ইহা যেন হলিউডের এক রুদ্ধশ্বাস সিনেমা। ভিতরে তখন চলিতেছিল এক ঐতিহাসিক মিটিং। এই সভার শেষেই ইলেকটোরাল কলেজের ভোটের হিসাবে সরকারিভাবে জো বাইডেনকে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট হিসাবে ঘোষণা করা হইবে। কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্প তো আগেই ইঙ্গিত দিয়াছিলেন—বিনা যুদ্ধে নাহি দিব সূচ্যগ্র মেদিনী। ট্রাম্প তো খুব ভালো করিয়াই জানেন, শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদের আফিম তিনি আগেই খাওয়াইয়া রাখিয়াছেন লক্ষ লক্ষ সমর্থককে। সেই শ্রেষ্ঠত্বের আফিমের শক্তি কতখানি—তাহার খুব বড় উদাহরণ ক্যাপিটল হিলে আক্রমণে নিহত হওয়া এক নারী বিক্ষোভকারী। তাহার নাম অ্যাশলি। আমেরিকার বিমানবাহিনীতে দীর্ঘদিন কাজ করা অ্যাশলি সান দিয়েগো হইতে ওয়াশিংটনে আসিয়াছিলেন ট্রাম্পকে প্রেসিডেন্ট পদে বহাল রাখিতে। তাহার মতো সমর্থকদের আত্মবিশ্বাস কেমন ছিল, তাহা অ্যাশলির করা একটি টুইট হইতে অনুধাবন করা যায়। ক্যাপিটল হিল বিক্ষোভের পূর্বে অ্যাশলি আর দশজন কট্টর ট্রাম্প-সমর্থকের মতো লিখিয়াছেন—‘কোনো কিছুই আমাদের আটকাইতে পারিবে না। তাহারা চেষ্টা করিবে। কিন্তু এইখানে ঝড় রহিয়াছে। আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আমরা ওয়াশিংটনে আসিতেছি। অন্ধকার হইতে আলো আসিতেছে।’
সত্যিই কি অন্ধকার হইতে আলো আসিতে পারে? অ্যাশলি জানেন না—কোথাও আলোর উত্স না থাকিলে আলো কখনোই প্রকাশিত হইতে পারে না। প্রায় দুই শত বত্সর পর যুক্তরাষ্ট্রের ক্যাপিটলে যাহার ইন্ধনে যেই আগ্রাসন ঘটিল, তাহাকে কি আলোর উত্স বলিবার কোনো সুযোগ রহিয়াছে? যুক্তরাষ্ট্রের ক্যাপিটল হিস্টোরিক্যাল সোসাইটির তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ ১৮১৪ সালে ওয়াশিংটনে অভিযান চালাইবার সময় ব্রিটিশ বাহিনী নির্মাণাধীন ক্যাপিটল ভবনে আগুন জ্বালাইয়া দিয়াছিল। আসলে, ট্রাম্পের মতো নেতা উন্নত বিশ্বে একমেবাদ্বিতীয়ম্! তৃতীয় বিশ্বের অনেক ক্ষমতাধরের মতো ট্রাম্পের হয়তো শখ হইয়াছিল যে কোনো মূল্যে ক্ষমতা আঁকড়াইয়া ধরিয়া থাকিতে হইবে। কেহ ট্রাম্পের সহিত থাকিলে তিনি সত্যের পথযাত্রী! আর ট্রাম্পের সহিত না থাকিলে তাহারা মিথ্যার পথযাত্রী! তাহারা আমেরিকার স্বার্থবিরোধী! এমনই সোজাসাপটা সমীকরণ তৈরি করিয়াছিলেন ট্রাম্প। তিনি ৩ নভেম্বরের নির্বাচনে নিশ্চিত জয়লাভ করিবেনই। যদি কোনোভাবে জয় না পান, তাহা হইলে নিশ্চয়ই নির্বাচনে কারচুপি হইয়াছে! বনের খেয়ালি রাজার মতো তাহার অভিমত, ভাবনা, বিশ্বাস। তাহার সহিত বিজ্ঞান কিংবা যুক্তির কোনো সম্পর্ক না থাকিলেও তাহার কিছুই আসে-যায় না। কিছু কিছু রাজনীতিক তাহার অভিধানে ‘পরাজয়’ শব্দটি মুছিয়া ফেলিতে চাহেন। অথচ পরাজয় মানিয়া লইবার মতো মানসিক শক্তি না থাকিলে কোনো ব্যক্তিরই রাজনীতির অঙ্গনে পা রাখা উচিত নহে। কিন্তু ট্রাম্প পরাজিত হইতে জানেন না। এই জন্য তিনি ভাঙা রেকর্ডের মতো ‘কারচুপি’র কথা বলিয়াই আসিতেছেন। যত জায়গায় এই সংক্রান্ত মামলা করিয়াছেন, সব জায়গায় তাহার মুখ পুড়িয়াছে। অবশেষে তাহার পরাজয়ের কফিনে শেষ পেরেক ঠুকিবার তারিখটি ছিল গত ৬ জানুয়ারি। এই জন্য তিনি তাহার উগ্র সমর্থকদের দিয়া দুই শত বত্সরের ইতিহাসে নজিরবিহীন কাণ্ড ঘটাইলেন! কিন্তু তাহাতে যে চার জনের প্রাণহানি হইল—এই লজ্জা আমেরিকা কোথায় রাখিবে? এই জন্য অনেকের মতে, ট্রাম্পের মতো জংলি রাজা বনে মানায়, আমেরিকায় কি মানায়? ট্রাম্প এবং তাহার উগ্র সমর্থকরা কি বুঝিতে পারিয়াছেন তাহারা কীভাবে আমেরিকাকে টানিয়া-হিঁচড়াইয়া নিচে নামাইয়াছেন!
ট্রাম্পের সমর্থকরা সম্ভবত অনুধাবন করিতে পারেন নাই, আমেরিকা কোনো জংলা দেশ নহে। তৃতীয় বিশ্বের কোনো দেশ নহে। আমেরিকার গণতন্ত্রের শিকড় দেশটির অপরিমেয় শক্তির উত্স! শত শক্তি দিয়াও এমন গণতন্ত্রের শিকড়ে আঁচড় কাঁটা যায় না। শেষ অর্থে ট্রাম্প নিঃসন্দেহে দুঃখী এবং পরিণত জ্ঞানহীন! সত্যিকারের জ্ঞান থাকিলে এমন বোকামি কেহ করিতে পারেন না। অনেকের মতে, তাহার নূতন করিয়া পাঠশালায় যাওয়া উচিত। তাহার কাণ্ডকারখানা দেখিয়া একটি মারফতি গান স্মরণে আসে—‘বাবা হরেক রকম পাগল দিয়া মিলাইছে মেলা/ বাবা তোমার দরবারে সব পাগলের খেলা।’