহত্ রচনা মানে স্বদেশকে তুলে ধরা।

‘সমুন ও মিঠুর গল্প’ কৈশোরে পড়া আমার প্রিয় একটা বই। খুব মুগ্ধ হয়েছিলাম। সুমন ও মিঠুকে মনে হয়েছিল আমারও আপন ভাইবোন। আমিও সুমন হবো। আহা মিঠুর মতো আমার যদি কোনো বোন থাকত!

ছোটদের ভালো বইয়ের এখানেই সফলতা। বইটি নিজের ছেলেবেলার সঙ্গে প্রতিবিম্মিত হয়। ‘সুমন ও মিঠুর গল্প’ আমাদের সাহিত্যের ক্ল্যাসিক। ইচ্ছা হয়, এমন দরদি বইকে বুকের মধ্যে সারা জীবন আগলে রাখি।