পৃথিবী বদলানোর ইঙ্গিত দিচ্ছে কি জলবায়ু?

গোটা বিশ্ব এখন উভয় সংকটের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হচ্ছে। একদিকে প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাসের থাবায় নাস্তানাবুদ, অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব দেখা দিচ্ছে মানবজীবনে। জলবায়ু পরিবর্তন দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ার কারণ যুগের পর যুগ  মানব সৃষ্ট ধ্বংসাত্মক ক্রিয়াকলাপ। কিন্তু একটি ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলার পর তা ভুলেই যাই, আমাদের আরো সচেতন হতে হবে জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে। এরূপ উদাসীনতার কারণেই কি জলবায়ু আরো ভয়াবহ রূপ নিয়ে দেখা দেবে? তাহলে পৃথিবী বদলানোর ইঙ্গিত দিচ্ছে কি জলবায়ু?

নানাবিধ উন্নত  প্রযুক্তি উদ্ভাবন হয়ে আসছিল বিভিন্ন রাষ্ট্রের প্রযুক্তিগত প্রতি-যোগিতার মাধ্যমে। কলকারখানার চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে বহুগুণ।  অন্যদিকে বায়ুমণ্ডলে অনবরত যোগ হয়ে আসছে দূষিত কার্বন ডাই-অক্সাইড, কিন্তু সেদিকে মানবজাতির কোনো খেয়াল নেই।

বৈশ্বিক তাপমাত্রা ও  সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি আগেও হয়েছে, এখন শুধু ভয়াবহ রূপ নেওয়া বাকি। আবহাওয়া ক্রমেই চরম ভাবাপন্ন হয়ে উঠছে এবং অতি নিম্নচাপের প্রভাবে সৃষ্টি হচ্ছে সুপার সাইক্লোনের মতো ঘূর্ণিঝড়।

বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে মারাত্মক হয়ে দেখা দিয়েছিল ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়, যা এখনো বাংলাদেশে আঘাত হানা ঘূর্ণিঝড়ের  মধ্যে সর্বোচ্চ ধ্বংসাত্মক মাপকাঠির রেকর্ডে রয়ে গেছে। গড়ে প্রতি বছর পৃথিবীতে ৮০টি ঘূর্ণিঝড় বঙ্গোপসাগরে সৃষ্টি হয়,  উপকূলীয় অঞ্চলে আঘাত হানে শক্তিশালী সাইক্লোনগুলো।

২০১৬ সালে ঘূর্ণিঝড় রোয়ানু এবং ক্রান্তীয় ঘূর্ণিঝড় ডিয়ামু বাংলাদেশের অর্থনীতির কাঠামোতে ব্যাপক আঘাত হেনেছে। অন্যদিকে ২০১৭ সালের ১৭টি ঘূর্ণিঝড়ের মধ্যে ছয়টি হারিকেনও ছিল ভয়ানক ও ধ্বংসাত্মক। অতি তীব্র ক্রান্তীয় ঘূর্ণিঝড় বুলবুল চরমভাবে আঘাত হেনেছে সাম্প্রতিকই, ২০১৯ সালের নভেম্বরে।

যা এখনো আন্দামান সাগরে পুনর্জন্ম হওয়া চতুর্থ গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঘূর্ণিঝড়। প্রতি বছরই ঘূর্ণিঝড় দানবীয় রূপ নিয়ে উপকূলীয় অঞ্চলে আছড়ে পড়ছে, ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে লাখো মানুষের। প্রকৃতির এরূপ আচরণের জন্য প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে মানবজাতিই দায়ী, যার কুফল হিসেবে প্রতি বছর ভয়ংকর ঘূর্ণিঝড়ের সম্মুখীন হতে হচ্ছে মানবজাতিকেই। মার্কিন যুগ্ম টাইফুন সতর্কতা কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালের মে মাসে সোমবার বঙ্গোপসাগরে রেকর্ড করা সবচেয়ে শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়ের তালিকায় স্থান পায় ‘সুপার সাইক্লোন আম্ফান’।

মহাসেন, মোরা, ফণীর মতো ঘূর্ণিঝড় অনবরত  আঘাত হেনেই চলেছে ইউরোপ ও এশিয়ার উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোতে। সবচেয়ে নেতিবাচক  প্রভাব পড়ছে উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনীতিতে। আবহাওয়া দিনকে দিন হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে পৃথিবীর জন্য। তাহলে কি পৃথিবী বদলানোর ইঙ্গিত দিচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তনের মাধ্যমে? আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন অনেক বিশেষজ্ঞ।

জলবায়ু পরিবর্তনে বৈশ্বিক উষ্ণতা যেভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে,  ভয়ানক কারণ হয়ে দেখা দিতে পারে ভবিষ্যত্ পৃথিবীর জন্য। প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রথমেই নজর দিতে হবে গ্রিন হাউজ গ্যাস নিঃসারণ বন্ধের দিকে।

নচেত বাড়বে ঘূর্ণিঝড়ের লন্ডভন্ড ও তাণ্ডবীয় আচরণ, বাড়বে আকস্মিক বৃষ্টিপাত, খরা ও বন্যা এবং হ্রাস পাবে কৃষিজাত পণ্যের উত্পাদন। উন্নত রাষ্ট্র গড়ার লক্ষ্যে  চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিতে হবে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলাকে।  সুপরিকল্পনার আওতায় আনতে হবে শিল্প খাতকে। শুধু গ্রীষ্মকালীন পরিকল্পনা করলে চলবে না, এর বাস্তবায়ন আনা উচিত সারা বছরের কর্মকাণ্ডকে কেন্দ্র করেই। মহামারি করোনা ভাইরাসকে বিশ্ব যেরূপে যুদ্ধ হিসেবে গ্রহণ করেছে, একইভাবে জলবায়ু পরিবর্তনকে যুদ্ধের সমতুল্য বিবেচনায় রেখে শামিল হতে হবে গোটা বিশ্বকে। করোনা-পরবর্তী প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলাকে আমলে না আনলে ভবিষ্যতে ‘আম্ফান’-এর চেয়েও ধ্বংসাত্মক ও দানবীয় শক্তি নিয়ে আঘাত হানবে প্রথবীর বুকে, মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হবে উন্নয়নশীল দেশগুলো, আবহাওয়ার ভয়াল রূপ দেখা দেবে গোটা বিশ্বে। 

n লেখক :শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়