আমাদের আয়শা আপা, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভানেত্রী আয়শা খানম আর নেই। এই বিষাদময় খবরটি শুনেই শুরু হলো ২ জানুয়ারির দিনটি। তিনি অসুস্থ ছিলেন, ক্যানসারের সঙ্গে লড়ছিলেন প্রায় বছর দুয়েক ধরে; কিন্তু তার মতো লড়াকু মানুষ এত তাড়াতাড়ি মরণব্যাধির কাছে পরাজয় মানবেন, সেটা বুঝতে পারিনি। এই তো মাত্র দিনকয়েক আগে ভার্চুয়াল মিটিংয়ে তিনি কথা বললেন আমাদের সঙ্গে। তিনি আর কোনো দিন তার অতি চেনা হাসি মুখে কথা বলবেন না, বউদি সম্বোধন করে কুশল জানতে চাইবেন না, কারো আনন্দ-বেদনার সঙ্গী হবেন না—ভাবতেই বুকের ভেতরটা দুমড়েমুচড়ে যাচ্ছে।
কতদিনের পরিচয়, কত স্মৃতি, কত কথা যে মনে পড়ছে। আমরা কাছাকাছি বয়সের ছিলাম। তারপরও তিনি ছিলেন আমার আপা আর আমি ছিলাম তার বউদি। নেত্রকোনার মেয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের জন্য এসে জীবনকে যে এতটা উচ্চতায় নিয়ে যাবেন, সেটা তখন হয়তো কেউ ভাবেনি; কিন্তু তিনি এই পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে চিরবিদায় নেওয়ার পর আমরা বুঝতে পারছি—তিনি আসলে কত মানুষের হূদয় জুড়ে কতটা ভালোবাসার জায়গা তৈরি করে নিয়েছিলেন।
আয়শা আপার সঙ্গে আমার প্রথম দেখা এবং পরিচয় একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময়, ভারতের আগরতলায় ক্র্যাফট হোস্টেলে। তিনি ছাত্র ইউনিয়নের বড় নেত্রী ছিলেন; কিন্তু আমার শিক্ষাজীবন ময়মনসিংহে কেটেছে বলে আমাদের রাজনৈতিক চেতনার অঙ্কুরোদ্গমের কাল ষাটের দশকে আয়শা আপার সঙ্গে আমার সরাসরি পরিচয় ঘটেনি। তবে তার নাম শুনেছি, চোখে দেখিনি। ষাটের দশকে পাকিস্তানের সামরিক শাসক আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার ছোটবড় যেসব আন্দোলন সংঘটিত হয়েছে তার সবগুলোতেই আয়শা আপার অংশগ্রহণ ছিল। বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলন থেকে শুরু করে আমৃত্যু তিনি আন্দোলন-সংগ্রামেই যুক্ত ছিলেন।
তিনি সাম্য চিন্তায় বিশ্বাসী ছিলেন। ছিলেন মানুষের অধিকার বিষয়ে সচেতন। যে কোনো ধরনের বৈষম্যের বিরুদ্ধে ছিলেন সোচ্চার। একা লড়াই করে কোনো পরিবর্তন আনা যায় না, অনেককে নিয়ে, অনেককে সংগঠিত করেই পরিবর্তনের পথে হাঁটতে হয়। তাই আয়শা আপা জীবনভর সংগঠনের সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে রেখেছেন। সবাইকে একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যে সংগঠিত করার কাজে তিনি ছিলেন ক্লান্তিহীন। প্রগতিশীল ছাত্রসংগঠন ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রোকেয়া হল ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক এবং সহসভাপতিও নির্বাচিত হয়েছিলেন। মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছেন। মহিলা পরিষদ গঠনের প্রাথমিক অবস্থা থেকেই তিনি এই সংগঠনের সঙ্গে খুবই ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত ছিলেন। নারী মুক্তি আন্দোলনের বাতিঘর হিসেবে পরিচিত, সবার শ্রদ্ধেয় খালাম্মা কবি সুফিয়া কামালের সহযোগী হিসেবে মালেকা বেগম, আয়শা খানমসহ আরো অনেকে সত্তর দশকের শুরুতে যে মহিলা পরিষদ গঠন করেছিলেন, সে সংগঠন এখন দেশ জুড়ে কেবল বিস্তৃতই হয়নি, নারীর মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় এই সংগঠনের অবস্থান এখন সামনের সারিতে।
আয়শা খানমের সাংগঠনিক দক্ষতা অসাধারণ। তিনি পর্যায়ক্রমে মহিলা পরিষদের সাংগঠনিক সম্পাদক, সাধারণ সম্পাদক এবং সবশেষে সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। সংগঠনকে মজবুত ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে তিনি সারা দেশ চষে বেড়িয়েছেন। সংগঠনের জন্য কাজ করতে গিয়ে অন্য সব কষ্টকেই তিনি উপেক্ষা করেছেন। তিনি নিজে যেমন কাজ করতেন, তেমনি অন্যদেরও কাজ করতে উদ্বুদ্ধ ও অনুপ্রাণিত করতে পারতেন। সবার সঙ্গে মেলামেশার বড় গুণ ছিল তার। তার আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব কাউকে দূরে না ঠেলে কাছে টানত। যারা একবার তার সান্নিধ্য লাভ করেছেন তারাই তার আন্তরিকতার উষ্ণতায় মুগ্ধ হয়েছেন।
অগ্রজদের প্রতি যেমন গভীর শ্রদ্ধা, তেমনি অনুজদের প্রতিও ছিল তার অকাতর স্নেহ। মণি সিংহ, খোকা রায়, অনিল মুখার্জি, জ্ঞান চক্রবর্তীসহ যারা এই ভূখণ্ডে প্রগতিশীল, অসাম্প্রদায়িক-গণতান্ত্রিক রাজনীতির আলো হাতে পথ চলেছেন তাদের প্রতি অবিচল আস্থা রেখে নতুন সহযোগী তৈরিতে আয়শা আপা সচেষ্ট ছিলেন। সবাইকে নিয়ে একসঙ্গে কাজ করার জন্য ধৈর্য ও নিষ্ঠা প্রয়োজন, সেটাও আয়শা আপার মধ্যে পুরোপুরি ছিল। নারীর মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য দেশে সক্রিয় অনেক সংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত ‘সামাজিক প্রতিরোধ কমিটি’ পরিচালনায় তিনি যে মুনশিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন, তার প্রশংসা সবাই করেন।
সম্পত্তিতে হিন্দু নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠাসহ অন্য আইনি সুরক্ষা পাওয়ার পদক্ষেপ নিতে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন উদ্যোগের সঙ্গে একত্রে কাজ করেছেন আয়শা আপা। হিন্দুসহ বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের সঙ্গে তিনি একাধিকবার আলোচনায় বসেছেন। একটি সমতাপূর্ণ সমাজ প্রতিষ্ঠার সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য থেকে তিনি কখনো বিচ্যুত হননি।
মানবিক গুণের কারণেই আয়শা আপা অনেকের কাছেই ছিলেন অভিভাবকের মতো। ছাত্রাবস্থায় রোকেয়া হলে জুনিয়র ছাত্রীদের কাছে যেমন তিনি অভিভাবকের মতো ছিলেন, তেমনি পরবর্তী জীবনে আন্দোলন-সংগ্রামের বৃহত্তর পরিচিত মণ্ডলেও তিনি ছিলেন কার্যত অনেকের অভিভাবক। তিনি বিপদে-আপদে কতজনের যে পাশে দাঁড়িয়েছেন, পরামর্শ দিয়েছেন, তার হিসাব আর কে রেখেছেন!
কিছুদিন আগে আমি একটি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম। কথাবার্তার এক পর্যায়ে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ আমার কাছে আয়শা আপার কুশল জানতে চেয়ে বললেন, ‘আমরার নেত্রকোনার মাইয়া, সারা দেশের মানুষের সন্মান-ভালোবাসা অর্জন করছে। তার কাজ আমিও পছন্দ করি’।
রাষ্ট্রপতির কথায় গর্বে আমার বুক ভরে উঠেছিল। সত্যি তো, আয়শা আপা সারা জীবন কাজের মাধ্যমে কত মানুষের মন জয় করেছেন। তিনি চলে যাওয়ায় যে শূন্যতা তৈরি হলো তা সহজে পূরণ হবে না।
n লেখক : মুক্তিযোদ্ধা ও সমাজকর্মী