চোরের রাজ্যে সবই গদ্যময়

অন্যদাশঙ্কর রায় তাহার বিখ্যাত ‘খুকু ও খোকা’ ছড়ায় বলিয়াছেন, ‘তেলের শিশি ভাঙল বলে/ খুকুর পরে রাগ করো/ তোমরা যে সব বুড়ো খোকা ভারত ভেঙে ভাগ করো/ তার বেলা?’ এই ছড়াতেই তিনি আবার বলিয়াছেন, ‘চায়ের বাগান কয়লাখনি/কলেজ খানা আপিস-ঘর/ চেয়ার টেবিল দেয়ালঘড়ি/ পিয়ন পুলিশ প্রোফেসর!/ তার বেলা?’ আমাদের বাংলাদেশের চালচিত্র দেখিয়া অন্নদাশঙ্কর রায়ের এই ছড়াই মোক্ষম বলিয়া প্রতীয়মান হয়।

একটি ছোট্ট ঘটনা হইতেই আমরা সার্বিক চিত্র দেখিবার প্রয়াস পাইয়াছি। পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পুরাতন ভবনে বসবাস করিতেছেন ম্যানেজিং কমিটির সভাপতির ভাই। সেইখানে বিদ্যুতের লাইন দেওয়ার জন্য বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষককে চাপ দেন ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি। প্রধান শিক্ষক অপারগতা প্রকাশ করিলে তাহাকে চেয়ার তুলিয়া এলোপাতাড়ি পিটাইয়া আহত করেন ঐ সভাপতি। অবৈধ একটি কাজ না করিবার কারণে শারীরিকভাবে আহত করার এই দুঃসাহস কোথায় পাইলেন তিনি? হ্যাঁ, পাইয়াছেন চারিদিকের সকল কিছু প্রত্যক্ষ করিয়া। বিদ্যুতের লাইন না দেওয়ার বিষয়টিই ধরা যাউক। কেন তিনি বিদ্যুতের অবৈধ সংযোগ দিতে চাপ দিয়াছেন? কারণ তিনি হয়তো দেখিয়াছেন, সমগ্র দেশে বিদ্যুত্ বিভাগের বকেয়া পড়িয়াছে সাড়ে ৮ হাজার কোটি টাকা! প্রভাবশালী ব্যক্তিদের পাশাপাশি খোদ সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের নিকট বিদ্যুত্ বিভাগের পাওনা ৮৫০ কোটি টাকা। আধা সরকারি খাতের নিকট পাওনা প্রায় ২০০ কোটি টাকা। ইহার মধ্যে একটি মন্ত্রণালয়ের নিকটই পাওনা ৬৯৫ কোটি টাকা। এই বকেয়া আমরা এক মাস দুই মাস নহে, বত্সরের পর বত্সর পড়িয়া থাকিতে দেখি। এমনকি বিদ্যুত্ বিলের বরাদ্দ অর্থ অন্য খাতে ব্যবহার করিবার মতো ধৃষ্টতাও আমাদের চক্ষু এড়ায় না। সরকারি দপ্তরের এই অনিয়মের পাশাপাশি একশ্রেণির প্রভাবশালী লুটিয়া লইতেছে ব্যাংক। হাজার হাজার কোটি টাকা লইয়া যাওয়া লোকদের নিকট হইতে অর্থ আদায় না করিয়া ছা-পোষা লোকদের নিকট হইতে অর্থ আদায়ের জোর তত্পরতা যখন দেখিতে পাওয়া যায়, তখন আর আইন ও নিয়মের প্রতি ভরসা রাখা কঠিন হইয়া পড়ে। এহেন পরিবেশে সভাপতি লোকটি হয়তো ভাবিয়াছেন, কোটি কোটি টাকার বিদ্যুত্ বিল পরিশোধ করা হয় না, আর আমার ভাইয়ের অবৈধভাবে বসবাসের রুমটিতে সামান্য একটু আলো দেওয়া হইবে না! তিনি আসলে দেখিয়া শিখিয়াছেন। ইহা একপ্রকার সাইক্লিক রিঅ্যাকশন।

একটি বিদ্যালয়ের পুরাতন ভবনে ম্যানেজিং কমিটির সভাপতির ভাই বসবাস করেন কোন ক্রাইটেরিয়ায়? সেইখানেও কথা আছে। জেলায় জেলায় রহিয়াছেন শিক্ষা কর্মকর্তাগণ, উপজেলায় রহিয়াছেন উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা, প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা। ঐ ব্যক্তি জানেন যে, বত্সরের পর বত্সর থাকিলেও কোনো অসুবিধা নাই। তিনি জানেন, যাহাদের বলিবার কথা তাহারা বলিবেন না যে ‘কেন আপনি সরকারি বিদ্যালয়ের পুরাতন ভবনে অবস্থান লইয়াছেন! ইহা আপনার পৈতৃক সম্পত্তি নহে, ইহা সরকারের শিক্ষা বিভাগের সম্পত্তি এবং ইহা রক্ষণাবেক্ষণের জন্যই আমাদিগকে সরকার পদবি দিয়া থাকে, বেতন-বোনাস দিয়া থাকে!’ এই না বলাই তাহাদের প্রশ্রয় দিয়া চলিয়াছে। অর্থাত্ যেইখানে আইন নাই, আইনের  অনুসরণ নাই, আইনের প্রয়োগ নাই—সেইখানে অনিয়মই হইয়া উঠে নিয়ম। ইহা কেবল শিক্ষা বিভাগ নহে, সকল ক্ষেত্রেই বিরাজমান। যেই দেশের সমাজ বা প্রশাসনের উপরের স্তরে অনিয়ম বিদ্যমান থাকে, সেই দেশে মাঠ পর্যায়ে নিয়ম পালিত হইবে না ইহাই স্বাভাবিক। মোদ্দা কথা, বুড়ো খোকাদেরই প্রথম পথে আসিতে হইবে, পথে আনিতে হইবে। তাহা না হইলে সমাজের কোনো স্তর হইতেই কোনো অনিয়ম দূর করা যাইবে না।