অর্থনীতিতে ভালোমন্দ দুই দিকই দৃশ্যমান

বাংলা সনের পৌষ মাস যায় যায়। আগামী ১৫ জানুয়ারি শুরু হচ্ছে মাঘ মাস। ঘটনাক্রমে জানুয়ারি থেকে জুন—এই ছয় মাস হচ্ছে আমাদের অর্থনৈতিক বছরের দ্বিতীয় ভাগ। দ্বিতীয় ভাগে বাজেটের কাজ পুরো গতি পায়। প্রথম ছয় মাস চলে যায় প্রস্তুতি হিসেবে। ২০২০-২১ অর্থবছরের শেষ ছয় মাসের শুরুতে অর্থনীতির ভালো খবর আছে দুটো। এর মধ্যে একটি হচ্ছে, অর্থনীতি যে গতি সঞ্চার করছে তার একটা হিসাব। দ্বিতীয় খবর হচ্ছে, অষ্টম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার বিস্তারিত ঘোষণা করা হয়েছে, যার দ্বারা বোঝা যায় করোনা-পরবর্তীকালে সরকার অর্থনীতির ক্ষেত্রে কী কী করতে চায়। এই দুই খবরের মধ্যেই দৈনিক ইত্তেফাক ছোট্ট করে একটি অস্বস্তিকর খবর দিয়েছে। আর এই খবরটা হচ্ছে চাল-ডালের। ভরা আমনের মৌসুমে খোলা বাজারে চালের দাম, ডালের দাম বাড়ছে। এ ঘটনা কদাচিত্ ঘটে। বরং এই সময়ে চালের দাম হ্রাস পায়। শাকসবজি, মাছ-মাংস, দুধ-ডিমের দাম কমে। মানুষ একটু শান্তি পায়। খেয়ে-পরে সুখ তখন। এবার এর ব্যতিক্রম ঘটছে। কারণ অজানা। সরকারের মন্ত্রীরা বলছেন মিলারদের কারসাজির কথা। মিলাররা বলছেন বাজারে চালের দাম কম। কম সরকারি দামের চেয়ে। তাই তারা চাল কিনে সরকারকে দিচ্ছেন না। এদিকে কাগজে দেখলাম, সরকার ৩ লাখ ৩০ হাজার টন চাল আমদানির অনুমতি দিয়েছে। বেসরকারি খাত চাল আমদানি করবে। কথা উঠেছে শুল্কের ব্যাপারে। শুল্ক বেশি কমালে উত্পাদকরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এ এক উদ্ভূত অবস্থা। চালে আমরা স্বয়ংসম্পূর্ণ অথচ চাল আমদানি করতে হচ্ছে। আবার আমদানির ওপর থেকে শুল্ক বেশি কমালে উদ্বৃত্ত কৃষকরা হয় ক্ষতিগ্রস্ত। এদিকে না কমালে ভোক্তাদের দিতে হয় চড়া মাশুল। কৃষির এটা চিরন্তন সমস্যা।

অনেকটা এই ধরনের সমস্যায় পড়েই পাঞ্জাবের কৃষকরা গত মাস দেড়েক ধরে দিল্লির রাস্তা বন্ধ করে খোলা আকাশের নিচে বসে আছেন। ভারতের গুদামে চাল রাখার জায়গা নেই। কৃষকদের দাবি—এসব বুঝি না, নিম্নতম দামে আমাদের কাছ থেকে চাল নিতে হবে। এসব নিয়ে কৃষকরা উত্তেজিত। তাই বলছিলাম কৃষিতে আমাদের রয়ে যাচ্ছে চিরকালের এক সমস্যা—উত্পাদন পর্যায়ে ও বিপণন পর্যায়েও। এর মাশুল দেন কখনো কৃষক কখনো ভোক্তারা। এর সমাধান কী, মনে হয় আমরা কেউ জানি না। এই না জানার কারণেই এখন ভরা চালের মৌসুমে চালের দাম চড়া, বিশেষ করে মোটা চালের দাম।

বলছিলাম অর্থনীতিতে গতি ফেরার কথা। আমরা এখনো করোনা-১৯-এর আক্রমণমুক্ত নই। উন্নত বিশ্ব আক্রান্ত হচ্ছে নতুন করে। আমাদের অপেক্ষা টিকার জন্য। মাঝখানে টিকার প্রশ্নে নানা ধরনের বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়। দৈনিক ইত্তেফাকের খবরে সেই বিভ্রান্তি দূর হয়েছে। টিকার জন্য এখন যেমন অপেক্ষা, তেমনি অপেক্ষা ছিল অর্থনীতিতে গতি ফিরবে কবে তা দেখার জন্য। অনেকেই ছিল হতাশ। এতসব বাধাবিপত্তির মুখে অর্থনীতি কীভাবে ঘুরে দাঁড়াবে? না, দেখা যাচ্ছে এতটা হতাশার কোনো কারণ নেই। পত্রিকান্তরে একটি খবর প্রকাশিত হয়েছে গত ৬ জানুয়ারিতে। এতে বেশ কয়েকটি সূচক ব্যবহার করে বলা হয়েছে যে, অর্থনীতি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে শুরু করেছে। সূচকগুলো হলো—গ্যাস ব্যবহার, বিদ্যুত্ ব্যবহার, তেল ব্যবহার, চট্টগ্রাম বন্দরে মাল ওঠানামার জন্য ব্যবহূত কনটেইনার ব্যবহার। বলা বাহুল্য, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি পেলে গ্যাসের ব্যবহার বাড়ে, বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ে, তেলের ব্যবহার বাড়ে। আমদানি-রপ্তানি চলমান থাকলে কনটেইনারের ওঠানামাও বাড়ে। আবার অর্থনীতিতে যখন মন্দা দেখা দেয় তখন এসবের ব্যবহার কমে। প্রকাশিত খবরে দেখা যায়, ২০২০ সালের এপ্রিলে গ্যাস ব্যবহারের পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৭০০ মিলি কিউবিক মিটার। এটা ছিল করোনা-১৯-এর প্রারম্ভকাল। সেই স্থলে গত ডিসেম্বরে গ্যাসের চাহিদা ছিল ২ হাজার ৭০০ মিলি কিউবিক মিটার। ২০২০ সালের মার্চে বিদ্যুতের চাহিদা কমে দাঁড়ায় ঘণ্টাপ্রতি সাড়ে ৫ হাজার মিলি কিলোওয়াট। গত ডিসেম্বরে এর পরিমাণ দাঁড়ায় প্রতি ঘণ্টায় সাড়ে ৭ হাজার মিলি কিলোওয়াটে। তেলের চাহিদা বাড়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় দুই ডলার বৃদ্ধি পেয়েছে। মানুষের চলাচল, গাড়ি চলাচল, বিমান চলাচল, কারখানা চালুকরণের ফলে অপরিশোধিত তেলের চাহিদা বেড়েছে। এর প্রতিফলন তেলের দামে। তেলের চাহিদা বাড়ায় তেল উত্তোলনের পরিমাণও বেড়েছে। এদিকে চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্যের কনটেইনার ওঠানামা বৃদ্ধি পেয়েছে অনেক। ২০২০ সালের এপ্রিলে কনটেইনার ওঠানামার সংখ্যা ছিল মাত্র ১ লাখ ৩৫ হাজারটি। এই সংখ্যা ডিসেম্বরে বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে প্রায় ৩ লাখ।

বিনিয়োগের খবর কী? দেখা যাচ্ছে, অর্থনৈতিক অঞ্চলে ‘করোনার বছরে ৩৪ হাজার ৬৮০ কোটি টাকার বিনিয়োগ প্রস্তাব এসেছে’। ইত্তেফাকের গত ৩ তারিখের খবরে বলা হয়েছে, ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ১২ মাসে ৪০৮ কোটি ডলার বা ৩৪ হাজার ৬৮০ কোটি টাকার সমপরিমাণ বিনিয়োগ প্রস্তাব জমা হয়েছে দেশের অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে। বলা বাহুল্য, ২০২০ সালে পুরোটাই ছিল অস্বাভাবিক বছর। বিশ্ব জুড়েই কলকারখানা ছিল বন্ধ। অফিস-আদালত ছিল প্রায় বন্ধ। লকডাউন চলেছে অনেক দিন। মানুষ হাজারে হাজারে মৃত্যুবরণ করেছে। 

আভ্যন্তরীণভাবে বিনিয়োগে ছিল জড়তা। বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ ছিল কম। বিনিয়োগের হারও ছিল কম। এরই মধ্যে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ আমাদের কাছে বেশ আশাব্যঞ্জক ঘটনা নিশ্চয়ই। প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, যেসব দেশের বিনিয়োগ প্রস্তাব পাওয়া গেছে তাদের মধ্যে আছে যুক্তরাজ্য, চীন, অস্ট্রেলিয়া, ভারত, জার্মানি, নেদারল্যান্ড ও সিঙ্গাপুর। উল্লেখ্য, দেশের বড় বড় শিল্প গ্রুপও প্রস্তাবকারীদের মধ্যে আছে।

রপ্তানি রেমিট্যান্স এবং বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের পরিমাণ দেখলেও বোঝা যায়, অর্থনীতি সচল আছে। তা ভেঙে পড়েনি। ২০২০ সালের প্রথম ছয় মাসে রপ্তানিতে বড় রকমের ছেদ পড়লেও পরবর্তী ছয় মাসে তা বেশ কিছুটা ঘুরে দাঁড়ায়। ২০১৯ সালের জুলাই-ডিসেম্বর এ ছয় মাসের তুলনায় ২০২০ সালের জুলাই-ডিসেম্বর—এই ছয় মাসে সর্বমোট রপ্তানি হ্রাস পেয়েছে মাত্র শূন্য দশমিক ৩৬ শতাংশ। অবশ্য তৈরি পোশাক রপ্তানির পরিমাণ এই সময়ে একটু বেশি কমেছে। কিন্তু অন্যান্য পণ্যের রপ্তানি বৃদ্ধি কিছুটা পুষিয়ে দিয়েছে। এদিকে রেমিট্যান্সের পরিমাণ ক্রমবর্ধিষ্ণু ছিল পুরো ২০২০ সাল। জুলাই থেকে নভেম্বরের মধ্যে রেমিট্যান্সের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় ৪২ শতাংশ। রপ্তানি বাণিজ্যে স্থিতিশীলতা, রেমিন্ট্যান্সের পরিমাণ বৃদ্ধি, আমদানি বাণিজ্যে জড়তা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে আমাদের আমদানিযোগ্য পণ্যের মূল্যহ্রাস—এসবের অনিবার্য পরিণতি হচ্ছে বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের পরিমাণ বৃদ্ধি। ২০২০ সালের ডিসেম্বরে রিজার্ভের পরিমাণ ছিল ৪৩ বিলিয়ন ডলার। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরের তুলনায় রিজার্ভ বেড়েছে ১১ বিলিয়ন (বিলিয়ন সমান শত কোটি) ডলার। ভাবা যায়! কাগজে দেখলাম আবাসন খাতের জন্য একটি সুখবর, সুখবর রয়েছে শেয়ারবাজারেও। এই করোনার মধ্যেও ফ্ল্যাটের চাহিদা কমেনি। দামও কমেনি। অথচ করোনার প্রভাবে ফ্ল্যাটের দাম কমার কথা ছিল। চাহিদা থাকার কথা ছিল কম। মন্দাক্রান্ত হওয়ার কথা ছিল আবাসনশিল্প। না, সরকারের কয়েকটা পদক্ষেপে আবাসনশিল্পে গতি ফিরে এসেছে। প্রথমত, সরকার ব্যাংকে সুদের হার হ্রাস করেছে। হ্রাস করেছে মানে ভালো করেই হ্রাস করেছে। দুই অঙ্কের স্থলে সুদের হার এখন এক অঙ্কের। মাত্র সবোর্চ ৯ শতাংশ। দ্বিতীয়ত সরকার ফ্ল্যাট রেজিস্ট্রেশনের ফিও হ্রাস করেছে। সবচেয়ে বড় খবর হচ্ছে অপ্রদর্শিত টাকা দেখানোর সুযোগ। ২০২০-২১ সালের বাজেটে ১০ শতাংশ কর দিয়ে অপ্রদর্শিত আয় সাদা করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। ফ্ল্যাট, বাড়ি, জমি, আমানত সবই এখন ঘোষণা করা যাবে। বড় খবর হচ্ছে আয়কর বিভাগ তো কোনো প্রাশ্ন করবেই না, দেশের কোনো সংস্থাই এই টাকার উত্স সম্পর্কে প্রশ্ন করতে পারবে না। বলা বাহুল্য, একই সুযোগ দেওয়া হয়েছে শেয়ারবাজারের ক্ষেত্রেও। ফলে দেখা যাচ্ছে, প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা, অপ্রদর্শিত টাকা সরকারের হিসাবের মধ্যে এসেছে। অর্থাত্ অর্থনীতির মূলস্রোতে এসেছে। সরকার ১ হাজার কোটি টাকা কর পেয়েছে। এতে ফ্ল্যাটের ব্যবসায়ে গতি ফিরে এসেছে। ফ্ল্যাটের ব্যবসা বাড়া মানে শুধু ফ্ল্যাট বিক্রি করা নয়; এই আবাসনশিল্পের সঙ্গে জড়িত লাখ লাখ শ্রমিক কাঠমিস্ত্রি থাই মিস্ত্রি, ওস্তাগার, রংমিস্ত্রি, পলিশ মিন্ত্রি, প্লাম্বার বৈদ্যুতিক কর্মী থেকে শুরু করে ডজন ডজন শ্রমজীবী মানুষ। শিল্পের ক্ষেত্রে জড়িত সিমেন্ট, বালি, লোহা, রড, ইস্পাত, রং, কাঠ ইত্যাদি শিল্প। বলা বাহুল্য, আশা করা যায় এসব শিল্পেও গতি আসবে এবং শ্রমজীবী মানুষের কল্যাণ হবে। বোঝাই যায়, ‘করোনায়’ লাখ লাখ শ্রমিক কর্মচ্যুত। পেশাজীবীরা কর্মচ্যুত। শ্রমিকরা কর্মচ্যুত। এরা প্রাণ ফিরে পাচ্ছে। যদিও অনেকে অপ্রদর্শিত টাকা সাদা করার সুযোগকে ‘অনৈতিক’ বলছে। কিন্তু এটা যে বাস্তবতা তাও তো স্বীকার করতে হবে। যে ১০ হাজার কোটি টাকা অর্থনীতির মূলস্রোতে এলো তা থেকে সরকার প্রতি বছর কর পাবে। এছাড়া বিকল্পই কী? অপ্রদর্শিত টাকা মানেই ‘কালো’ টাকা তাও সব সময় সত্য নয়। অনেকের রোজগার করা টাকা ‘অপ্রদর্শিত’ থাকে নানা কারণে। এমনকি এর জন্য সরকারের নীতিও দায়ী। সে যা-ই হোক এই পদক্ষেপের ফলে শেয়ারবাজারেও একটা সুফল পাওয়া যাচ্ছে বলে মনে হয়। মরা শেয়ারবাজারে আবার আশার আলো দেখা দিয়েছে। তবে ‘দুষ্ট’ লোকেরা যাতে বাজারে সুযোগ না নিতে পারে, তার ব্যবস্থা দরকার হবে।

এদিকে ৮ম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার (২০২০-২১ থেকে ২০২৪-২৫) কাজ শুরু হয়েছে। পরিকল্পনার প্রথম বছরের অর্ধেক চলে গেছে। এরই মধ্যে পরিকল্পনাটি ‘করোনা-১৯’ কবলিত। ফলে এর আগাগোড়া পুনর্বিন্যাস দরকার হবে এবং তা করাও হচ্ছে। এ ব্যাপারে আরেক দিন আলোচনার আশা রাখি। এবারের মতো বলে রাখি কর্মসংস্থান ও দারিদ্র্য দূরীকরণ হতে হবে এক নম্বর কাজ। করোনার ক্ষতি পুষিয়ে ওঠাও জরুরি ।

n  লেখক : অর্থনীতিবিদ ও সাবেক শিক্ষক,

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়