জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ হিসেবে দায়িত্ব হারাতে পারে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এনআইডির কার্যক্রম নির্বাচন কমিশনের পরিবর্তে নাগরিকদের তথ্যভাণ্ডার সংরক্ষণ সংক্রান্ত পৃথক একটি বিধিবদ্ধ সংস্থা গঠনের মতামত দিয়েছে মন্ত্রিপরিষদ গঠিত পাঁচ সদস্যের কমিটি। একই সঙ্গে নাগরিকদের গুরুত্বপূর্ণ এই কাজটির দায়িত্ব মন্ত্রিপরিষদের নিয়ন্ত্রণাধীন সিভিল রেজিস্ট্রেশন অ্যান্ড ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকসকে (সিআরভিএস) দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। তবে ইসির সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত ১২টি বছর প্রায় ১১ কোটি নাগরিকের জন্য নির্ভুল তথ্যভাণ্ডার গড়ে তোলার পর তা অন্য প্রতিষ্ঠানকে নিয়ন্ত্রণ দেওয়া সমীচীন নয় বরং ইসির অধীন এনআইডিকে অধিদপ্তরে রূপ দিলে ভালো হবে।
এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) শাহাদাত হোসেন চৌধুরী ইত্তেফাককে বলেন, এনআইডি সরকারের কাজ। আইন-বিধির মাধ্যমে সরকার ইসিকে দায়িত্ব দিয়েছে, ইসির অধীন রাখা বা না রাখা সরকারের সিদ্ধান্ত। তবে ২০০৮ সালে ছবিসহ ভোটার তালিকা প্রণয়নের আইন ও বিধির মাধ্যমে এনআইডির দায়িত্ব অর্পণ করা হয় নির্বাচন কমিশনের কাছে। দক্ষতার সঙ্গে সরকারের প্রদত্ত দায়িত্ব পালন করে আসছে কমিশন। সরকার যদি মনে করে এটি অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান বা সংস্থার কাছে দায়িত্ব অর্পণ করবে তা সরকারের ব্যাপার।
সম্প্রতি এনআইডি নিবন্ধন কার্যক্রমে নিজেদের অংশের দায়িত্ব চেয়ে একটি প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠিয়েছিল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রস্তাবনায় বলা হয়, আমাদের নাগরিক নিরাপত্তা, চোরাচালান প্রতিরোধসহ অন্যান্য বিষয়ের জন্য এটি তাদের দায়িত্ব দেওয়া দরকার। বাস্তবতার ভিত্তিতে এটির গ্রহণযোগ্যতাসহ সামগ্রিক বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের মতামত চেয়েছিল প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। পরে মতামত তৈরির জন্য অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন ও বিধি অনুবিভাগ) সোলতান আহ্মদকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। কমিটি গঠনের অফিস আদেশের কার্যপরিধিতে বলা হয়েছে, ‘নির্বাচন কমিশনের বদলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে জাতীয় পরিচয়পত্র নিবন্ধন কার্যক্রম স্থানান্তরের চ্যালেঞ্জসমূহ নির্ণয় করা এবং মোকাবিলার কৌশল সুপারিশ করা, এরূপ স্থানান্তরে কী কী আইন, বিধি ও অবকাঠামো পরিবর্তন করা প্রয়োজন তা নিরূপণ করা এবং এ রূপান্তরে ফলপ্রসূ ফলাফল আসবে কি না, তা মূল্যায়ন করা।’ কয়েকটি বৈঠক করে সম্প্রতি প্রতিবেদন পেশ করেছে কমিটি।
ঐ প্রতিবেদনের বিষয়ে কমিটির প্রধান সোলতান আহ্মদ ইত্তেফাককে বলেন, সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে কমিটি প্রতিবেদন উপস্থাপন করেছে। প্রতিবেদনে এনআইডির দায়িত্ব ‘সিআরভিএস’-এর ওপর ন্যস্ত করা যেতে পারে বলে সুপারিশ করা হয়েছে। সিআরভিএসের মাধ্যমে কাজটি করা সম্ভব হলে অর্থ সাশ্রয় হবে বলে মতামত দেওয়া হয়েছে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ গঠিত কমিটি সংবিধান-আইন-বিধি পর্যালোচনা এবং মতামত শেষে এনআইডির নিয়ন্ত্রণের প্রসঙ্গে সুপারিশে বলেছে, ‘মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর তত্ত্ববধানে থেকে সব মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয় সাধন করে থাকে। নাগরিকের ঠিকানা, জন্ম, মৃত্যুসহ অন্য তথ্যাদির বিষয়ে এই বিভাগ (মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ) সিআরভিএস কার্যক্রম পরিচালনা করে। জাতীয় পরিচায়পত্রও এক ধরনের সিভিল রেজিস্ট্রেশন। সুতরাং, জাতীয় পরিচয়পত্রসহ অন্যান্য সিভিল রেজিস্ট্রেশনের সব কার্যক্রম নির্বাহী কর্মকাণ্ড হিসেবে বিদ্যমান আইন, নীতি ও বিধি সংশোধনক্রমে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অধীনে একটি কর্তৃপক্ষের আওতায় ন্যস্ত করার পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে।’
সিআরভিএস যেভাবে কাজ করবে :একটি একক আইডি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে রাষ্ট্রের প্রত্যেক নাগরিককেই চিহ্নিতকরণের মাধ্যমে তার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাসমূহ সংঘঠিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নিবন্ধত করা (সিভিল রেজিস্ট্রি) এবং তার ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের পরিসংখ্যান (ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকস) তৈরি করার নিয়মিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়াই হলো সিআরভিএস। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ যুক্তি তুলে ধরে বলেছে, জন্ম, মৃত্যু, মৃত্যুর কারণ, বিবাহ, তালাক ও দত্তক-এই ছয়টি বিষয় আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সিআরভিএসের অন্তর্ভুক্ত হিসেবে ধরা হয়। বাংলাদেশে এই ছয়টি বিষয়সহ মাইগ্রেশন, শিক্ষাসহ সংশ্লিষ্ট আরো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করে একটি সমন্বিত সেবা প্রদান ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা প্রয়োজন।