প্রতিক্রিয়াশীল ও প্রগতিশীল উভয় রাজনৈতিক আদর্শ চর্চা করা ছাত্রসংগঠন আমাদের রাষ্ট্রে ক্রিয়াশীল।
রাজনৈতিক আদর্শগত পার্থক্যের এই হিসাব তেমন জটিল নয়। তবে স্বার্থগত দ্বন্দ্বে দেশীয় শিল্প-সংস্কৃতি ও ইতিহাস-ঐতিহ্যের ওপর আঘাত আসার পরও কোনো কোনো প্রগতিশীল ছাত্রসংগঠনের নিষ্ক্রিয়তা এবং প্রতিক্রিয়াশীল ছাত্রসংগঠনের ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণের হিসাব রাজনৈতিক সমীকরণকে আরো বেশি কঠিন করে তোলে। আমাদের দেশে বিদ্যমান প্রগতিশীল ছাত্রসংগঠনগুলো তার মূল রাজনৈতিক দলের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করবে কি করবে না, সেটি প্রধান আলোচনা নয়, বরং প্রগতিশীলতার লেবাসে থেকে অসাম্প্রদায়িক চিন্তাধারা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা লালন ও জাতির জনকের প্রশ্নে আপস করলে সেটি হবে ঘরের শত্রু বিভীষণের ন্যায়।
প্রতিক্রিয়াশীল সব রাজনৈতিক সংগঠন ও তাদের অঙ্গসংগঠনগুলোর মধ্যে সাম্প্রদায়িক উগ্রবাদ ছড়াতে যে জোটবদ্ধ আচরণ দৃশ্যমান হয়, প্রগতিশীল রাজনৈতিক সংগঠন ও তাদের অঙ্গসংগঠনের মধ্যে এরূপ সংঘবদ্ধতা কম দেখা যায়। ছাত্ররাজনৈতিক সংগঠনকেন্দ্রিক আদর্শিক সম্মেলনের এই প্রয়োজনীয়তার কারণ, তরুণ প্রজন্মকে রাজনীতিতে ধর্মের অপব্যাখ্যা ও ধর্ম ব্যবসার ফাঁদ থেকে মুক্ত করতে ছাত্রসংগঠনগুলো মনস্তাত্ত্বিক ভূমিকা রাখতে পারে। পারিবারিক শিক্ষার বাইরে শিক্ষাঙ্গনের প্রকৃত রাজনৈতিক চর্চা তরুণদের আদর্শিক চেতনায় বিশুদ্ধতার পটেনশিয়াল চেইঞ্জ আনতে সবচেয়ে কার্যকর হিসেবে বরাবরই প্রমাণিত।
তবে একদিকে যেমন প্রগতিশীল রাজনৈতিক আদর্শের নাম ধারণ করে রাষ্ট্রের পক্ষের আদর্শিক ইস্যুতে নিষ্ক্রিয় থাকা সর্ষের ভূত দূর করার চ্যালেঞ্জ রয়েছে, অন্যদিকে প্রয়োজন ধর্মীয় অপব্যাখ্যার মাধ্যমে প্রতিক্রিয়াশীল রাজনৈতিক চর্চা করা ছাত্রসংগঠনের ওপর নজরদারি। এসব সংগঠনের মাধ্যমে ব্রেইনওয়াশ হওয়া তরুণদের ভ্রান্তি দূর করে রাষ্ট্রে আদর্শিক নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার কৌশল নির্ধারণের পরিকল্পনা আমাদের উন্নত রাষ্ট্রে উন্নীত হওয়ার জন্য ম্যান্ডেটরি স্টেপ। প্রতিক্রিয়াশীলতা রুখে দিয়ে ধর্মীয় কুসংস্কারের অন্ধকার থেকে আলোকোজ্জ্বল আগামীর দিকে এগিয়ে যেতে প্রগতিশীল চেতনা বিকাশ বাধ্যতামূলক।
একজন সত্যিকারের ধার্মিক মানুষের বৈশিষ্ট্য যে অসাম্প্রদায়িকতা, এ বিষয়টি ধোঁয়াশায় রেখে ধর্মকে রাজনৈতিক ম্যাটারে পরিণত করে দেশীয় ইতিহাস-ঐতিহ্য, শিল্প-সংস্কৃতির সঙ্গে রোজ ধর্মকে মুখোমুখি দাঁড় করানোর প্রচেষ্টা চালিয়ে যায় বিশেষ একটি মহল। ভাষাগত জটিলতা বা ধর্মীয় বাণীর আপেক্ষিকতার কারণে ধর্মীয় কিতাবের মূল অর্থ বিকৃত করে ধর্মকে রাজনৈতিক বাণিজ্যিক পণ্যে পরিণত করার টেষ্টাকারী এই মহলই মূলত স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ রাষ্ট্রের আজন্ম শত্রু।
কিন্তু এই সংকট থেকে উত্তরণের পথ দেখাবে কে? ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিজ্ঞানচর্চা বৃদ্ধি, নাকি ছাত্ররাজনৈতিক প্রগতিশীল সংগঠনগুলোর সম্মিলিত প্রচেষ্টায় প্রগতিশীল সামাজিক পরিবেশ নিশ্চিতকরণ, সেটি নির্ধারণ করে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের এখনই সময়। বিশেষ কোনো একটি বা দুটি রাজনৈতিক দলের পক্ষে এই সংকটের বাস্তবিক ও টেকসই সমাধান আমাদের মতো ধর্মীয় মতপার্থক্যের এমন রাষ্ট্রে সম্ভব হওয়াটা সম্ভব নয় সম্ভবত।
এই পরিস্থিতিতে ঠিক যেমন বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধবে কে, তেমনি সব প্রগতিশীল রাজনৈতিক আদর্শ চর্চা করা সংগঠনগুলোর সম্মিলিত প্রচেষ্টার শুরুটা করবে কে? মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে সব ধর্মকে প্রাধান্য দিয়ে প্রগতিশীল আদর্শিক রাজনীতির এই চর্চা আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা করছেন। তেমনি আগামীর বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মকে প্রতিক্রিয়াশীলতার অন্ধকার থেকে মুক্তি দিতে ছাত্রসংগঠনগুলোকে এই কাজের সম্মিলিত প্রচেষ্টা এখনই করতে হবে।
n লেখক :শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।