করোনা মহামারিকালে কৌশলগত দিক থেকে চীনা হাই-টেক আরো উন্নততর হয়েছে। দেশটির উচ্চাভিলাষী বেল্ট অ্যান্ড ইনিশিয়েটিভ গত দুই বছর খুব একটা ভালো সময় পার করেনি। এটি প্রেসিডেন্ট শি জেনপিংয়ের একটি স্বপ্নের একটি প্রকল্প। যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ বেল্ট অ্যান্ড ইনিশিয়েটিভ আসলে চীনের একটি ‘ঋণ ফাঁদ’। গরিব ও উন্নয়নশীল দেশগুলোকে এই ফাঁদে ফেলে দেশগুলোর অর্থনৈতিক স্বাধীনতা হরণ করা। এভাবে চীন নিজের নতুন অর্থনৈতিক সাম্রাজ্য বিস্তারের চেষ্টা করছে। যুক্তরাষ্ট্র মিত্র ও সহযোগী দেশগুলোকে বারংবার এ বিষয়ে সতর্ক করে দিয়ে বলে এসেছে যে, তারা যেন এই ফাঁদে পা না দেয়। গত বছর গ্রীষ্মে করোনা মহামারির রূপ নেয়। প্রকল্পের অন্তত ৬০ শতাংশ কাজের ওপর কিছুটা হলেও মহামারির প্রভাব পড়েছে বলে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় স্বীকার করেছে। চীনের ঋণদান ক্ষমতা উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমেছে। ফলে অর্থ সংকটে পড়তে চলেছে চীনের ঋণের ওপর নির্ভরশীল দেশগুলো। বিষয়টি বেইজিংয়ের জন্য সুখকর নয়।
চাপের মুখে পড়লেও করোনার ফলে বেল্ট অ্যান্ড ইনিশিয়েটিভ প্রকল্প অবশ্য পরিত্যক্ত হয়নি। বেইজিং অবশ্য সরকারিভাবে প্রকল্পের সার্থকতা নিয়ে এখনো উচ্চকণ্ঠ। ধারণা করা হচ্ছে, গত বছরের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে চীন এ বছর দেশে ও বিদেশে অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ কমিয়ে দেবে। পরিবর্তে জনস্বাস্থ্য (বিশেষ করে ভ্যাকসিন) পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি এবং ডিজিটাল সেবায় নিয়োগ করবে। বিষয়টি বেল্ট অ্যান্ড ইনিশিয়েটিভেরই আরেকটি দিক। এখানে কাঠামোগত বিনিয়োগের চেয়ে বাণিজ্যই মুখ্য।
চীনের ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড রিফর্ম কমিশনের মুখপাত্র মেই উয়েই নভেম্বরে স্বীকার করেন যে করোনার ফলে বেল্ট অ্যান্ড ইনিশিয়েটিভ প্রবল চাপের মুখে পড়েছে। তবে তিনি একথাও বলেন যে, পরিস্থিতি নতুন সম্ভবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে। নতুন বাস্তবতাকে তিনি হেলথ সিল্ক রোড, ডিজিটাল সিল্ক রোড ও গ্রিন সিল্ক রোড বলে অভিহিত করেন। উল্লেখ্য, উয়েই বেল্ট অ্যান্ড ইনিশিয়েটিভ প্রকল্প তত্ত্বাবধানের দায়িত্বে আছেন। কমিশনের ভাইস চেয়অরম্যান নিং জিঝে হংকংয়ে বক্তৃতাকালে এ সম্পর্কে বিস্তারিত তুলে ধরেন। তার বক্তব্যের শিরোনাম ছিল ‘হেলথ সিল্ক রোড-কোভিড ১৯ ভ্যাকসিন রেস’। বলা অনাবশ্যক এটি এখন বেইজিংয়ের গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার। মহামারি নিয়ন্ত্রণে ভ্যাকসিন তৈরির প্রতিযোগিতায় লিপ্ত পশ্চিমা দেশগুলো। চীন এই প্রতিযোগিতায় নিজেকে সম্মুখসারিতে রাখতে আগ্রহী। প্রাচ্যের দেশগুলোতে ভ্যাকসিন পৌঁছানোর ক্ষেত্রে চীন এগিয়ে রয়েছে। বিশেষ করে ইন্দোনেশিয়া ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের নাম এক্ষেত্রে উল্লেখ করা যায়। ভ্যাকসিন উত্পাদনকারী প্রতিষ্ঠান সিনোফার্ম ও সিনোভাক ইতিমধ্যেই দেশ দুটোতে লাখ লাখ ডোজ ভ্যাকসিন সরবরাহ করেছে। বেল্ট অ্যান্ড ইনিশিয়েটিভের সহযোগী দেশগুলোর কাছে সুলভে ভ্যাকসিন পৌঁছাতে চীন বিদেশি ক্রেতাদের ব্যাপক ভর্তুকির পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।
গ্রিন সিল্ক রোড চীনের আরেকটি উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা যার মাধ্যমে দেশটি বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে ইমেজ উজ্জ্বল করতে চায়। দেশটি এরমধ্যেই ২০৬০ সালের মধ্যে কার্বন নির্গমণের মাত্রা দ্বিগুণ পরিমাণ কমিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। পরিকল্পনার অংশ হিসেবে চীন উইন্ড টারবাইন, ফটোভোল্ট্যাকিস, ইলেকট্রিক যানবাহন, লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারি এবং স্মার্ট গ্রিড প্রযুক্তির আন্তর্জাতিক বাজার ধরার উদ্যোগ নিয়েছে। গত বছর (২০১৯) বিশ্ববাজারে বিক্রি হওয়া ফটোভোল্ট্যাকিস সামগ্রীর ৭০ শতাংশই ছিল চীনে তৈরি। লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারির বৈশ্বিক বাজারের তিন-চতুর্থাংশ এখন চীনের দখলে।
ডিজিটাল সিল্ক রোডের যাত্রা শুরু হয়েছিল ২০১৬ সালে। ক্ষমতাসীন চীনা কমিউনিস্ট পার্টির তত্ত্বাবধানে ব্যক্তিমালিকানাধীন চীনের টেক কোম্পানিগুলো আন্তর্জাতিক পরিসরে বিস্তৃত হতে শুরু করে। বর্তমানে বৈশ্বিক ডাটা সরবরাহের ২৩ শতাংশ বা প্রায় চতুর্থাংশ এই কোম্পানিগুলোর আওতায়। জাপান ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় চীনের অ্যাপ ও সার্ভিসগুলো সবচেয়ে বেশি ব্যবহূত হচ্ছে। এসব দেশে মার্কিন অ্যাপের তুলনায় চীনের অ্যাপের ব্যবহার প্রায় দ্বিগুণ।
উপপ্রধানমন্ত্রী লিউ হে চীনর অর্থনৈতিক জার হিসেবে পরিচিত। তার নেতৃত্বে দেশটি যে মহামারি পরবর্তী ব্যষ্টিক অর্থনৈতিক কৌশল ঠিক করেছে তা ‘ডুয়াল সার্কুলেশন’ নামে পরিচিত। এর মূল কথা হলো গত এক দশক ধরে ঋণকে হাতিয়ার করে বহির্বিশ্বে প্রাধান্য বিস্তারের চেষ্টা করে আসা হয়েছে সেই জায়গায় হাই টেক ব্যবহার করা। প্রাচীন বাণিজ্য পথকে একবিংশ শতাব্দীর উপযোগী করে পুনরুজ্জীবনের প্রয়াস থেকে ২০১৬ সালে গ্রহণ করা হয়েছিল বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ প্রকল্পটি। এর মধ্য দিয়ে যার মাধ্যমে এশিয়া, ইউরোপ, আফ্রিকা ও ওশেনিয়ার ৬০টি দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা, ভৌত অবকাঠামো উন্নয়ন, জ্বালানি ও বিদ্যুত্ উত্পাদন এবং শিল্পায়নে গণচীনের প্রভূত বিনিয়োগ অর্থায়ন সহযোগিতায় পরিবর্তন আনার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক বিনিময় ও বাণিজ্য সম্পর্ক উন্নয়ন ছিল মূল লক্ষ্য। বলা যায় এই লক্ষ্যকে নতুনভাবে সংঙ্গায়িত করে দিয়েছে।