স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল জানিয়েছেন, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে মিয়ানমারের সঙ্গে আলোচনাসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হলেও তা কাজে আসেনি। তবে তিনি বলেন, ‘বলপ্রয়োগে বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের তাদের দেশে ফেরত পাঠানোই হচ্ছে আমাদের মূল টার্গেট। তাদের প্রত্যাবাসন কীভাবে হবে, তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। সেজন্য আমরা সবাই কাজ করছি। আমাদের কূটনৈতিক তত্পরতা জোরদার করা হয়েছে। তার আগে তাদের ক্যাম্প এলাকায় নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করার সর্বাত্মক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’ গতকাল বুধবার সচিবালয়ে বলপ্রয়োগে বাস্তুচ্যুত মিয়ানমারের নাগরিকদের সমন্বয় ব্যবস্থাপনা ও আইনশৃঙ্খলা সম্পর্কিত জাতীয় কমিটির প্রথম সভা শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।
এর আগে গত ১৪ ডিসেম্বর এ সম্পর্কিত জাতীয় কমিটি গঠন করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। সাত সদস্যের এই কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে।
তিনি বলেন, সভায় রোহিঙ্গা ক্যাম্প, রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন, তারা কী অবস্থায় আছে, এদেশ থেকে তারা কীভাবে যাবে—সবকিছু নিয়ে আলাপ-আলোচনা হয়েছে। আমাদের মূল আলোচনার বিষয় ছিল, যত দ্রুত সম্ভব রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো। প্রত্যাবসানের জন্য যা যা করণীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও আমরা তা করে যাচ্ছি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইতিমধ্যে চীন, জাপান ও জার্মানির সঙ্গে মিটিং করেছেন। তিনি আশাবাদী, যাদের আইডেন্টিফাই করা হয়েছে, সরকার যাদের আইডেন্টিফাই করেছে, তাদের হয়তো যাওয়া শুরু হবে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী সভায় এটা জানিয়েছেন। মিয়ানমারকে কত জন রোহিঙ্গার তালিকা দেওয়া হয়েছে এবং কতগুলোকে তারা চিহ্নিত করেছে, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘উই লেফট নো স্টোন আনটার্ন। আমরা সব স্টোন টার্ন করছি, আমাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে। যেখানে প্রয়োজন আমরা যাচ্ছি। আমি গিয়েছি, আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিয়েছেন, আমাদের বর্ডার গার্ড লেভেলে আলোচনা চলছে। মিয়ানমারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এখানে এসেছেন, সবই হচ্ছে, তার পরও রেজাল্ট হচ্ছে না, আমি এটাই বলছি। তারা (মিয়ানমার) অনেক কিছু কমিটমেন্ট করেছে, কিন্তু কাজ হচ্ছে না। মিয়ানমার যেগুলো বলছে, সেগুলো করার জন্য আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সব সময় কাজ করছেন।’
অপর এক প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা একটা সিদ্ধান্ত আগেই নিয়েছিলাম যে, রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোর চতুর্দিকে আমরা কাঁটাতারের বেড়া তৈরি করব, যাতে এখানে আসা রোহিঙ্গারা যত্রতত্র না যেতে পারে। শুধু কাঁটাতারের বেড়া নয়, চতুর্দিকে একটা ওয়াকওয়ে থাকবে, টাওয়ার থাকবে, সিসি ক্যামেরাও থাকবে। তাদের নিরাপত্তা জোরদার করার জন্য এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। এটা খুব তাড়াতাড়ি শেষ করার জন্য সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছে। এটা আমাদের সেনাবাহিনী সম্পন্ন করবে।’
রোহিঙ্গা ক্যাম্পে নিরাপত্তায় নবগঠিত দুটি ইউনিট কাজ শুরু করেছে জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য পুলিশকে সম্পূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। পুলিশ প্রয়োজনে বিজিবি ও র্যাবের সহযোগিতা নেবে। ক্যাম্পের বাইরে এখনকার মতো সেনাবাহিনীর অবস্থানও থাকবে।
ক্যাম্পে অবস্থানকারী রোহিঙ্গারা মাঝেমধ্যেই মিয়ানমারে গিয়ে ইয়াবা নিয়ে আসে জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘লাভ-লোকসানের ভাগ নিয়ে প্রায়শই কলহ হয়। আমরা শুনেছি, কলহের জের ধরে খুনাখুনি হচ্ছে, দু-চারটি খুনও হয়েছে। নতুন বাহিনীও তৈরি হয়েছে। এটা যাতে না বাড়ে, সেজন্য টহল অব্যাহত থাকবে, রাতের টহল জোরদারে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’ তিনি বলেন, ভাসানচরে রোহিঙ্গারা নিজেরাই গিয়েছেন, কাউকে জোর করে নেওয়া হয়নি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরো বলেন, কক্সবাজারে ১৮০টি এনজিও কাজ করছে। ভাসানচরে ইতিমধ্যে ২২টি এনজিও কাজ শুরু করেছে। তবে নিবন্ধন না থাকায় এনজিও ব্যুরো কয়েকটি এনজিওকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে।
সভায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী এনামুর রহমান, মহিলা ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ফজিলাতুন নেসা ইন্দিরা, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব আহমেদ কায়কাউস, সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার (পিএসও) লেফটেন্যান্ট জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, পুলিশের মহাপরিদর্শকসহ কমিটির অন্য সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।