স্বাধীনতাকে যারা ব্যর্থ করতে চেয়েছিল আজ তারাই ব্যর্থ

প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে ব্যর্থ করতে চেয়েছিল, আজ তারাই ব্যর্থ। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস উপলক্ষ্যে গতকাল রবিবার বিকালে আওয়ামী লীগ আয়োজিত আলোচনা সভায় তিনি এ কথা বলেন। গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সিংয়ের মাধ্যমে যুক্ত হয়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত ঐ সভায় বক্তব্য রাখেন প্রধানমন্ত্রী। শেখ হাসিনা বলেন, ‘আজকে বাংলাদেশ স্বাধীন দেশ হিসেবে সারা বিশ্বে যে মর্যাদা পেয়েছে, এই মর্যাদা ধরে রেখে আমরা বাংলাদেশকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাব। জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসের হাত থেকে দেশকে মুক্ত রেখে ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত, অসাম্প্রদায়িক চেতনায় উন্নত সমৃদ্ধ সোনার বাংলাদেশ আমরা গড়ে তুলব। জাতির পিতার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবসে এটাই আমাদের প্রতিজ্ঞা যে এই জাতি বিশ্বে মাথা উঁচু করে চলবে।’

সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশের অভ্যুদয় হলেও তখনো পাকিস্তানে বন্দি ছিলেন স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। আন্তর্জাতিক চাপের মুখে পাকিস্তান সরকার বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দিলে যুদ্ধে বিজয়ের ২৪ দিন পর তিনি ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি নিজের স্বপ্নের স্বাধীন দেশে পা রাখেন। তখন থেকে দিনটি বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে।

গতকালের অনুষ্ঠানে শোষিত-বঞ্চিত মানুষের অধিকার আদায়ে জাতির পিতার আজীবন সংগ্রামের কথা তুলে ধরেন শেখ হাসিনা। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতাকে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যার কথাও বলেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘জাতির পিতা এই জাতিকে ভালোবেসেছেন। আমাদের একটাই চিন্তা, যে জাতির জন্য আমাদের মহান নেতা জীবন দিয়ে গেছেন, সেই জাতির কল্যাণ করা, তাদের জীবন সুন্দর করা, এটাই আমাদের লক্ষ্য। আর সেই লক্ষ্য নিয়েই আমি কিন্তু কাজ করে যাচ্ছি। দেশের উন্নয়নে সরকারের নেওয়া ভবিষ্যত্ পরিকল্পনা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘২১০০ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের উন্নয়ন কীভাবে হবে, সেই পরিকল্পনা ডেল্টা প্ল্যান করে দিয়েছি। প্রেক্ষিত পরিকল্পনায় ২০৪১ সালে বাংলাদেশ কেমন হবে সেটা দিয়েছি। ২০৭১ সালে আমাদের স্বাধীনতার শতবর্ষ উদ্যাপন হবে। আমাদের আগামী প্রজন্ম কীভাবে তা উদ্যাপন করবে, সেই কথা চিন্তা করেই আমরা কিন্তু পরিকল্পনা হাতে নিয়েছি। সেগুলো আমাদের বাস্তবায়ন করতে হবে। দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।’ করোনা ভাইরাস মহামারি মোকাবিলায় সবাইকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার নির্দেশ দেন শেখ হাসিনা।

সভায় আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয় প্রান্তে বক্তব্য রাখেন দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য বেগম মতিয়া চৌধুরী, ড. আব্দুর রাজ্জাক, আবদুল মতিন খসরু, সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ, হাছান মাহমুদ, ত্রাণ ও সমাজকল্যাণবিষয়ক সম্পাদক সুজিত রায় নন্দী, সাংগঠনিক সম্পাদক আহমদ হোসেন, বি এম মোজাম্মেল হক, এস এম কামাল হোসেন, দপ্তর সম্পাদক বিপ্লব বড়ুয়া, ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক শেখ বজলুর রহমান, আবু আহমেদ মান্নাফী, এস এম মান্নান কচি, হুমায়ুন কবির প্রমুখ। গণভবন প্রান্তে আলোচনা সভা পরিচালনা করেন দলের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক আবদুস সোবহান গোলাপ।

বঙ্গবন্ধুর ১০ জানুয়ারির ভাষণে দেশ পরিচালনার

সবরকম দিকনির্দেশনা ছিল

প্রধানমন্ত্রী বলেন, মুক্তিযুদ্ধের পর ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি পাকিস্তানের বন্দিদশা থেকে স্বাধীন দেশে ফিরে রেসকোর্সের ময়দানে দেওয়া জাতির পিতার ভাষণে একটি স্বাধীন দেশ পরিচালনার সবরকম দিকনির্দেশনা ছিল। তিনি বলেন, ‘ঢাকায় এসেই জাতির পিতা রেসকোর্সের ময়দানে ছুটে যান। তারপর সেখানে যে ভাষণটি দেন তাতে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র পরিচালনার সবরকম দিকনির্দেশনা ছিল। অথচ হাতে কোনো কাগজ ছিল না, নিজে থেকেই বলেছেন।’ শেখ হাসিনা বলেন, ‘এক জন মানুষ একটি জাতির প্রতি কতটা নিবেদিত হলে, মানুষকে কতখানি ভালোবাসলে এমন আত্মত্যাগ করতে পারে—তা জানতে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীসহ আমাদের নতুন প্রজন্মের ৭ মার্চের ভাষণ এবং ১০ জানুয়ারির ভাষণ বারংবার শোনা উচিত। তাহলেই রাজনীতি করার একটা প্রেরণা এবং দিকনির্দেশনা সবাই পাবে।’

জাতির পিতার পাকিস্তানি কারাগারে থেকে ৪০ পাউন্ড ওজন কমে যায়

প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতির পিতার পাকিস্তানি কারাগারে থেকে ৪০ পাউন্ড ওজন কমে যায়। তবু মুক্তি পেয়ে তিনি সেই জীর্ণশীর্ণ দেহ নিয়েই লন্ডন চলে যান এবং প্রধানমন্ত্রী হিথের সঙ্গে বৈঠক করেন, সংবাদ সম্মেলন করেন এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের সঙ্গে সাক্ষাত্ করেন। সেখান থেকে তিনি দিল্লি হয়ে দেশে ফেরেন এবং সেখানে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী এবং রাষ্ট্রপতির সঙ্গে তার সাক্ষাত্ হয় এবং সেখানেও তিনি জনগণের সামনে বক্তৃতা দেন। এরপর ঢাকায় এসেই তিনি রেসকোর্সের ময়দানে ছুটে যান।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বঙ্গবন্ধু সেই ভাষণে বন্ধুপ্রতিম দেশ যারা সহযোগিতা করেছে তাদের প্রতি যেমন কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন তেমনি দেশের মানুষের প্রতি পাকিস্তানি বাহিনীর অত্যাচার-নির্যাতনের কথাও তুলে ধরেছেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের একটাই চিন্তা যে জাতির জন্য আমাদের মহান নেতা জীবন দিয়ে গেছেন সেই জাতির কল্যাণ করা। তাদের জীবন সুন্দর করা। আর সেই লক্ষ্য নিয়েই আমরা কাজ করে যাচ্ছি। শেখ হাসিনা বলেন, জাতির পিতা ব্রিটিশ আমল থেকে চলে আসা শাসন ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন করে একে গণমুখী করার জন্যই দ্বিতীয় বিপ্লবের ডাক দেন। সেটা যদি করে যেতে পারতেন তাহলে মাত্র পাঁচ বছরেই বাংলাদেশ ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত সোনার বাংলাদেশ হিসেবে গড়ে উঠতে পারত। আজকে দেশ পরিচালনা করতে গিয়ে দেখি সব কাজের ভিত্তিটাই তিনি তৈরি করে দিয়ে গেছেন। মাত্র সাড়ে তিন বছরের শাসনামলে জাতির পিতা এত আইন, এত নীতিমালা কীভাবে করে যান সেটা একটা বিস্ময় বলেও তিনি উল্লেখ করেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ কোনোদিন আত্মনির্ভর হয়ে মাথা তুলে নিজের পায়ে দাঁড়াক সেটা স্বাধীনতা বিরোধীরা কোনোদিন চায়নি বলে জাতির পিতাকে শুধু হত্যাই করেনি, আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সব আদর্শকে বিচ্যুত করেছিল। প্রজন্মের পর প্রজন্মকে তারা দেশের সঠিক ইতিহাস জানতে দেয়নি।

তিনি এ সময় করোনা ভ্যাকসিন দেশে আনার বিষয়ে সরকারের পদক্ষেপ তুলে ধরে সবাইকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার আহ্বান পুনর্ব্যক্ত করেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘করোনা ভাইরাসের জন্য এরই মধ্যে ভ্যাকসিন ক্রয় করার সব ব্যবস্থা আমরা করেছি। ইনশাল্লাহ এসে যাবে। তার পরেও বলব সবাইকে স্বাস্থ্য সুরক্ষাবিধি মেনে চলতে হবে। স্বাস্থ্য সুরক্ষাবিধি মেনে নিজেকে এবং অন্যকেও রক্ষা করতে হবে।’ তিনি বলেন, যতই ভ্যাকসিন আনি না কেন, মাস্ক পরা, হাত ধোয়া, রোদে থাকা, ভিটামিন ডি এবং সির ঘাটতি পূরণ করা প্রভৃতি বিষয়গুলো কিন্তু মেনে চলতে হবে। আর এটা মেনেই আমরা করোনা ভাইরাসকে কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পেরেছি। তিনি গত বছরের মার্চ মাসে বিশ্বব্যাপী করোনা ভাইরাস প্রাদুর্ভাবের ঊর্ধ্বগতির বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, ‘আবারও হয়তো সেই সময় একটা ধাক্কা দিতে পারে।’