যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশের অনেকেই করোনা টিকার নিরাপত্তার বিষয়টি নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে টিকা নেওয়ার ব্যাপারে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করছে। সাধারণত যে কোনো টিকা মানবদেহে প্রয়োগের জন্য নিরাপদ কি না তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে নিশ্চিত হতে ৮-১০ বছর বা আরো বেশি সময় লেগে যায়। কিন্তু ফাইজার, মডার্না ও অক্সফোর্ডসহ অন্যান্য টিকা দীর্ঘ সময় নিয়ে পরীক্ষা না করে মাত্র ১০-১১ মাসের ট্রায়াল শেষে মানবদেহে প্রয়োগের জন্য কতটুকু নিরাপদ, তা নিয়ে অনেকের মনে কিছুটা ভয়ভীতি সৃষ্টি হওয়াই স্বাভাবিক। তাছাড়া কোভিড-১৯ সংক্রমণের বিরুদ্ধে টিকাগুলো কত দিন কাজ করবে তাও আমরা জানি না এবং এসব জানতে বেশ কয়েক বছর লেগে যাবে। সম্প্রতি ফাইজার-বায়োএনটেকের করোনা টিকা নেওয়ার পর কিছু মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। টিকা গ্রহণের দুই দিন পরই পর্তুগালের এক স্বাস্থ্যকর্মী, পাঁচ দিন পর সুইজারল্যান্ডের ৯১ বছর বয়সি এক বৃদ্ধা এবং কয়েক দিন পর নরওয়ের দুই স্বাস্থ্যকর্মীর মৃত্যুর ঘটনায় কিছু মানুষের মধ্যে করোনার টিকা নিয়ে কিছুটা ভয় সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টনে মডার্নার করোনা টিকা নেওয়ার পর এক চিকিত্সকের দেহে তীব্র অ্যালার্জি প্রতিক্রিয়া, মাথা ঘোরা ও হূদ্স্পন্দন বেড়ে যাওয়া ইত্যাদি লক্ষণ দেখা দিয়েছে।
ইসরাইলি সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, ফাইজারের টিকা নেওয়ার পরও এ পর্যন্ত ২৪০ জন করোনা সংক্রমিত হয়েছেন। সম্প্রতি ভারত কো-ভাকসিন নামে শিম্পাঞ্জি অ্যাডেনো ভাইরাসকে ভেক্টর হিসেবে ব্যবহার করে করোনার একটি টিকা ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল শেষ করার আগেই ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে। ফাইজার ভ্যাকসিনের ট্রায়ালের সময় পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কথাও অনেকেই জানিয়েছিলেন এবং যাদের অ্যালার্জি সমস্যা আছে তাদেরকে ফাইজার করোনা টিকা না নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিল যুক্তরাজ্যের ওষুধ নিয়ন্ত্রক সংস্থা। করোনা টিকার এসব নেতিবাচক সংবাদ ও টিকা গ্রহণের পর এ ধরনের মৃত্যুর ঘটনা সাধারণ জনগণ ছাড়াও বিজ্ঞানীসহ ডাক্তারদের ভাবিয়ে তুলেছে এবং করোনা টিকার প্রতি কিছু মানুষের অনাস্থা সৃষ্টি হয়েছে। মূলত অনাস্থার এ মনোভাব সৃষ্টির পেছনে যেসব কারণ কাজ করছে, তার মধ্যে রয়েছে করোনা টিকাগুলোর ক্ষতিকর প্রতিক্রিয়া নিয়ে ভয় এবং কী পরিমাণ সময় এসব টিকা মানুষকে সুরক্ষা দেবে—তা নিয়ে দুশ্চিন্তা। করোনার টিকাগুলোর আদৌ কি ক্ষতিকর প্রতিক্রিয়া রয়েছে? টিকা নেওয়ার পর প্রথম তিন দিন পর্যন্ত নির্দিষ্ট প্রতিক্রিয়া বা সাধারণ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হওয়া স্বাভাবিক; টিকা প্রয়োগের স্থানের চারদিকে লাল ভাব, ফোলা ভাব বা ব্যথা হতে পারে। এছাড়া শরীরে ক্লান্তি ভাব, জ্বর, মাথা ব্যথার পাশাপাশি পেশি বা জয়েন্টে ব্যথা হতে পারে। এসব প্রতিক্রিয়াগুলো টিকা যে কাজ করছে তা ইঙ্গিত করে, এতে ভয়ের কিছু নেই। করোনার টিকা ছাড়াও যে কোনো টিকা, অ্যান্টিবায়োটিক ও অন্যান্য রাসায়নিক উপাদানের অ্যালার্জিকসহ কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কারো কারো শরীরে দেখা দেয়।
ফাইজার ও মডার্নার টিকাতে করোনার স্পাইক প্রোটিন এন্টিজেন তৈরির জন্য কেবল রাসায়নিক উপায়ে তৈরি জিনগত কোড ব্যবহার করে সৃষ্ট এমআরএনএ মানবদেহের কোষে প্রবেশ করানো হয় এবং মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পর্যাপ্ত পরিমাণ স্পাইক প্রোটিন তৈরির পর পরই লিপিড ন্যানো পার্টিকেলগুলো যা এমআরএনএ-এর বাহক হিসেবে কাজ করে, তা ভেঙে যায়, অর্থাত্ এমআরএনএ নষ্ট হয়ে যায়। কাজেই, এমআরএনএ টিকা দ্বারা ক্ষতিকর কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সৃষ্টির সম্ভাবনা কম।
অপরদিকে, অক্সফোর্ডের ডিএনএ টিকাটির করোনার স্পাইক প্রোটিন তৈরির জন্য জিনগতভাবে পরিবর্তিত দুর্বল প্রকৃতির শিম্পাঞ্জি অ্যাডেনো ভাইরাস ব্যবহার করা হয় এবং এ ভাইরাসটি মানুষের মধ্যে সংক্রমণ সৃষ্টি বা সংখ্যা বৃদ্ধি করতে পারে না বলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা দ্বারা স্বীকৃত অন্যান্য নিরাপদ টিকা তৈরিতে ব্যবহূত হয়ে আসছে।
টিকাগুলোর প্রথম ডোজ নেওয়ার পর আমাদের শরীরে করোনার স্পাইক প্রোটিন এন্টিজেন তৈরির মাধ্যমে করোনা আক্রমণের বিরুদ্ধে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত অ্যান্টিবডি তৈরি করতে আট থেকে ১০ দিনের মতো লেগে যেতে পারে। এছাড়া এসব টিকা সর্বাধিক ৯৫ শতাংশ সুরক্ষা দেয়, তাই টিকার সম্পূর্ণ ডোজ নেওয়ার পরও করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি ৫ শতাংশ থেকেই যায়। এজন্যই করোনা টিকা নেওয়ার পরও সামান্যসংখ্যক মানুষের মধ্যে করোনা সংক্রমণ দেখা দিতে পারে। তাছাড়া, যে কোনো টিকা শুধু এর টার্গেট রোগ সৃষ্টিকারী জীবাণু দ্বারা আক্রান্ত নয়, এমন সুস্থদেহেই প্রয়োগ করতে হয়, ইতিমধ্যে আক্রান্ত দেহে এসব টিকা কাজ করে না। আর করোনা টিকা নেওয়ার পর যেসব তীব্র পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ও মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে, তা হয়তো অন্য কারণে ঘটে থাকতে পারে। তার পরও খতিয়ে দেখতে হবে, টিকার কারণেই কি মৃত্যু হয়েছে, নাকি পুরো ব্যাপারটাই কাকতালীয়? তবে, ইতিমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এবং কানাডাতে যথাক্রমে ৫৩ লাখ, ১৪ লাখ এবং ১ লাখ ৫০ হাজার লোক টিকার প্রথম বা দুটি ডোজ নিয়েছেন। যেহেতু, তাদের ক্ষেত্রে তেমন কোনো ঘটনার কথা জানা যায়নি, তাই সম্ভবত এসব লোকের মৃত্যু কাকতালীয়ই। কাজেই, করোনা টিকার প্রতি অনাস্থার মনোভাব পরিহার করে এটাকে জীবন রক্ষাকারী উপাদান হিসেবে গ্রহণপূর্বক কোভিড-১৯-এর ভয়াবহতা থেকে পৃথিবীর মানুষের মুক্তি নিশ্চিত করতে হবে।
n লেখক :অধ্যাপক, মাইক্রোবায়োলজি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়