মহাশ্বেতা দেবীর সৃষ্টি :সংগ্রাম ও সন্তাপের দলিল

মহাশ্বেতা দেবী বাংলা সাহিত্যে ভিন্ন অবয়বে পরিচিত ও প্রসারিত এক অবিস্মরণীয় নাম। সে অবয়ব তাঁর সৃষ্ট গল্প-উপন্যাসে সুস্পষ্ট। তিনি সেই মুষ্টিমেয় লেখকদের অন্যতম যাঁরা জীবন ও জীবন সংগ্রামকে বেছে নিয়েছিলেন সাহিত্যের প্রধান প্রতিপাদ্য হিসেবে। রুদ্ধতার নিকষ অন্ধকারে নিপতিত জীবনে মুক্ত আলোর দ্বার উন্মোচন করতে চেয়েছেন। জীবনবাদী দৃষ্টিভঙ্গি ও মানুষের প্রতি গভীর মমত্ববোধ ছিল তাঁর সাহিত্য সৃষ্টির মূল উত্স। প্রতিবাদ, পর্যবেক্ষণ ও পরিশীলিত বোধে তাড়িত মহাশ্বেতা দেবী তাঁর সাহিত্যে ও কর্মে মানবমুক্তির শপথে ভাস্বর। তাঁর জীবন ও সৃষ্টি এক ও অভিন্ন প্রবাহে বেগবান। তিনি যা সৃষ্টি করেছেন তা হয়ে উঠেছে কালের চিত্র। তাঁর রচনাসম্ভার যেমন বিপুল তেমনি তা মানবিক ও বিষয়বৈচিত্র্যে অনন্য। প্রচলিত সমাজব্যবস্থা ও বাস্তবতার নিরিখে মানবমুক্তি, সংগ্রাম ও সন্তাপের স্মারক। তাঁর প্রগতিবাদী মনন বিশ্বাস ও মূল্যবোধের ঋদ্ধ নির্যাস।

মহাশ্বেতা দেবীর উপন্যাস ও গল্পগ্রন্থ তাঁর অজর সৃষ্টিশীলতাকে ধারণ করেছে। ‘হাজার চুরাশির মা’ ও ‘অরণ্যের অধিকার’ তাঁর সর্বাধিক আলোচিত ও সমাদৃত উপন্যাস। তবে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় বৈষম্যে অধিকার, মর্যাদাহীন আদিবাসী জনগোষ্ঠীর নির্মম জীবনপ্রবাহ তাঁর লেখার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তিনি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য আজীবন ছিলেন সংগ্রামমুখর। তাদের জীবনের দীনতার আঁধারে তিনি মানবিকতার উজ্জ্বল শিখা প্রজ্বলনকে ব্রত হিসেবে নিয়েছিলেন। স্বাভাবিকভাবে বিষয় ও ভাষাগত নিরীক্ষা তাঁর লেখার ক্ষেত্রকে করেছে বৈচিত্র্যময়। সে বিচারে আঁধার মানিক, অমৃত সঞ্চয়, চোট্টিমুন্ডা ও তার স্ত্রী, অগ্নিগর্ভ উপন্যাস বিশেষভাবে তাত্পর্যময়।

মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’ উপন্যাস সামাজিক নিপীড়নের বিরুদ্ধে জীবনসংগ্রামের এক প্রামাণ্য দলিল। সমাজ পরিবর্তনের শপথে বিভোর নিহত ব্রতী ও তার বন্ধুদের আত্মোত্সর্গের এক হূদয়বিদারক উপাখ্যান। গত শতকের সত্তর দশকে পশ্চিমবঙ্গের নকশাল আন্দোলনের পটভূমিতে এ উপন্যাস রচিত। সন্তানহারা মা সুজাতার অন্তর্দহন ও প্রচলিত সমাজব্যবস্থার প্রতিকূলে সন্তরণের চিত্র। মা সুজাতা বুকের মধ্যে আদর্শ, নৈতিকতা ও মানবিকতার আলো জ্বেলে রেখে প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন নিরন্তর। ‘হাজার চুরাশির মা’ উপন্যাসে মহাশ্বেতা দেবী এক অস্থির সময় ও ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়কে অসাধারণ দক্ষতায় তুলে ধরেন।

মহাশ্বেতা দেবী বাংলা সাহিত্যে দলিত প্রান্তিক সম্প্রদায়কে নিয়ে সবচেয়ে বেশি সাহিত্য রচনা করেছেন। অধিকারহীন নিগৃহীত যাদের জীবন, সভ্যতার আলোর নিচে অন্ধকারের বিবরে যাদের বসবাস তাঁর লেখায় তা প্রতিফলিত হয় আশ্চর্য শিল্পকুশলতায়। ‘অরণ্যের অধিকার’ উপন্যাসেও তার ব্যত্যয় ঘটেনি। এ গ্রন্থ তাঁর লেখকজীবনের বাঁক পরিবর্তনকারী এক সৃষ্টি। মুন্ডা বিদ্রোহকে কেন্দ্র করে লেখা এ উপন্যাসে মুন্ডা বিরসাকে তিনি বীরের মহিমায় উদ্ভাসিত করেন। সময় তাকে অভিনন্দিত করে। ‘অরণ্যের অধিকার’ প্রকাশিত হবার পর ব্যাপকভাবে তা সাড়া জাগায়। সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কারে ভূষিত হন তিনি। মুন্ডা উপজাতি তাঁকে ‘মারাংদাই’ বা বড়দিদির মর্যাদায় বরণ করে। তিনি তাদের কাছে সাক্ষাত্ দেবীর আসনে অধিষ্ঠিত হন। তবে লেখক হিসেবে তাঁর সাফল্য ও জনপ্রিয়তা অর্জনে ‘তিতুমীর’ উপন্যাস প্রথম দ্বার উদ্ঘাটন করে। তিতুমীরের বীরত্ব, ঔপনিবেশিক শাসন ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে মানুষের প্রতিবাদ, প্রতিরোধ অনমনীয়গাথায় সাহিত্যে জীবন্ত হয়ে উঠেছে।

অসংখ্য ছোটগল্পে তিনি আদিবাসী জীবনসহ সামাজিক অসংগতির বিবিধ বিষয় তুলে ধরেন। গল্পগুলো নানা ব্যাপ্তিতে ধ্বনিময়। গল্পগুলোর সিংহভাগ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনযন্ত্রণা ও সংগ্রামের নিখুঁত বয়ান। এ প্রসঙ্গে কয়েকটি গল্পের নাম উল্লেখ করা যেতে পারে; যেমন—চম্পা, ছায়াবাজী, সোনালী মাছ, শরীর, পিণ্ডদান, ধীবর, জল প্রভৃতি। মহাশ্বেতা দেবীর কাহিনি অবলম্বনে নির্মিত হয়েছে রুদ্রালি’র মতো কালজয়ী চলচ্চিত্র। ইংরেজি, ফরাসি, জার্মান, জাপানি, ইতালি, হিন্দি, অসমীয়া, তেলেগু, মারাঠি-সহ অনেক ভাষায় অনূদিত হয়েছে তাঁর গল্প, উপন্যাস।

মহাশ্বেতা দেবীর জন্ম ১৯২৬ সালের ১৪ জানুয়ারি। এক সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে তাঁর জন্ম ও বেড়ে ওঠা। বাবা কল্লোল যুগের বিশিষ্ট লেখক মনীশ ঘটক। মা ধরিত্রী দেবীও কবিতা লিখতেন। চাচা কিংবদন্তি চলচ্চিত্র পরিচালক ঋত্বিক কুমার ঘটক। স্বামী নাট্যব্যক্তিত্ব বিজন ভট্টাচার্য ও ছেলে লেখক নবারুণ ভট্টাচার্য। সরকারি চাকরি, সাংবাদিকতা ও অধ্যাপনা করেছেন। তবে লেখাকে বেছে নিয়েছিলেন জীবনের পরম ব্রত হিসেবে। এজন্য শেষ পর্যন্ত সবার কাছ থেকে আলাদা হয়ে সাহিত্যের জন্য বেছে নিয়েছিলেন নিভৃত জীবন। শুধু লেখক হওয়া তাঁর জীবনের অভীষ্ঠ লক্ষ ছিল না। লিখেছেন সামাজিক দায়, মানুষের মুক্তি ও মানবিকতার প্রতি প্রগাঢ় মমত্ববোধ থেকে।

মহাশ্বেতী দেবী ১০০টির বেশি উপন্যাস ও বিশটির মতো ছোটগল্প গ্রন্থ রচনা করেছেন। এছাড়া তাঁর উল্লেখযোগ্য কিশোরসাহিত্য রয়েছে। সাহিত্যে তাঁর অপরিসীম অবদানের জন্য নানা সম্মাননা ও পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। পেয়েছেন সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার, জ্ঞানপীঠ, র্যামন ম্যাগসাইসাই, জগত্তারিণী, বিভূতিভূষণ, ভুবনমোহিনী দেবী পদক, নিখিল ভারত বঙ্গ সাহিত্য স্বর্ণপদক-সহ একাধিক সাহিত্য পুরস্কার। ভারত সরকার তাঁকে যথাক্রমে পদ্মশ্রী ও পদ্মবিভূষণে ভূষিত করে। পশ্চিমবঙ্গ সরকার ভূষিত করে সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান ‘বঙ্গবিভূষণ’-এ। কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে লীলা পুরস্কার, ১৯৯৮ সালে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি প্রদান করে। ২০১৬ সালের ২৮ জুলাই তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

মহাশ্বেতা দেবীর সাহিত্য তাঁর বিশ্বাস, বোধন ও মানবমুক্তির তীব্র আকাঙ্ক্ষার শিল্পরূপ। তাঁকে সহজে চেনা যায়, আলাদা করা যায় নিজ বৈশিষ্ট্যের অনিন্দ্য মহিমায়। তাই তাঁর সাহিত্য সমাজ বাস্তবতা ও মানবিক দহনের অনবদ্য দলিল।