চট্টগ্রামের বাজারে সংঘবদ্ধ চক্রের তত্পরতায় ছড়িয়ে পড়ছে জাল টাকা। জাল টাকা লেনদেনে আর্থিক ক্ষতির শিকার হচ্ছেন নগরীর সাধারণ ক্রেতা-বিক্রেতা ও জনসাধারণ। অভিযোগ মিলছে নগরীর ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের কাছ থেকেই বেশি। ভ্রাম্যমাণ হকার ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের হাতে দুষ্টচক্র আলো আঁধারিতে এ ধরনের টাকা ধরিয়ে দিচ্ছে। এছাড়া ব্যবহূত মোবাইল ও ল্যাপটপ কিনতে এসে বিপুল পরিমাণ জাল টাকা গছিয়ে দিয়ে অভিনব প্রতারণার একটি বড় ঘটনাও সম্প্রতি নগরীতে উদ্ঘাটন করেছে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিট।
নগরীর ব্যাংকসমূহ এবং বড় বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে জাল টাকা দ্রুত শনাক্তের মেশিন রয়েছে। কিন্তু ক্ষুদ্র ও ভ্রাম্যমাণ ব্যবসায়ীরা নগরীর নানা প্রান্তে পণ্য বেচাকেনার সময় দ্রুত লেনদেনে জাল টাকা গ্রহণ করে প্রতারিত ও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। এই ধরনের পরিস্থিতিতে পুলিশের কাছে বিষয়টি অবগত করতে গেলে নানা জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হতে হয় বলে প্রতারিত ব্যক্তি ও ক্ষুদ্র ব্যসায়ীরা তাদের এই বিড়ম্বনার কথা প্রায়শই চেপে যাচ্ছেন। নগরীর জুবিলী রোডের ভ্রাম্যমাণ ব্যবসায়ী ওসমান জানান, তিনি এক সপ্তাহে দুটি ৫০০ টাকার জাল নোট পেয়ে আর্থিক ক্ষতির শিকার হয়েছেন।
নগরীর পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জের আড়তদার ও ব্যবসায়ীদের কয়েকটি সূত্র জানায়, শুধু ৫০০ টাকাই নয়, মাঝে মাঝে ১ হাজার টাকার জাল নোটও মিলছে। ফলে তারা বড় ধরনের লেনদেনের সময় কোনো টাকায় সন্দেহ হলে সঙ্গে সঙ্গে নিকটবর্তী ব্যাংকে গিয়ে টাকা পরীক্ষা করে নিচ্ছেন। মহানগরীর প্রান্তিক এলাকার হাটবাজারে রাতের বেলাতে এ ধরনের টাকার লেনদেনকালে ক্রেতা-বিক্রেতার মধ্যে অপ্রীতিকর ঘটনার খবরও মিলছে।
এদিকে পুলিশের তত্পরতায় চলতি সপ্তাহেই নগরীর হালিশহরে জাল টাকায় মোবাইল ও ল্যাপটপ ক্রয়কারী একটি প্রতারক চক্রের দুই ব্যক্তি ধরাও পড়েছে। তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে ৩ লাখ ৩৪ হাজার টাকার জাল নোট। নগরীর খাতুনগঞ্জ, বাকলিয়া, কর্নেলহাট, কাটগড়, কালুরঘাট, পতেঙ্গাসহ প্রান্তিক এলাকাগুলো থেকে জাল টাকা লেনদেনে প্রতারিত হওয়ার অভিযোগ প্রায়শ শোনা গেলেও জালিয়াত চক্রের সদস্যরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে বলে ভুক্তভোগীরা জানান। ব্যাংকে টাকা জমা দিতে এসে জাল টাকা শনাক্ত হওয়ার পর গ্রাহকদের হয়রানির খবর মিলছে। এসব ঘটনায় ব্যাংক কর্মকর্তারাও হয়ে পড়ছেন বিব্রত।
নগরীর এনসিসি ব্যাংক আগ্রাবাদ শাখার কর্মকর্তা কামরুল মোরশেদ তমাল ইত্তেফাককে বলেন, চট্টগ্রামের বাজার, বিপণিকেন্দ্রগুলোতে সংঘবদ্ধ চক্র জাল টাকা ছড়িয়ে দিচ্ছে বিভিন্ন কৌশলে। ব্যবসায়ীদের লোকজন নানা পর্যায়ে লেনদেন করতে গিয়ে ফেঁসে যাচ্ছেন। তিনি বলেন, আইন অনুসারে যার কাছে জাল টাকা পাওয়া যাবে তাকেই পুলিশে সোপর্দ করে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। কিন্তু সংঘবদ্ধ চক্র বাজারে লেনদেন পর্যায়ে কৌশলে এসব টাকা ছড়িয়ে দেওয়ায় তারা থাকছে ধরাছোঁয়ার বাইরে।
পুলিশের একটি সূত্র মতে, চট্টগ্রামে এ পর্যন্ত ধরা পড়া জাল টাকা চক্রের বেশির ভাগই দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে এসে এখানে এসব টাকা ছড়িয়ে আবার সটকে পড়ছে বলে তথ্য মিলেছে। তবে কিছু কিছু চক্র আছে যারা জাল টাকা তৈরির সরঞ্জাম নিয়ে ভ্রাম্যমাণ অবস্থায় থাকে। হোটেলে অবস্থান করে। ডিজিটাল প্রযুক্তি ও রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার করে জাল টাকা তৈরি করে বাজারে ছড়িয়ে দ্রুত স্থান পরিবর্তন করছে। বর্তমানে বাজারে যেসব জাল টাকা ছড়ানোর খবর মিলছে সেগুলোর মধ্যে ৫০০ ও ১ হাজার টাকার নোটই দেখা যাচ্ছে।
পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার আসিফ মহিউদ্দিন ইত্তেফাককে বলেন, আমরা বেশ কিছু অভিযোগ পেয়েছিলাম যে, কেনাবেচায় জাল টাকা গছিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে একটি চক্র প্রতারণা করছে। আমাদের কাছে অভিযোগ আসে, ল্যাপটপ কিনতে গিয়ে দুর্বৃত্ত চক্র ক্রেতাকে জাল টাকা গছিয়ে দিয়েছে। আরো অভিযোগ আসে, এক জন মোবাইল বিক্রি করতে গেলে প্রতারকরা তাকে ৮০ হাজার টাকার জাল টাকা গছিয়ে দিয়ে সটকে পড়ে। এই চক্রটিরই দুই সদস্যকে টানা প্রায় তিন-চার মাস তদন্ত, অনুসন্ধানের মাধ্যমে কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের সদস্যরা গত বছরের ২৮ ডিসেম্বর হালিশহর থেকে গ্রেফতার করে। তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় ল্যাপটপ, মোবাইল এবং ৩ লাখ ৩৪ হাজার টাকার জাল নোট। উদ্ধারকৃত সব টাকাই ছিল ১ হাজার টাকার নোট। তিনি বলেন, যারা ধরা পড়েছে তারা জানায় যে, তারা এসব জাল টাকা বাগেরহাট থেকে এনে চট্টগ্রামে মোবাইল ও ল্যাপটপ কেনার মাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়ে প্রতারণা করছিল। তিনি বলেন, এসব জাল টাকা যারা ছাপাচ্ছে তাদের ঘাঁটি অনুসন্ধানে কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের তত্পরতাকে জোরদার করা হয়েছে। আশা করা যায় দুর্বৃত্তদের উত্স শিগিগরই বেরিয়ে আসবে।