আরশিনগর

উত্তরণের উদ্ভাসিত হাসি

মেঘ কেটে গেছে, শীতের বাড়তি চাপ নেই, ঝলমলে রোদ চারদিকে হাসছে, উষ্ণতায় তনুমন আচ্ছন্ন, করোনা পালাচ্ছে, মৃত্যু, ক্ষয় আর উদ্বেগের অবসান আসন্ন, দুয়ারে মহামারির প্রতিষেধক, রাস্তায় ফিরছে সতর্ক তারুণ্য। নতুন বছরে এর চেয়ে বড়ো সুসংবাদ আর কী হতে পারে? দিন কয়েক আগে, কলকাতায় ‘নবজাগরণ’-এর সভায় স্বাস্থ্য কমিশনের সভাপতি অসীম মুখোপাধ্যায় বলেছেন, করোনা রোখার সংগ্রামে বঙ্গ সম্ভবত দেশের শীর্ষে। ভুল বলেননি। সর্বশেষ তথ্য—গত ২৪ ঘণ্টায় বাংলা জুড়ে নতুন আক্রান্তের সংখ্যা ৮৯৬। মৃত ২৬। অসুস্থ ছিলেন ৫ লাখ ৯৪ হাজারের একটু বেশি। এখন সুস্থ ৫ লাখ ৩৪ হাজারের বেশি। অ্যাকটিভ রোগী ১০ হাজার। প্রশ্নাতীত সাফল্য। এর পরিধি শুধু স্বাস্থ্য পরিষেবা, রোগ নির্ণয় আর নিরাময়ে সীমাবদ্ধ নয়। বহু ক্ষেত্রে বঙ্গ আজ এগিয়ে। কেন্দ্র-রাজ্যের সম্পর্কের জটিলতার চিত্র যা-ই হোক না কেন, কেন্দ্রীয় তথ্যই বলে দিচ্ছে যে এক. ১০০ দিনের কাজে, গ্রামীণ গৃহ যোজনায়, নব নব রাস্তার নির্মাণ ও পুরোনোর সংস্কারে, সংখ্যালঘু ছাত্রছাত্রীদের বৃত্তিদানে পশ্চিম বাংলা এক নম্বর। দুই. দারিদ্র্য দূরীকরণ, ই-টেন্ডারিং, ই-গরভারনেনসিও সে শীর্ষে। (করোনাকালে ভারতের প্রায় সব প্রান্তে জিএসডিপির (গ্রস ডেমোস্টিক প্রোডাক্টের হার কমেছে) বাংলায় কমেনি, বেড়ে দাঁড়াল ৭.২৬ শতাংশ। শিল্প উত্পাদনের পরিসরেও, গ্রস ভ্যালু অ্যাডেডের (জিডিএ) মাপকাঠিতে রাজ্যের বৃদ্ধি শতকরা ৭.৩৩। শিল্প চত্বরে সুবাতাসের সুসংবাদ, বাড়ল ৫.৭৯ শতাংশ। তিন. গণপরিষেবার অঙ্গনে জাতীয় গড় যেখানে ৫.৫৫ শতাংশ, বাংলায় তা শতকরা ৯.২৬। কৃষিক্ষেত্রে ভারতের বৃদ্ধি ৪.৩৫ বঙ্গে ৪.৭৪। এসব তথ্য বানানো সত্য নয়। অতিরঞ্জন নয়। কেন্দ্রের সমীক্ষাই সাফল্যের গল্প বলছে। আর এ কারণেই বিশ্বাস জাগছে, বঙ্গীয় সমতট পিছিয়ে থাকার রটনা থেকে মুক্ত হতে চাইছে।

বাংলাদেশের অবিশ্বাস্য সাফল্যের কাহিনি এখন বিশ্বের বিস্ময়। এর স্থপতি বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন। প্রধান কারিগর শেখ হাসিনা। স্বাধীন বাংলার লড়াই, সফলতা, দারিদ্র্য বিনাশের দক্ষতা, মহিলাদের ক্ষমতায়ন, কৃষিবৃদ্ধির পাশাপাশি শিল্পবৃদ্ধিতে কেউ কেউ পরশ্রীকাতর হতে পারে—কিন্তু সত্যকে মিথ্যা দিয়ে, রটনা দিয়ে ঢেকে রাখা যায় না, তার নিকটতম সেরা উদাহরণ উন্নয়নের সড়কে স্বাধীন বাংলার তলাময়তার বিস্তার। এর কারণ কী? নেতৃত্বের দৃঢ়তা আর ঐক্যের আপাতঅদৃশ্য, স্বতঃস্ফূর্ত অঙ্গীকার—সমষ্টির পূর্ণ হয়ে ওঠার নিরন্তর দাবি। যে দাবিকে, সামাজিক পছন্দকে ব্যক্তিপ্রতিভা বুকে জড়িয়ে তার আবৃত আমি-র আত্মহীনতাকে চওড়া, আরো চওড়া করতে চাইছে। অনাবৃত আমি-র সুখ দুঃখ অনেক সময় কেবল আত্মসর্বস্বতাকে ঘিরে থাকতে চায়। সে হতে চায় সবার পূজ্য। চাপাতে চায় ব্যক্তিতন্ত্র। কিন্তু ভেতরের আমিহীন আমি, আত্মত্যাগী আমি কখনো স্পর্ধিত উচ্চারণে, কখনো নম্র ভাষায় পারিপার্শ্বিকের ঘটনা আর অঘটনের আবর্জনা সরিয়ে বহুজনের এমন এক স্বরাজ গড়ে তোলে, যা ফিরিয়ে আনে পূর্বস্মৃতির ঐতিহ্য আর ঐতিহ্যের সমৃদ্ধি। সহজ বাক্যে জানিয়ে দেয় সে, আমি নই—আমরা, সমাজের সবাই আগে ভালো ছিলাম, আমাদের গৌরব ছিল, সংহতি ছিল, সেই স্মৃতিকে জাগিয়ে অধিকতর দৈহিক ও আত্মিক বৃদ্ধি চাই, ক্ষতের ওপর প্রলেপ নয়, চাই সামাজিক শরীর ও হূদয় থেকে উদ্বেগজনক আঁচিলের, ক্ষতচিহ্নের অবসান। এখানেই ব্যক্তি অনাত্মীয়েরও আত্মীয় আর সমষ্টির ইচ্ছা আর অনিচ্ছার প্রতিনিধি হয়ে ওঠে; তার আত্মহীনতা সর্বপ্রাণবাদী (প্যানথেয়িস্ট) সাধকের মতো বিশেষ থেকে নির্বিশেষে রূপান্তরিত হতে থাকে। দ্বিখণ্ডিত বাংলার নেতৃত্বে অখণ্ডের এই সাধনা, মঙ্গলবোধের এ জাগৃতি সম্ভবত বেশিদিন এড়িয়ে থাকা কঠিন। সন্ধিক্ষণের বাঙালি রাষ্ট্রীয় পরিচিতি আর রাজনৈতিক মানচিত্রের স্বাতন্ত্র্য মেনে নিয়েছে। মেনে নিয়েও অপরাজেয় পুনর্নির্মাণও স্ব-উন্মোচন দাবি করছে। আর এখানেই সে ইতিহাসের ঘোষিত বা অনুভূতির নির্দেশ পালন করতে ব্যস্ত। ভৌগোলিক স্বাতন্ত্র্য রক্ষার অঙ্গীকারেও ছড়িয়ে রয়েছে তার ঐকান্তিকতা। যেমন ভাষাপ্রেমে, দেশপ্রেমে; তেমনি সমগোত্রীয়তার অভ্যাসে। জাতির সৌভাগ্য, বোধ আর বোধিতে; যাবতীয় কর্মে, যে কোনো সামগ্রিক সংকটে তার ঐক্যের আগ্রহই প্রধান হয়ে ওঠে। অশেষ গুরুত্ব পায় তার মাতৃময়তা। পূজায় সে যে মূর্তিকে দেখে, তার মাতৃরূপ পিতৃরূপের চেয়ে বহু বেশি শক্তিমান। এইরূপ অনুশাসিত নয় স্বশাসিত—মাতৃপ্রেমে, দেশপ্রেমে স্নিগ্ধ, উদ্ভাসিত। এটাও তার অর্জিত সৌভাগ্যের সম্পদ। ভাগ্যহীন নয়, নিঃসন্দেহে সে এক ভাগ্যবান জাতি। ইতিহাস এই প্রথম, দুই বঙ্গে একই সময়ে দুজন মহিলা, দুজন মা প্রশাসনের সর্বোচ্চ স্তম্ভ। তাদের প্রার্থনা, আমার সন্তান যেন থাকে দুধেভাতে। এ কি শুধু প্রার্থনা? না প্রার্থনার আড়ালে আর সামনে সন্তানপ্রীতি আর মাতৃহূদয়কে ক্রমাগত বড় করছে?

এই যে বঙ্গের কন্যাশ্রী যা দেখে বিশ্ব অপূর্ববোধে পুলকিত। ঐ যে বাংলাদেশে নারীকল্যাণের উদিত চালচিত্র; এই যে এপার বাংলার গ্রামে গ্রামে স্কুলযাত্রী বালিকাদের সাইকেল মিছিলের কলতান; ঐ যে সন্ধ্যার আজানের সঙ্গে একাকার হয়ে যায় গার্মেন্টস কর্মী হাজার হাজার মহিলার গৃহমুখী কণ্ঠধ্বনি—এই যে এ বঙ্গের গ্রামে গ্রামে স্বনির্ভর মহিলার দক্ষতার উদ্ভাসিত ঊর্ধ্বারোহণ, তা কীসের লক্ষণ? নারীর প্রকৃত ক্ষমতায়নের। এই ধরনের ক্ষমতায়ন রাজনীতির ভেতরে আর  বাইরে যত বাড়বে, ততই পিতৃতান্ত্রিকের অহংকারের ধস নামবে। সন্তান আর স্বামী দুই পক্ষই বুঝবে, দিনযাপনের নিয়ন্ত্রণ মায়ের হাতে থাকা উচিত। এতে সংযম আর সত্ অভ্যাসের অতিরিক্ত সঞ্চয় সম্ভব। সমাজবিজ্ঞানী আর অর্থশাস্ত্রীদের সাম্প্রতিক বহু গবেষণায়ও তা প্রমাণিত। প্রতিবেশী দুই জনমুখী নেত্রীর কর্মভার আর মর্মের প্রয়োগকে সামনে রেখে আমাদের ভাবনা-চিন্তা জরুরি! তাদের সমাজভাবনার প্রতিযোগিতামূলক চর্চা নয়, পর্যবেক্ষণ আর অধ্যয়নের বিষয় হোক, সমান্তরাল চিন্তা আর বাস্তবায়িত স্বপ্নের ঐক্য। সহজ ভঙ্গিতে স্বীকার করলে ভালো হয়, নেতৃত্বের যোগ্যতাকে স্পর্শ করে বাংলাদেশ আজ বিশ্বসভায় স্বীকৃত। প্রশাসনিক দক্ষতা আর কর্ম ও মর্মের সংযোগ বঙ্গ, পশ্চিমবঙ্গের আকাশও এখন অংশত মেঘলা নয়। পরিষ্কার তার অভিমুখ, সংশয়হীন ভয়হীন তার কণ্ঠস্বর। স্বপ্ন আর দূরদৃষ্টির সমান্তরালকে সাজিয়ে দ্বিখণ্ডিত জাতি তার অপহূত নবজাগরণকে ফিরিয়ে আনতে অকুণ্ঠিত, দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। এ কারণেই লেখাটির শুরুতেই বলেছি, মেঘ কেটে যাচ্ছে। ঝলমলে রোদ হাসতে শুরু করল, রাস্তায় ফিরে এলো সজাগ তারুণ্য—তারুণ্যের কলহহীন কলরব। অতএব, সতর্কতাময় স্বস্থির লহর উঠছে। উঠুক আরো। বাড়ুক আরো। অনুভবে, প্রেমে আমরা হয়ে উঠব একে-অন্যের সঙ্গী। নির্বিশেষের অনিঃশেষ সহকর্মী। সহমর্মী।

n লেখক:  ভারতীয় সাংবাদিক, সম্পাদক আরম্ভ পত্রিকা