যুক্তরাষ্ট্রে পার্লামেন্ট ভবনে ঢুকে ট্রাম্প সমর্থকদের বিক্ষোভ, ভাঙচুর

যুক্তরাষ্ট্রে নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের জয় আটকাতে নজিরবিহীন বিক্ষোভের ঘটনা ঘটেছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আহ্বানে তার হাজার হাজার সমর্থক গতকাল বুধবার পার্লামেন্ট ভবনে ঢুকে পড়েন। এ সময় ইলেকটোরাল কলেজের ভোট গণনায় কংগ্রেসের যৌথ অধিবেশন চলছিল। বিক্ষোভকারীরা পার্লামেন্টে প্রবেশের পর ভাঙচুর শুরু করলে অধিবেশন স্থগিত করা হয়। ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্সসহ সিনেটর ও প্রতিনিধি পরিষদের সব সদস্যকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে ওয়াশিংটনে সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত কারফিউ জারি করা হয়। এ সময় এক নারী গুলিবিদ্ধ হন। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এই নজিরবিহীন ঘটনার পর ট্রাম্প টুইটার বার্তায় বলেছেন, আমি সবাইকে শান্তিপূর্ণ থাকার আহ্বান জানিয়েছি। যুক্তরাষ্ট্র জুড়ে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। খবর ডেইলি মেইল, সিএনএন ও রয়টার্সের

যুক্তরাষ্ট্রে নজিরবিহীন ঘটনা :জো বাইডেনের ইলেকটোরাল ভোটকে চূড়ান্ত প্রত্যয়ন করতে স্থানীয় সময় গতকাল বুধবার দুপুর একটায় কংগ্রেসের যৌথ অধিবেশন শুরু হয়। যৌথ অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন  ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স। ইলেকটোরাল ভোট গণনায় রিপাবলিকানদের আপত্তির জানানোর পর দুই কক্ষে বিতর্ক শুরু হয়। এরই মধ্যে আকস্মিকভাবে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা ভেঙে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সমর্থকরা ক্যাপিটল হিলে প্রবেশ করেন। তারা ভবনের দরজা-জানালা ও চেয়ার ভাঙচুর করেন। তাদের হাতে অস্ত্র, লাঠি, মার্কিন পতাকা ও ট্রাম্পের ছবি সম্বলিত ব্যানার ছিল। এরপরই ইলেকটোরাল কলেজের প্রত্যয়ন কার্যক্রম সাময়িক স্থগিত করা হয়। মাইক পেন্সসহ কংগ্রেসের সিনেটর ও কংগ্রেসের সদস্যদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়। তবে ডেইলি মেইল জানায়, কংগ্রেস সদস্যদের অনেকেই ভয়ে পার্লামেন্ট ভবন ছেড়ে পালিয়ে যান। কেউ কেউ আবার চেয়ারের নীচে আশ্রয় নেন। ভবনে থাকা কয়েকজনকে গ্যাস মাস্ক দেওয়া হয়। এরপর পুলিশ বিক্ষোভকারীদের লক্ষ্য করে টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ করে। ট্রাম্পের সশস্ত্র মিলিশিয়া বাহিনীর বিক্ষোভের মুখে ওয়াশিংটন ডিসির মেয়র মিউরিয়েল বাউজার সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত কারফিউ জারি করেন। আরো অতিরিক্ত বাহিনী মোতায়েনের দাবি জানায় নিরাপত্তা বাহিনী। এরপর নিরাপত্তা বাহিনী পার্লামেন্ট ভবনের দরজায় দাঁড়িয়ে থাকে। কাউকে প্রবেশ করা মাত্র গুলি করা হবে বলে জানানো হয়। জানা গেছে, ওয়াশিংটন জুড়ে ট্রাম্প সমর্থকরা বিক্ষোভ করেন। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এমন ঘটনা আগে কখনো ঘটেনি বলে নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন। গত কয়েকদিন ধরেই এমন পরিস্থিতির আশংকা করা হচ্ছিল।

এর আগে যৌথ অধিবেশনে সিনেটের সংখ্যাগরিষ্ঠ নেতা মিচ ম্যাককোনেল প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের চ্যালেঞ্জকে প্রত্যাখ্যান করে বলেন, আমরা যদি ভোটারদের ভোটকে বাতিল করি তাহলে সেটা প্রজাতন্ত্রের দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতি করা হবে। সিনেটের সংখ্যালঘিষ্ঠ নেতা চাক চুসুমার বলেন, রিপাবলিকানরা যে আপত্তি তুলেছেন সেটা আমাদের জন্য, দেশের জন্য এবং দলের জন্য বিব্রবতকর। জনগনের রায়কে মেনে নেওয়াটা রাজনৈতিক সাহসিকতার অংশ। আলাবামা এবং আলাস্কার ভোট গণনার অ্যারিজোনার ভোট গণনার সময় আপত্তি জানানোয় বিতর্ক শুরু হয়।

বিক্ষোভ, কড়া বক্তব্য ট্রাম্পের

যৌথ অধিবেশনের আগে গতকাল হোয়াইট হাউজের কাছে এলিপস পার্ক এলাকায় সমর্থকদের বিক্ষোভে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন, আমি কখনো ২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে পরাজয় স্বীকার করবো না। তিনি সমর্থকদেরও হার না মানার নির্দেশ দেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মাইক পেন্সকে যুদ্ধে নামার নির্দেশ দেন। যেসব রিপাবলিকান বাইডেনকে স্বীকৃতি দেওয়ার কথা বলেছেন তাদেরকে দুর্বল নেতা উল্লেখ করে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন, আপনারা এসব নেতাদের ক্ষমা করবেন না। তিনি আবারো নির্বাচনে জালিয়াতির অভিযোগ আনেন এবং মাইক পেন্সকে ফল পালটে দেওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, আমরা নির্বাচনে চুরি বন্ধ করবো। দায়িত্ব নেওয়ার পর ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স এই প্রথম বড় ধরনের পরীক্ষার সম্মুখীন হলেন। ডোনাল্ড ট্রাম্প জুনিয়র দাবি করেছেন, বিক্ষোভে এক লাখের মতো লোক জড়ো হয়েছিলেন।

‘মার্চ টু সেভ আমেরিকা’ শীর্ষক ব্যানার নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের সামনে জড়োও হন ট্রাম্প সমর্থকরা। বিক্ষোভকারীদের দমনে পুলিশ টিয়ারগ্যাস নিক্ষেপ করেছে। এতে কয়েক জন আহতও হয়েছে। গ্রেফতার করা হয় অন্তত ছয় জনকে। সম্ভাব্য সহিংসতার আশঙ্কায় ডিসির মেয়র মিউরিয়েল বাউজার ন্যাশনাল গার্ড মোতায়েন করেন। মেয়র বাউজার এলাকার লোকজনকে ডাউন টাউন ডিসি থেকে সরে থাকার ও যে কেউ হামলা চালাতে চায় তার কাছ থেকে দূরে থাকবার পরামর্শ দেন। এর আগে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প গতকাল সকালেই এক টুইটার বার্তায় বলেন, ‘রাজ্যগুলোর উচিত তাদের ভোটগুলো সংশোধন করা। যেসব রাজ্যে জালিয়াতি এবং প্রতারণা হয়েছে সেখানে রাজ্যের আইনসভা ইলেকটোরাল কলেজকে অনুমোদন দিতে পারে না।’ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন, ‘ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্সই এখন সঠিক কাজটি করতে পারেন। তিনি ইলেকটোরাল ভোটগুলো রাজ্যের কাছে ফেরত পাঠাতে পারেন। তাহলেই আমরা জয় পাব।’ তিনি ভাইস প্রেসিডেন্টের উদ্দেশে বলেন, ‘এটা করুন মাইক পেন্স। এখনই সাহস দেখানোর সময়।’ যদিও নির্বাচনি ফলাফল পরিবর্তনের ক্ষমতা মাইক পেন্সের নেই। আর এই কথা তিনি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে মঙ্গলবার বলেও দিয়েছেন বলে একটি সূত্র জানিয়েছে।

এদিকে মার্কিন মিডিয়া পলিটিকো জানিয়েছে, ১৩ জন ট্রাম্পপন্থি সিনেটর জো বাইডেনকে স্বীকৃতি দেবেন না বলে ঘোষণা দিয়েছেন। ২৪ রিপাবলিকান সিনেটর জো বাইডেনকে স্বীকৃতি দেওয়ার কথা জানিয়েছেন। আর ৫১ ডেমোক্র্যাটরা তো আছেনই। ফলে বাইডেনের জয়কে আটকানোর চেষ্টায় শেষ পর্যন্ত ট্রাম্প ব্যর্থ হবেন বলে বিশ্লেষকরা বলছেন। ৩ ডিসেম্বর ভোটাভুটির পর গত ১৪ ডিসেম্বরের চূড়ান্ত গণনায় জো বাইডেন ৩০৬টি ও ডোনাল্ড ট্রাম্প ২৩২টি ইলেকটোরাল কলেজ ভোট পেয়েছেন। প্রতিনিধি পরিষদে ২২২টি আসন পেয়েছেন ডেমোক্র্যাটরা যেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য দরকার ২১৮টি।

জর্জিয়ার সিনেটেও ডেমোক্র্যাটদের জয়

মার্কিন সিনেটে ডেমোক্রেটিক পার্টি নাকি রিপাবলিকান পার্টি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে, তা নির্ধারণ করছে জর্জিয়ার ভোট। এটা রিপাবলিকান রাজ্য বলে পরিচিত হলেও সামান্য ভোটের ব্যবধানে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থী জো বাইডেন জিতেছেন। গত নভেম্বরের নির্বাচনে দুটি সিনেটর পদে কেউ সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় ফের ভোটাভুটি হয়। স্থানীয় সময় মঙ্গলবার সেখানে ভোটাভুটি হয়। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রার্থী জন অসফ রিপাবলিকান প্রার্থী ডেভিড পারডুকে হারিয়ে জয় পেয়েছেন। যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে ফল ঘোষণা করা হয়নি। আরেক ডেমোক্র্যাট প্রার্থী রিফারেন্ড রাফায়েল ওয়ার্নোক সামান্য ব্যবধানে এগিয়ে। ওয়ার্নোকই জয় পাবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। ডেমোক্র্যাটের উভয় প্রার্থী বিজয়ী হওয়ায় সিনেটে আসন দাঁড়াবে ৫০-৫০ এ। তখন কমলা হ্যারিস ভাইস প্রেসিডেন্টের ভোট প্রদানের মাধ্যমে ব্যবধান আনবেন। এভাবে কমিটি পরিচালনা ও আইনি সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে। জর্জিয়ার অনেক রিপাবলিকানই হারের জন্য প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে দুষছেন। তারা বলছেন, জালিয়াতির নির্বাচন নিয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রচারণা চালানো এবং এক নির্বাচনি কর্মকর্তাকে ফোন করে হুমকি দেওয়ার কারণেই জর্জিয়ায় রিপাবলিকানদের হারতে হয়েছে।