এক বনে এক শক্তিশালী সিংহ বাস করত। সে তার খাবারের জন্যে প্রতিদিনই বন থেকে খেয়াল-খুশিমতো অন্য পশু ধরে ধরে হত্যা করে বেড়াত।
বনের পশুরা সর্বদা সিংহের শিকারে পরিণত হওয়ার ভয়ে থাকত। এই ভীতিকর অবস্থা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্যে একদিন পশুরা একত্রিত হয়ে সিংহরাজের কাছে আবেদন জানাল। তারা বলল, ‘জাঁহাপনা, আপনি আমাদের রাজা। আমাদের ওপর আপনার অধিকার রয়েছে। কিন্তু আপনি যদি বাছবিচারহীনভাবে আমাদের হত্যা করতে থাকেন তাহলে তো সহসাই বন পশুশূন্য হয়ে পড়বে। তখন আপনার জন্যে কোনো খাবারই যে থাকবে না।’
সিংহ কিছুক্ষণ চুপ করে কী যেন ভাবল। তারপর হঠাত্ গর্জে উঠে বলল, ‘এখন তোমাদের কী সুপারিশ?’
পশুরা বলল, ‘হুজুর, আমরা আপনার আহারের জন্যে প্রতিদিন সকালে একটি করে নাদুস-নুদুস পশু পাঠাব। সেটি আপনি পরম তৃপ্তিতে খেতে পারবেন। এ নিয়ম চলতে থাকলে ভবিষ্যতে কখনো আপনার খাবারের অভাব দেখা দেবে না।’
পশুদের এ সুপারিশ সিংহের বেশ পছন্দ হলো। সেদিন থেকে শূকর, হরিণ, নীল ষাঁড়, মহিষ, জিরাফ ইত্যাদি নানা জাতের পশুর মধ্য থেকে পালাক্রমে প্রতিদিন একটি করে পশু সিংহের গুহায় পাঠানো শুরু হলো। সিংহ ওগুলো খেয়ে খেয়ে বেশ আরামেই দিন গুজরান করছিল।
এভাবে একদিন খরগোশের পালা এলো। সে হেলেদুলে বেশ দেরিতে সিংহের গুহায় পৌঁছাল। ততক্ষণে সিংহের ভারি খিদে পেয়ে গেছে। ছোট্ট খরগোশটিকে দেখে সে তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠল। সে গর্জে উঠে বলল, ‘একে তো সামান্য খাবার। তাও আবার পাঠাতে এত দেরি! আজ আমি বনের সব পশুর জান নিয়ে নেব।’
খরগোশ দেরির কারণ ব্যাখ্যা করে বলল, ‘হুজুর, আপনার খাবার হওয়ার জন্যে আমরা ছয়টি খরগোশ একসঙ্গে আসছিলাম। কিন্তু পথের মধ্যে অন্য একটি সিংহ পাঁচটি খরগোশকে মেরে খেয়ে ফেলেছে।’
একথা শুনে সিংহরাজ গর্জন করে বলল, ‘কার অমন দুঃসাহস যে আমার রাজত্বে অনধিকার প্রবেশ করল? কোথায় সেই হতভাগা?’
খরগোশ বলল, ‘ঐ তো, ওখানে হুজুর।’
সিংহ বলল, ‘হতচ্ছাড়াকে আমায় দেখিয়ে দাও।’
খরগোশটি রাজাকে পথ দেখিয়ে একটি কূপের কাছে নিয়ে গেল এবং আগন্তুক-সিংহটি কূপটির ভেতরে বলে জানাল।
সিংহরাজ কূপের ভেতরে তাকাল। কূপের স্বচ্ছ পানিতে নিজের ছায়া দেখে ওটাকে সে আগন্তুক-সিংহ মনে করল।
সিংহরাজ রাগে উচ্চস্বরে গর্জন করল। তার আকাশ ফাটানো গর্জন কূপের পানিতে প্রতিধ্বনি তুলল। সে আবার গর্জে উঠে বলল, ‘হতভাগা, আমি আজ তোমাকে উচিত শিক্ষা দেব।’ বলেই সে কূপে ঝাঁপিয়ে পড়ল এবং অথৈ পানিতে তলিয়ে গেল।
খরগোশ তাড়াতাড়ি বনে ফিরে গিয়ে সিংহরাজের মারা যাওয়ার খবরটি পশুদের জানিয়ে দিল।
প্রাচীন ভারতীয় উপকথা অবলম্বনে