মারুফা মির্জা,
চৌহালী (সিরাজগঞ্জ)
অতিথিপরায়ণ বাঙালিদের রীতি অনুযায়ী বাড়িতে আত্বীয়স্বজন এলেই ধুম পড়ে যায়। উত্সাহ-উদ্দিপনায় চলে আদর আপ্যায়ন। এরই এক ফাঁকে মুরগি ধরে জবাই ও বাড়ির পুকুর থেকে জাল দিয়ে ধরা মাছে চলে রান্নার আয়োজন। মিষ্টিমুখ করাতে নিজেদের গোয়াল ঘরের খাঁটি গরুর দুধ, খেঁজুরের রসের গুড় দিয়ে পিঠা-পায়েস না খাওয়ালেই নয়। কালের বিবর্তনে শহুরেদের কাছে এসব আয়োজন কিছুটা মলিন হলেও গ্রামীণ জনপদে ঐতিহ্যের এই ধারাবাহিকতা এখনো বিরাজমান। বিশেষ করে উপমহাদেশের ইসলাম প্রচারক প্রখ্যাত সুফি সাধক সিরাজগঞ্জে হযরত শাহ সুফি খাজা বাবা ইউনুছ আলী এনায়েতপুরী (র.)-এর এনায়েতপুর পাক দরবার শরীফে আসা দেশ-বিদেশের অতিথি ও ভক্ত জাকের ভাই-বোনদের জন্য আপ্যায়নে সেই ঐতিহ্যকে লালন করছে কর্তৃপক্ষ। রাসুলুল্লাহ (স.)-এর শান্তির বাণী প্রচারের মানবতাবাদী এই দরবার শরীফে এবার ২০১৯ সালের অতীতের মতোই বাত্সরিক ৩ দিনব্যাপী ওরশে ভারতের আসাম তথা সারাদেশের প্রায় ১০ লক্ষাধিক দাওয়াতী ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরা আপ্যায়িত হয়েছেন। তাদের আপ্যায়ন করা হয় কুমারদের তৈরি করা মাটির প্রায় লক্ষাধিক থালা বা শানকিতে। দরবারে স্থাপিত বৃহত্ পাকশালায় ৬শ’ স্বেচ্ছাসেবী পাচক রন্ধন কাজে দিনরাত নিয়োজিত ধর্মীয় এ আয়োজন সফল করেছেন।
জানা যায়, উপমহাদেশের অন্যতম সুফি সাধক ও ইসলাম প্রচারক এবং ভারত-বাংলাজুড়ে ছড়িয়ে থাকা ১২শ’ পীর-আউলিয়ার পথপ্রদর্শক হযরত খাজা বাবা ইউনুছ আলী এনায়েতপুরী (র.)-এর ১০৪তম ৩ দিনব্যাপী ওরশ শরীফ গত ১১ জানুয়ারি শুরু হয়। অন্যান্য বছরের আয়োজনকে ছাপিয়ে এবার বাড়ে ব্যাপকতা। যা আখেরি মোনাজাতের মাধ্যমে শেষ হলেও আরো দু-দিন থাকে এর কার্যক্রম। এই ওরশ শরীফে এবার ভারতের আসাম এবং দেশের প্রতিটি জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন থেকে প্রায় ১০ লাখের মতো ভক্তের সমাগম হয়। তাদের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালনে মসজিদ, মাজার, খাজা এনায়েতপুরী (র.) বাসভবনসহ বিস্তৃত এলাকায় করা হয় সব ধরনের ব্যবস্থা। আগত ভক্ত নারী-পুরুষের থাকার জন্য এনায়েতপুর মাজার এলাকাসহ পুরো গ্রামজুড়ে সুবিশাল প্যান্ডেল স্থাপনের পাশাপাশি আপ্যায়নেও গ্রহণ করা হয় বিশেষ আয়োজন। দরবারের ৪টি বিশাল ঘরের পাকশালাতে সর্বক্ষণ চলে মাছ, মাংস, সবজি, ভাত, ডাল রান্নার কাজ। এখানে তরকারি রান্নার জন্য ৭২টি ও ৭৪টি চুলায় ভাত রান্নায় স্বেচ্ছাশ্রমে নিয়োজিত ছিলেন ব্যবসায়ী, স্কুলছাত্র, শ্রমজীবী, শিশু, বৃদ্ধ থেকে শুরু করে শিল্পপতি শ্রেণির ৬শ’ মানুষ। যাদের অক্লান্ত পরিশ্রমে তৈরি হয় সুস্বাদু এসব খাবার। অনুষ্ঠানে অতিথি হয়ে আসা জাকেরদের আপ্যায়নে যেন কোনোকিছুর কমতি না থাকে সেজন্য কয়েকমাস আগে থেকেই চাহিদা অনুযায়ী করা হয় এর বাজার সদাই। ওরশে এবার প্রায় ১০ লক্ষাধিক ভক্তের খাবারের জন্য ১ হাজার ৫শ’ মন চাল, মাসকালাই ডাল ২৫০ মন, আলু ১ হাজার ৫শ’ মন, ২শ’ মন সরিষার তেল, ১৪ মন শুকনো মরিচ, ১০ মন হলুদ, লবণ ১২৫ মন, জিরা ২ মন, রসুন ৭৫ মন, আদা ১০০ মন, ৬ হাজার মন জ্বালানি কাঠ ও ১ লাখ টাকার অন্যান্য মসলা ব্যবহার করা হয়েছে। পাশাপাশি মাংসের ৩ শতাধিক ছোট-বড় গরু, প্রায় ২ হাজার ছাগল-ভেড়া জবাই করা হয়। এছাড়া শুক্রবারের জন্য ১ ট্রাক মাছ ও প্রায় ৫শ’ মন সবজি রান্না হয়। ২শ’ বড় হাঁড়িতে হয়েছে এসব রান্না। খাবার পরিবেশন করা হয়েছে প্রায় লক্ষাধিক মাটির থালায় (শানকিতে)।
দেশের বৃহত্ এই পাকশালার প্রধান খাদেম হিসেবে নিয়োজিত বৃদ্ধ মো. চাঁন শাহ সরকার ও ফটিক সরকার জানান, এবার ওরশে দেশ-বিদেশের ভক্তদের অতীতের চেয়ে বেশি আগমন হয়। মূলত, তারা খাজা এনায়েতপুরী (র.) মাজার জিয়ারত ও ধর্ম সাধনার জন্য আসেন। খাজা পীর ইউনুছ আলীর নির্দেশিত শান্তির পথেই তার ছেলে দরবারের বর্তমান গদ্দিনশীন পীর হযরত খাজা বাবা কামাল উদ্দিন (নুহু মিয়া) জাকেরদের যথাযথ সম্মান ও আপ্যায়িত করে আসছেন। আর এই আতিথিয়তার জন্য তারা ৬ শতাধিক স্বেচ্ছাসেবক নিয়োজিত করেন। এখানে অনেক পরিশ্রম করলেও তাদের কিছু মনে হয় না।
এ পাকশালায় স্বেচ্ছাশ্রমে কাজ করা ৬শ’ মানুষ সবাই নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে নিয়োজিত। কেউ চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী, তাঁতশ্রমিক কেউবা স্কুল-কলেজের ছাত্র। ওরশের সময় এলেই তারা নিজ উদ্যোগে এখানে কাজে যোগ দেয়। প্রায় ৪৫ বছর ধরে পাকশালায় কাজ করা রুপনাই গ্রামের তাঁত শ্রমিক মোহাম্মদ আলী মুন্সী, ঢাকায় কর্মরত মুজাহিদ হোসেন ও এনায়েতপুর গ্রামের ৮ম শ্রেণির ছাত্র মেহেদী হাসান জানান, ওরশের সময় এলেই তারা যে যার মতো দরবারের পাকশালায় ছুটে যান। আল্লাহপাকের সন্তুষ্টি লাভে ইসলামি এই মহাসমাবেশে ভক্তদের মুখে তারা খাবার তুলে দিতে কাজ করতে পেরে আনন্দিত। এ সময়ে প্রচুর পরিশ্রম করলেও শরীরে ক্লান্তি আসে না। উত্সবমুখর পরিবেশেই সবাই কাজ করে থাকে।
এদিকে ওরশ শরীফে প্রতিবার আসা ঢাকার যাত্রাবাড়ির বাসিন্দা ভক্ত খোরশেদ আলম ও নরসিংদীর পাঁচদোনার মঞ্জুরুল আলম জানান, ঐতিহ্যের ওরশ শরীফে দুই বেলা খাবার আয়োজন দরবার শরীফই করে থাকে। সেখানে পাকশালার খাবারটা তারা নিয়ামক হিসেবেই গ্রহণ করেন। খাবারের যে স্বাদ তা কোথাও মেলা ভার। এক কথায় অমৃত। এখানে সৃষ্টিকর্তার অশেষ মেহেরবানীতে কোনো মজুরি ছাড়াই স্বেচ্ছাসেবকরা খাবার তৈরি করে থাকে বলেই বৃহত্ এই পাকশালা সবার কাছে সমাদৃত। রান্না ঘরটির বয়স চলছে ১০৪ বছর। যা ঐতিহ্যের অংশ হয়েই বেঁচে রয়েছে।