রহস্যময়, ভয়ঙ্কর এক লাল দরজা। লাল দরজার পেছনের কক্ষটা নির্জীব আর থমথমে থাকে লাশের সারিতে। চারদিকে যেন ভয়ানক একটা ভাব বিরাজ করে। অনেকেই এই ঘর থেকে ভয়ে দূরে থাকেন। খুব কম মানুষেরই সাহস হয় এই কক্ষে ঢোকার। দরজা খুললেই সামনে কতকগুলো কফিন। কোনোটা লাল, কোনোটা আবার গাঢ় খয়েরি। লাশ মোড়ানোর জন্য রাখা আছে খেজুর পাতার চাঁটাই। কুমিল্লা মেডিকেল কলেজের টিচিং মর্গের চিত্র এটি। এটি শুধু কুমিল্লা মেডিকেল কলেজের টিচিং মর্গের চিত্র নয়, দেশের সকল হাসপাতালের লাশঘরের চিত্রও প্রায় একই।
এই লাশঘরেই ডোমের পেশায় জীবন কাটিয়ে দিচ্ছেন মাহে আলম। বয়সের ছোঁয়া লেগেছে শরীরে। হালকা গড়নের শ্যামবর্ণ দেহ, তৈলাক্ত চুল, মুখে কিছু দাড়ি, হাসি-খুশি মুখ। এ যেন মাহে আলমের সার্বিক চিত্র!
৩৭ বছর ধরে লাশ কাটেন তিনি। কুমিল্লা মেডিকেল কলেজে চাকরির আগে দেশের বিভিন্ন সদর হাসপাতালে ডোমের দায়িত্বে ছিলেন মাহে আলম। প্রায় ৩ হাজার লাশের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে তার হাত ধরেই। মেডিকেলের শিক্ষার্থীদের কাছে মাহে আলম মামা প্রিয় এক চরিত্র। কেননা, তার হাত ধরেই শিক্ষকের তত্ত্বাবধানে ময়নাতদন্তের হাতেখড়ি তাদের।
বিপত্নীক মাহে আলমের তিন ছেলে ও দুই মেয়ে। বড় ছেলে মারা গেছেন। ডোম হিসেবে আয়ের অঙ্কটা খুব মোটা অঙ্কের না। তবুও আক্ষেপ নেই তার। আল্লাহ ভালোই রেখেছেন এই তৃপ্তিতেই সন্তুষ্ট মাহে আলম।
আমাদের সমাজের প্রচলিত ধারণা আর কাঠামোতে মাহে আলমদের বেঁচে থাকতে হয় কিছুটা যুদ্ধ করেই। পেশার কারণেই হয়তো সমাজ কিছুটা এড়িয়ে চলতে চায় তাদের। সন্তান কিংবা পরিবারকে পোহাতে হয় নানা বিড়ম্বনা।
জানা যায়, অনেক বেওয়ারিশ লাশের কবর দেওয়ার মতো অভিভাবক থাকে না। অভিভাবকহীন লাশগুলোর অভিভাবকের অভাব বুঝতে দেন না মাহে আলম। নিজ দায়িত্বেই দাফন-কাফনের ব্যবস্থা করেন তিনি। ময়নাতদন্তের পর মৃতদেহের পরিবার থেকে খুশি হয়ে সামান্য বকশিস দিলে নেন, নতুবা তার কোনো আলাদা চাহিদা নেই।
মাহে আলমের জীবনেও রয়েছে অসংজ্ঞায়িত কিছু কাহিনি। অনেক আগে এক ভয়াবহ দুর্ঘটনায় একসাথে করেছেন ২৮টি লাশের ময়নাতদন্ত। শত লাশের ভিড়ে কোনো এক মহিলার লাশে ছুরি চালাতে হাত কাঁপে এই সাহসী ব্যক্তির। কারণ লাশটি যে অবিকল মাহে আলমের স্ত্রীর চেহারা! কিন্তু পাষাণ হূদয়ের চাকরির দাবিতে সেই লাশে ছুরি চালাতেই হলো তাকে। স্বপ্নে এখনো তাড়া করে বেড়ায় এই কাহিনি। তবে এসব ভয় থামিয়ে রাখতে পারেনি এই লাশঘরের তত্ত্বাবধায়ককে।
দশটা সাধারণ মানুষের মতোই মাহে আলমদের জীবন। অন্যদের মতো তারাও মানুষ। তাদের ভয়ের চোখে দেখার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই। কুমিল্লা মেডিকেল কলেজের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘মাহে আলমের মতো মানুষরা আছেন বলেই আমাদের মতো শিক্ষার্থীরা সহজভাবে শিক্ষা সম্পন্ন করতে পারছি। সমাজের সবার উচিত এই পেশাকে সম্মানের চোখে দেখা এবং তাদের প্রাপ্য সম্মান দেওয়া।’