অণুগল্প

আইসোলেশন

মোজাম্মেল হক নিয়োগী

 

নভেল করোনাভাইরাসের ক্রান্তিকালে বিশ্বে মহামারির বার্তা ছড়িয়ে পড়ায় টগবগে যুবক বৈশাখ কর্তৃপক্ষের নির্দেশে বাসায় বসেই অফিসের কাজ করে। সারা বিশ্বেই এভাবে কাজ হচ্ছে, যার পরিভাষা হলো ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’। স্নানাহারের সময়টুকু বাদ দিয়ে নিষ্ঠার সঙ্গেই সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত কাজ করে বৈশাখ। মহামারির ভয়াবহ পরিস্থিতিকে স্ত্রী শ্রাবণীও পারিবারিক জীবনের সঙ্গে মর্যাদার সঙ্গে অভিযোজন ঘটিয়েছে। গভীর রাত পর্যন্ত কাজ সে করতেই পারে। তাতে সমস্যা ছিল না। কিন্তু গিঁট পাকাল অন্যত্র। শ্রাবণীর দীর্ঘ অপেক্ষা। অপেক্ষা করতেই পারে...প্যানডেমিক সিচুয়েশনে ফিজিক্যালি ফ্রিজড হওয়াও অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু এমন টগবগে উষ্ণ যুবক দিনের পর দিন ফ্রিজড থাকবে...কী করে হয়? কত দিন?

রাতের গোপন প্রহরে বৈশাখ বারান্দায় গিয়ে ফোনে কথা বলে দীর্ঘ সময় কাটায়। বিষয়টি শ্রাবণীর গোচরে এলে বৈশাখ বুঝিয়ে বলল, সবই অফিসিয়াল ডিসকাশন। শ্রাবণী লক্ষ্মীমন্ত সংসারী মেয়ে হলেও বুদ্ধি-ধার ক্ষুরের মতো। বিষয়টি উপলব্ধি করার জন্য অপেক্ষা করতে থাকে নিঃশব্দে। বুদ্ধিমতী শ্রাবণী আড়াল থেকে বৈশাখের কাজকর্ম মনিটর করার জন্য ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরার মতো আড়ি পাতে। প্রথমেই লক্ষ করে যতটুকু সময় না কাজে থাকে তার চেয়ে বেশি সময় ফেসবুকে। সন্দেহের বুদ্বুদ ভাসতে থাকে, বাড়তে থাকে ক্রমধারায়। এক দুই তিন...অসংখ্য।

স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সন্দেহ থাকতেই পারে। অপ্রমাণিত সন্দেহ দাম্পত্যজীবনের বড় নিয়ামত। কিন্তু গিঁট পাকাল অন্যত্র।

শ্রাবণীকে খুব সহজ-সরল আর অবলা ভেবে কম্পিউটার ও মোবাইলফোনের গোপনীয়তা নিয়ে বৈশাখ কখনোই ভাবত না। বৈশাখ বাথরুমে ঢুকলে কখনো এক ঘণ্টার আগে বের হয় না। সুযোগটা নেয় শ্রাবণী। মোবাইলফোনের কল লিস্টে ‘আমজাদ’ নামে অসংখ্যবার কল। শ্রাবণী কল করে। নারীর কণ্ঠ। বুক কাঁপে শ্রাবণীর। দু-একটি কথা বলে কল শেষ করে। বুকের কাঁপুনি সংক্রমিত হয় হাত-পায়ে।

লগআউট না হওয়াতে ফেসবুকের ম্যাসেঞ্জারে পেয়ে যায় একাধিক নারীর সঙ্গে অসভ্য কদাকার কথোপকথন।

বিকেলে শ্রাবণী বৈশাখকে বলল, আমি বাবার বাসায় যাব। লকডাউন থাকার পরও শ্রাবণীর জেদের কারণে  আটকানো গেল না। শ্রাবণী বেপরোয়া...। বের হয়ে যায়।

কাজের টেবিলে এসে বৈশাখ শ্রাবণীর হাতের একটি চিঠি দেখে হতভম্ব।

‘তোমার মগজ নষ্ট প্রেমের ভাইরাসে আক্রান্ত। যতদিন ভাইরাসমুক্ত না হবে ততদিন আইসোলেশনে থাকবে। আমি চললাম বাবার বাসায়।’

বৈশাখ স্তব্ধ হয়ে বসে থাকে চেয়ারে। চারপাশ থেকে নৈঃশব্দ্য দানা বেঁধে জমাট হতে থাকে। মনে হলো অক্সিজেন সেচুরেশন কমে যাচ্ছে। শ্বাস-প্রশ্বাস দ্রুত হচ্ছে। অক্সিজেন দিতে পারে কেবল শ্রাবণী।

শ্রাবণী কি সহসা আসবে...   

অলংকরণ :অবিনাশ আচার্য