বিংশ শতাব্দীর অস্তিত্ববাদী দার্শনিক, নাট্যকার, সাহিত্যিক, সমালোচক ও চিন্তানায়ক জ্যঁ পল সার্ত্রের জন্ম ১৯০৫ সালের ২১ জুন ফ্রান্সের প্যারিস শহরে। বাবা জ্যঁ ব্যাবিস্টে সার্ত্রে। মা এনিমারি। শৈশবের একটি বড়ো সময় কেটেছে মা এনিমারি ও নানা চার্লস শোয়েটজারের সঙ্গে। তাঁদেরই প্রভাব পড়েছে সার্ত্রের জীবন, কর্ম ও চিন্তনে।
সার্ত্রে সামাজিক সংস্কারবহির্ভূত মানুষ। তিনি প্রথম জীবনে হাইডেগারের অনুসারী হতে চেয়েছিলেন। তাঁর শিক্ষাজীবন ও কর্মজীবন পর্যালোচনা করে পাওয়া যায় তাঁর জীবনের বিশাল ব্যাপ্তি ও পরিধির সন্ধান। কৈশোরের মাঝামাঝি সময় থেকেই দর্শনের প্রতি আগ্রহ অনুভব করতে থাকেন সার্ত্রে। ফ্রান্স ও বিশ্বের খ্যাতনামা একাধিক দার্শনিকের সংস্পর্শে ক্রমে নিজেকে সমৃদ্ধ করতে থাকেন সার্ত্রে। সেইসঙ্গে চলতে থাকে কান্ট, হেগেল ও হাইডেগারের মতো দার্শনিকদের তত্ত্ব থেকে ধারণা লাভের প্রয়াস।
সার্ত্রের জীবন বৈচিত্র্যময়। সমাজের প্রচলিত নিয়ম-নীতি তোয়াক্কা করতেন না তিনি। অন্যদিকে, যা ঠিক বলে জানতেন, তা-ই অবলীলায় প্রকাশ করতেন। তাঁর মতে, সামাজিক সমস্যা সমাধানে মানুষের সত্তা বা অধিবিদ্যক ধারণার আদতে কোনো প্রয়োজনই নেই, কারণ তা মানুষের জীবনে পরিপূর্ণভাবে সুখ দেয় না। মানুষের জন্য দরকার নিজের অস্তিত্বকে স্বীকার করা। অস্তিত্ব স্বীকার করলেই মানুষের জীবনে সত্য অর্জিত হয়। কারণ মানুষ সবসময়ই মূলত স্বাধীন। স্বাধীনতার জন্যই মানুষকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়। সার্ত্রে তাঁর নানা সাহিত্যকর্মে, উপন্যাসে দেখিয়েছেন—একটি সমগ্রের বিবেচনাহীনতার কাছে ব্যক্তিমানুষ কতই না অসহায়! ব্যক্তি যদি তার অস্তিত্ব বিষয়ে সচেতন থাকে, তবে তাকে শোষণ করা সহজ নয়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে তাঁর পর্যবেক্ষিত বাস্তবতা গভীর ছাপ ফেলে নিজের জীবন ও দর্শনে। এসময় প্যারিসে ফিরে স্বাধিকার আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত একটি গোপন দলেও নিজেকে সম্পৃক্ত করেন সার্ত্রে। সেইসঙ্গে ক্রমান্বয়ে বেগবান হতে থাকে তাঁর স্বতন্ত্র লেখনীও। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে জার্মান সেনাবাহিনীর হাতে বন্দি অবস্থায় লেখেন প্রথম নাটক। ১৯৪৪ সালে প্যারিসে যুদ্ধাবসানের সময়ে লেখনী দিয়ে ক্রমেই তাঁর দার্শনিক চিন্তাধারার সঙ্গে অন্যদের পরিচয় করিয়ে দেন।
ব্যক্তি মানুষের পক্ষে কলম ধরার কারণে বহুবারই পুঁজিবাদী ও সাম্রাজ্যবাদীদের বিরাগভাজন হন সার্ত্রে। পুঁজিবাদবিরোধী, সাম্রাজ্যবাদবিরোধী অবস্থান তাঁকে সবার থেকে আলাদা অবস্থানে নিয়ে যায়। তাঁর দার্শনিক প্রতিফলন—অস্তিত্ববাদ ও মার্ক্সইজম, সাহিত্যিক সৃজনশীলতা এবং সক্রিয় রাজনৈতিক অঙ্গীকার অর্জন তাঁকে বিশ্বব্যাপী খ্যাতি এনে দেয়। পরবর্তীকালের সমাজবিজ্ঞান, সমালোচনাতত্ত্ব ও উত্তর-উপনিবেশবাদ তত্ত্বে তাঁর বেশ প্রভাব পাওয়া যায়। তাঁর স্বতন্ত্র রাজনৈতিক অবস্থান এবং স্পষ্ট বক্তব্যের কারণে তাঁকে অনেকের বিরাগভাজন হতে হয়েছিল। তাঁর ফ্ল্যাটে বোমা হামলা এবং হত্যাচেষ্টা হয়েছিল কয়েকবার। ব্যক্তিজীবনে সমাজতান্ত্রিক বা কোনো রাজনৈতিক দলের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত না থাকলেও তাঁর লেখনীতে খুঁজে পাওয়া যায় এই ধারার সরব উপস্থিতি। বিপ্লবী নেতা চে-কে জানতেন ‘পূর্ণাঙ্গ মানুষ’ রূপে।
ব্যক্তি মানুষের স্বাধীনতাই ছিল সার্ত্রের কাছে একমাত্র আরাধ্য। আমি কি প্রাণী? রক্তমাংসের প্রাণী? আমি কি রক্তমাংসের মানুষ নাকি কেবলই প্রাণী? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে তিনি সাধারণের পক্ষে, ব্যক্তি মানুষের পক্ষে লিখতে থাকেন। তাঁর মতে, স্বাধীনতাই মানুষকে সাহায্য করে সবকিছুকে চিনতে, ভাবতে ও অর্জন করতে।
জ্যঁ পল সার্ত্রের নিজস্ব দার্শনিক মতবাদ ‘লেস্ শেমিনস্ দ্য লা লিবার্তে’ তিন খণ্ডে প্রকাশিত হয়। সার্ত্রের সমাজতান্ত্রিক মতবাদ ‘ক্রিতিক দ্য লা রেসঁ দিয়া লেক্তিক’ গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয় ১৯৬০ সালে। ১৯৭১ সালে তাঁর আত্মজীবনী ‘ফ্লরেয়ার’ প্রকাশিত হলে সারাবিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। জ্যঁ পল সার্ত্রের আরেকটি অসাধারণ কাজ হচ্ছে ‘বিং অ্যান্ড নাথিংনেস’। এই বইয়ে তিনি সকল ঘটনার পেছনে দুটি বাস্তবতা আছে বলে উল্লেখ করেন। একটি হচ্ছে সত্তা এবং অন্যটি চেতনা। একদিকে থাকে আমাদের চেতনা তৈরি করার বস্তুগত সত্তা, অন্যদিকে থাকে সেই সত্তা হতে সৃষ্ট চেতনা। সার্ত্রে এক্ষেত্রে দুটি নাম ব্যবহার করেছেন। ‘দ্য বিং ইন ইটসেলফ’ যা হচ্ছে সত্তা নিজেই এবং ‘দ্য বিং ফর ইটসেলফ’ যা সত্তার জন্য সৃষ্ট চেতনা।
জ্যঁ পল সার্ত্রের সব বই ফরাসি ভাষায় লেখা। বিশ্বের প্রায় সবকয়টি প্রধান ভাষায় এগুলো অনূদিত হয়েছে। প্রকাশিত গ্রন্থগুলো—‘এক্সিটেনশিয়ালিজম অ্যান্ড হিউম্যানিজম’ (১৯৪৬), ‘সার্চ ফর আ মেথড’ (১৯৫৭) ও ‘ক্রিটিক অব ডায়ালেকটিক্যাল রিজন’ (১৯৬০)। তাঁর অন্যান্য লেখা উপন্যাস, নাটক ও চিত্রনাট্যের মধ্যে রয়েছে—‘লা নাজি’, ‘দ্য মুর’, ‘ব্যারিওনা’ (প্রথম নাটক), ‘দ্য ফ্লাইজ’, ‘নো এক্সিট’, ‘দ্য এজ অব রিজন’, ‘দ্য রেসপেক্টফুল প্রস্টিটিউট’, ‘দ্য ভিক্টরস’। ‘দ্য ভিক্টরস’ নাটকে আমরা দেখি হিটলারের জার্মান বাহিনী কীভাবে ফ্রান্স দখল করে এবং কীভাবে বিপ্লবীদের কনসেনট্রেশান ক্যাম্পে আটকে রেখে নির্যাতন করা হয়।’ নো এক্সিট’ নাটকেও কাঠামোবদ্ধ জীবন আর অনন্ত অসীম আত্মার খোঁজে মানুষের চির প্রচেষ্টাকে তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন। মানুষ পরিত্রাণ চায়, শৃঙ্খলিত জীবন থেকে মুক্তি চায়। একইসঙ্গে সেই মুক্তিইবা মানুষের মধ্যে কোথায়? মানুষের মুক্তির উপায় নিয়ে, আজীবন অস্তিত্ব সংগ্রামী হিসেবে কাটিয়েছেন সার্ত্রে।
জ্যঁ পল সার্ত্রে ছিলেন সমাজিক প্রথাবিরোধী মানুষ। তিনি বিয়ে করেননি। বিখ্যাত ফরাসি নারীবাদী লেখিকা সিমন দ্য বোভোয়ারকে সঙ্গী করে বসবাস করেছেন আজীবন। ভাগ করে নিতেন তাঁর চেতনা, আদর্শকে। আলজেরিয়ায় ফরাসি আগ্রাসন এবং ভিয়েতনাম যুদ্ধেরও কট্টর সমালোচক ছিলেন তিনি। ১৯৬৪ সালে সুইডিশ অ্যাকাডেমি তাঁর নাম সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারের জন্য ঘোষণা করে। তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। যা পৃথিবীর তাবত্ সাহিত্য অনুরাগীদের মাঝে স্থায়ী বিতর্ক সৃষ্টি করে। একজন লেখকের কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত হওয়া উচিত নয়ু—এই যুক্তিতে পুরস্কারটি প্রত্যাখ্যান করেন তিনি। ইতিহাসে তিনিই প্রথম সাহিত্যিক, যিনি পুরস্কার প্রত্যাখানের কাজটি করেন। আমরা একে প্রত্যাখ্যান বলে বিতর্ক সৃষ্টি করলেও তিনি একে সহজাত কর্ম হিসেবে গণ্য করেন।
অস্তিত্ব মানে মানবতাবাদ। ব্যক্তি মানুষকে, তার অস্তিত্বকে ও তার স্বাধীনতাকে স্বীকার করা মানেই অস্তিত্ববাদ। সার্ত্রের এই অস্তিত্ববাদ যে বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত হয়েছে তা নয়, অদ্যাবধি সমালোচনাও হচ্ছে। তথাপি শাস্ত্রকারেরা অবশ্যই পূর্বের ন্যায় আগামীতেও সার্ত্রেকে আরো নতুনভাবে আবিষ্কার করবেন।