কৃষকদের ১২০০ বিঘা জমি অন্যের নামে নামজারি

রূপগঞ্জে সহকারী ভূমি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ

রূপগঞ্জ (নারায়ণগঞ্জ) সংবাদদাতা

রূপগঞ্জ উপজেলার গোলাকান্দাইল ইউনিয়ন সহকারী ভূমি কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি আর ঘুষ-বাণিজ্যের অভিযোগ পাওয়া গেছে। টাকার বিনিময়ে অনিয়মকেই নিয়ম করা তার কাজ। গত এক বছরে গোলাকান্দাইল ইউনিয়নের আধুরিয়া, কেশরাবো, ভালুকাবো মৌজার কৃষকদের ১ হাজার ২০০ বিঘা জমি অবৈধভাবে আবাসন প্রকল্পের মনোনীত ব্যক্তির নামে নামজারি করা হয়েছে বলে অভিযোগ তার বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগীরা বহু আবেদন-নিবেদন, সভা-সমাবেশ, বিক্ষোভ-মানববন্ধন করেও কোনো সুফল পাচ্ছে না।

সরেজমিনে জানা গেছে, গোলাকান্দাইল ইউনিয়ন ভূমি অফিসে নিয়ম বহির্ভূতভাবে ভূমি উন্নয়ন কর (খাজনা) আদায়, জমির নামজারি, সরকারি জমি রক্ষণাবেক্ষণ, বন্দোবস্ত ও অর্পিত সম্পত্তি লিজ দেওয়া, এক জনের জমি অন্য জনের নামে নামজারি করা এবং বিনা নোটিশে নামজারি কর্তন করে অন্যের নামে অন্তর্ভুক্ত করা এখন নিয়মে পরিণত হয়েছে। এ নিয়ে স্থানীয় জমিমালিকদের সীমাহীন দুর্ভোগের শিকার হতে হচ্ছে। তার কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছেন এলাকবাসী।

অভিযোগ রয়েছে, ঘুষ ছাড়া কোনো কাজই করেন না ঐ কর্মকর্তা। নিষ্কণ্টক সাধারণ জমির নামজারিতেও তিনি বিঘাপ্রতি আদায় করেন ১৫ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা। আর ‘খ’ তপশিলভুক্ত জমির ক্ষেত্রে বিঘাপ্রতি নেন ৯০ হাজার থেকে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা। দাবিকৃত টাকা না দিলেই নানা অজুহাতে ফাইল আটকে রাখেন। এমনকি ঘুষবাণিজ্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করলেই তার সুবিধাভোগী প্রভাবশালীদের দিয়ে জমিমালিকদের হয়রানি করে থাকেন। ভুক্তভোগী আধুরিয়া এলাকার সিরাজ মিয়া বলেন, তহশিলদার আনোয়ার হোসেনের দাবিকৃত ২০ হাজার টাকা না দেওয়ায় তার ৩৩ শতাংশ জমির নামজারির আবেদন বাতিল করে দেন। একই এলাকার এবাদুল হোসেনের কাছে দাবিকৃত ১ লাখ টাকা না দেওয়ায় তার ৬৯ শতাংশ জমি নামজারির আবেদন বাতিল করেন। গোলাকান্দাইল এলাকার সেলুন দোকানি প্রদীপ শীলের ১৪ শতাংশ জমি ১০ হাজার টাকার বিনিময়ে নামজারির প্রস্তাবে স্বাক্ষর করে উপজেলা সহকারী কমিশনারের (ভূমি) কার্যালয়ে পাঠান। নিয়ম বহির্ভূতভাবে বিনা নোটিশে আধুরিয়া এলাকার মাসুম মিয়ার নামজারিকৃত সাড়ে ৫ বিঘা জমি, কুমারটেক এলাকার আফতাব উদ্দিনের নামজারিকৃত ৩২ শতাংশ জমি, একই এলাকার কমলা রানীর ৫ বিঘা জমি টাকার বিনিময়ে অন্যের নামে নামজারি করে দেন ঐ কর্মকর্তা। এক্ষেত্রে উপজেলা সহকারী কমিশনারের (ভূমি) সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলেও অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।

গোলাকান্দাইল ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য বাচ্চু মিয়া বলেন, নিয়ম বহির্ভূতভাবে গত এক বছরে গোলাকান্দাইল ইউনিয়নের প্রায় ১ হাজার ২০০ বিঘা জমির নামজারি কর্তন করে অন্যের নামে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এ অভিযোগ করলেই জমিমালিকদের বিবিধ মামলা করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। আধুরিয়া এলাকার আবদুল মালেক বলেন, ভূমি অফিসে নিয়ম বহির্ভূতভাবে ভূমি উন্নয়ন কর আদায়, নামজারি, সরকারি জমি রক্ষণাবেক্ষণ, বন্দোবস্ত ও অর্পিত সম্পত্তি লিজ দেওয়ায় অনিয়ম চলছেই। ভূমি অফিসের সেবা নিতে এসে সাধারণ মানুষ প্রতিনিয়তই হয়রানির শিকার হচ্ছে।

এ ব্যাপারে আনোয়ার হোসেন তার বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘নিয়মানুযায়ী নামজারি আবেদনের ফাইল উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) কর্মকর্তার অফিসে পাঠানো হয় । ফাইল মঞ্জুর-না মঞ্জুর করা আমার কাজ নয়। তবে প্রতিটি ফাইলের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে আমাকে জবাবদিহি করতে হয়।’ রূপগঞ্জ উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) আফিফা খান বলেন, সরকারি নিয়মানুযায়ী ভূমি অফিস চলছে। কোনো নিয়ম বহির্ভূত কাজ হয়নি। তবে লিখিত অভিযোগ পেলে সুষ্ঠু তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক মো. মোস্তাইন বিল্লাহ বলেন, জমির নামজারি করতে সরকারি খরচ মাত্র ১ হাজার ১৭০ টাকা। যদি কেউ এর বেশি দাবি করে কিংবা আদায় করার চেষ্টা করে তবে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।