করোনার সময়ে দু-একটি ব্যতিক্রম বাদে বিশ্বের সব দেশেরই পোশাক রপ্তানি কমেছে। বাংলাদেশেরও একই অবস্থা। তবে এই কঠিন সময়েও পোশাক পণ্যের দুটি ভাগের মধ্যে একটি—নিটওয়্যার জাতীয় পোশাকের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ছিল।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) হিসাব অনুযায়ী, গত জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে সার্বিকভাবে বাংলাদেশের পোশাক পণ্য রপ্তানি কমেছে ২ দশমিক ৯৯ শতাংশ। আলোচ্য সময়ে শার্ট, প্যান্ট, ব্লেজার জাতীয় পোশাক (যা ওভেন নামে পরিচিত) রপ্তানি কমেছে ১০ দশমিক ২২ শতাংশ। কিন্তু একই সময়ে গেঞ্জি, টি-শার্ট, পোলো শার্ট, সোয়েটার, আর ট্রাউজার জাতীয় পোশাক (নিটওয়্যার) রপ্তানি বেড়েছে ৩ দশমিক ৯০ শতাংশ।
অবশ্য এর আগে করোনা শুরু হওয়ার পর গত মার্চ থেকে রপ্তানি কমতে শুরু করে। এপ্রিল ও মে মাসে ব্যাপকভাবে কমে যায় পোশাক রপ্তানি। আলোচ্য দুই মাসে ওভেন ও নিটওয়্যার—উভয় পণ্যের রপ্তানিই ব্যাপকভাবে কমে।
রপ্তানিকারকরা বলছেন, করোনার সময়ে বিধিনিষেধের কারণে বাধ্য হয়েই বেশির ভাগ মানুষকে ঘরে থাকতে হয়েছে। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে লকডাউন না থাকলেও সংক্রমণ এড়াতে কর্মীদের হোম অফিস করার অনুমতি ছিল। সব মিলিয়ে এই সময়ে মানুষের বাইরে কিংবা অফিসের মতো আনুষ্ঠানিক কাজ ছিল কম। ফলে ফরমাল পোশাক কম পরতে হয়েছে। এই সময়ে বরং, গেঞ্জি, টি-শার্ট, পোলো শার্ট, ট্রাউজার আর সোয়েটারের মতো পোশাক পরতে হয়েছে বেশি। ফলে এই পণ্যের চাহিদা তেমন কমেনি। আবার এই সময়ে মানুষের আয় কমে যাওয়ায় এসব পণ্যের মধ্যে অপেক্ষাকৃত কম দরের পোশাকে আগ্রহ ছিল বেশি। এই সুবিধা নিতে পেরেছে বাংলাদেশ। এই সময়ে যেসব রপ্তানিকারক শার্ট, প্যান্ট জাতীয় পোশাক রপ্তানি করেন কিংবা ব্লেজারের মতো উচ্চ মূল্যের পোশাক রপ্তানি করেন, তারা ক্ষতির মুখে পড়েছেন বেশি।
বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৩ শতাংশই আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। ইপিবির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ছয় মাসে বাংলাদেশ মোট ১ হাজার ৫৫৪ কোটি ৫৬ লাখ ডলারের পোশাক পণ্য রপ্তানি করেছে। গত বছরের একই সময়ে পোশাক পণ্য রপ্তানি হয়েছিল ১ হাজার ৬০২ কোটি ৪০ লাখ ডলারের। অর্থাত্ গত ছয় মাসে পোশাক পণ্য রপ্তানি কমেছে ৪৭ কোটি ৮৪ লাখ ডলারের বা ৪ হাজার কোটি টাকার। এই সময়ে ওভেন পণ্য রপ্তানি হয়েছে ৭০২ কোটি টাকার, যা গত বছরের একই সময়ের চেয়ে প্রায় ৮০ কোটি ডলার কম। অন্যদিকে নিটওয়্যার পণ্য রপ্তানি হয়েছে প্রায় ৮৫৩ কোটি ডলারের, যা গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ৩২ কোটি ডলার বেশি।
নিটওয়্যার পোশাক রপ্তানিকারক ও এ খাতের রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিকেএমইএর সিনিয়র সহসভাপতি মোহাম্মদ হাতেম মনে করেন, করোনায় মানুষ বাসায় অপেক্ষাকৃত বেশি সময় থাকতে হয়েছে বলে নিটওয়্যার পোশাকের চাহিদা ছিল। তবে তিনি মনে করেন, লোকসান কমাতে উত্পাদন ব্যয়ের চেয়ে কম মূল্যের রপ্তানি আদেশও নিয়েছেন অনেকে। তিনি বলেন, ঐ রপ্তানি আদেশ না নেওয়া হলে কারখানার ব্যয়, শ্রমিকের মজুরি বা অন্যান্য স্থায়ী খরচসহ হয়তো মাসে একজন উদ্যোক্তার ৩ কোটি টাকা লোকসান হতো। কম দরের অর্ডার নেওয়ায় ঐ লোকসান হয়তো ৫০ লাখ টাকায় নেমে এসেছে। উদ্যোক্তার লোকসান হলেও তা রপ্তানির খাতায় যোগ হয়েছে। এ কারণে রপ্তানি বেশি দেখা যাচ্ছে।
ওভেন রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান ভিয়েলাটেক্স। এই প্রতিষ্ঠান উচ্চ মূল্যের পোশাকও তৈরি করে। করোনার সময় তাদের রপ্তানি আদেশ অনেক কমে গেছে বলে ইত্তেফাককে জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান ডেভিড হাসনাত। তিনি বলেন, অতীতে এই সময়ে শতভাগ সক্ষমতার বাইরেও অতিরিক্ত সময় কাজ করতে হতো। এবার ৭০ শতাংশের মতো কাজ হচ্ছে। ফলে আগামী মাসগুলো নিয়েও তাদের মধ্যে দুশ্চিন্তা রয়েছে।
অবশ্য অর্থনীতিবিদরা বলছেন, করোনার সময়ে দুই একটি ব্যতিক্রম বাদে সব দেশেরই পোশাক রপ্তানি কমেছে। এর মধ্যেও বাংলাদেশ অনেক প্রতিযোগীর তুলনায় ভালো করেছে। অপেক্ষাকৃত স্বল্প মজুরি ও ইউরোপে শুল্কমুক্ত সুবিধা থাকায় আগামী দিনগুলোতেও বাংলাদেশের সম্ভাবনা ভালো। অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. মুহম্মদ মাহবুব আলী ইত্তেফাককে বলেন, করোনার টিকা প্রয়োগ শুরু হওয়ায় মানুষের মধ্যে আস্থা বাড়ছে। এর ফলে ধীরে ধীরে অর্থনীতি স্বাভাবিক গতি ফিরে পাবে। এটি রপ্তানিতেও ইতিবাচক বার্তা দেবে।