“মোদের গরব, মোদের আশা, আ মরি বাংলা ভাষা।
তোমার কোলে, তোমার বোলে, কতই শান্তি ভালবাসা!
কি যাদু বাংলা গানে! গান গেয়ে দাঁড় মাঝি টানে
এমন কোথা আর আছে গো!
গেয়ে গান নাচে বাউল, গান গেয়ে ধান কাটে চাষা।”
এই মাতৃভাষা প্রেম পূর্ণ সঙ্গীতটি বাঙালির প্রাণে আজও ভাষা প্রেমে গভীর উদ্দীপনা সঞ্চার করে। কী সহজ শব্দ, কী সরল ব্যঞ্জনা-অথচ কী অপূর্ব স্বদেশের প্রতি, মায়ের ভাষার প্রতি ঐকান্তিক মমত্ববোধ প্রকাশিত হয়েছে। এই সঙ্গীতটির রচয়িতার নাম অতুলপ্রসাদ সেন। কবি, সুরকার এবং সঙ্গীতজ্ঞ অতুলপ্রসাদ সেন স্বজাতি বলতেও বাংলা মায়ের সর্বধর্মের সন্তানকে বুঝিয়েছেন। একটি গানে বলেছেন-
“দেখ মা এবার দুয়ার খুলে
গলেগলে এলো মা
তোর হিন্দু-মুসলমান দুই ছেলে”।
কবির স্বদেশি সঙ্গীতগুলো বিশেষত ‘মোদের গরব, মোদের আশা’ গানটি ভাষা আন্দোলন এবং স্বাধীনতা আন্দোলনে প্রেরণা যুগিয়েছে। বর্তমানেও এ গানের ভূমিকা এতটুকুও ম্লান হয়নি।
অতুলপ্রসাদ সেনের জন্ম ঢাকা শহরে হলেও তাঁর আদি নিবাস ফরিদপুর জেলার দক্ষিণ বিক্রমপুরের ‘মগর’ গ্রামে। ডিসেম্বরের ২০ তারিখ, ১৮৭১ সালে তাঁর জন্ম হয়। অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র অতুলপ্রসাদ লেখাপড়ার পাশাপাশি সঙ্গীত চর্চায় মনোযোগী হন। ব্যারিস্টারির মধ্যে পাননি অন্তরের আনন্দ তাই তেমনভাবে ওতে মন বসাতে পারেনি। মনের ভেতরে সুরের মূর্ছনা, কবিতার গুঞ্জন। ‘ভক্তিরসের সাধক’ এই ভক্তিরস স্বদেশ-স্বজাতি-স্বভাষার প্রতি ভক্তি। রবীন্দ্রসঙ্গীত, নজরুলগীতি, বাউল, কীর্তন, ঠুমরি, রাগপ্রধান সব ধরণের সুর, তাল, লয়ের সমন্বয়ে তিনি এক স্বতন্ত্র সঙ্গীতের সাধনা করেছেন। সমকালীন গীতিকারদের তুলনায় সীমিত সংখ্যক সঙ্গীত রচনা করেও বাংলা গানের জগতে অতুলপ্রসাদ একটি নিজস্ব আসনে অধিষ্ঠিত হয়ে আছেন। তাঁর সঙ্গীত ‘অতুলপ্রসাদের গান’ বলে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। তাঁর গানে এক অনির্বচনীয় ভক্তিরস এবং নির্মল আনন্দের উত্স রয়েছে। যেমন ঠুমরি ও দাদরা ভক্তির গান-‘কি আর চাহিব বলো’ কিংবা ‘ওগো নিঠুর দরদী/একি খেলছ অনুক্ষণ’ প্রভৃতি গানের করুণ রসের মাধুর্য অনাবিল আনন্দে হূদয়পূর্ণ করে। তাঁর আর একটি বিখ্যাত গান:হও ধরমেতে ধীর,
হও করমেতে বীর,
হও উন্নত শির-নাহি ভয়।
অতুলপ্রসাদ সেন ২৬ আগস্ট, ১৯৩৪ সালে লক্ষৌতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর ‘মোদের গরব, মোদের আশা, আ মরি বাংলা ভাষা’! তাঁকে চিরঞ্জীব করে রাখবে চিরকাল আমাদের হূদ মাজারে।