দিনি রাহবার আল্লামা নূরউদ্দীন আহমদ গহরপুরী (রহ)

তার মাথায় ছিল সাদা পাগড়ি। গায়ে ছোট্ট আচকান। হাতে একটি লাঠি। অনুচ্চ শারীরিক গঠনে ছিল সাদামাটা পোশাক।  শ্যামল মুখাবয়বে ছিল প্রশান্ত গভীর দুটি চোখ। তার বক্তব্য ছিল ঋজু ও বলিষ্ঠ। তিনি ছিলেন কিছুটা অন্তর্মুখী। আলেমসমাজ ও সাধারণ মানুষের কাছে ছিলেন সমানভাবে গ্রহণযোগ্য। তিনি ছিলেন তাওয়াক্কুল ও হিম্মতের প্রতীক। বরেণ্য আলেমদের কাছে বরেণ্য। তিনি হলেন বাংলাদেশের এক প্রচারবিমুখ দিনি রাহবার আল্লামা নূরউদ্দীন আহমদ গহরপুরী (রহ)। তিনি দেশ-বিদেশে ‘গহরপুরী হুজুর’ ও ‘মুহাদ্দিস সাহেব’ হিসেবেও সুপরিচিত ছিলেন।

আল্লামা নূরউদ্দীন আহমদ গহরপুরী (রহ) সিলেটের বালাগঞ্জের গহরপুর গ্রামে ১৯২৪ সালের ২৪ জুলাই জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম মৌলবি জহুর উদ্দিন, মা ছুরতুন্নেসা ফরুবী। তার পূর্বপুরুষ আফগানিস্তানের অধিবাসী ছিলেন। তারা নবাবি আমলে ভারতের আসাম রাজ্য থেকে সিলেটে এসে বসবাস শুরু করেন। সিলেটের কয়েকটি মাদ্রাসায় প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা অর্জনের পর তিনি ভারতের বিখ্যাত দারুল উলুম দেওবন্দে উচ্চশিক্ষার জন্য ভর্তি হন। ১৯৫২ সালে পটুয়াখালীর পাঙ্গাশিয়া আলিয়া মাদ্রাসার হেড মুহাদ্দিস হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। ময়মনসিংহের ফুলপুরের আশরাফুল উলুম বালিয়া মাদ্রাসায় প্রায় সাড়ে তিন বছর হাদিসের দারস দেন। এরপর ১৯৫৭ সালে নিজ গ্রাম গহরপুরে ‘জামিয়া ইসলামিয়া হোসাইনিয়া’ নামে একটি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। বৃহত্তর সিলেট ও ময়মনসিংহসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে তিনি অসংখ্য দিনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। তিনি ১৯৯৬ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশের সভাপতি ছিলেন।

দেশবরেণ্য এই আলেমেদিন শায়খুল আরব ওয়াল আজম আল্লামা হোসাইন আহমদ মাদানি (রহ)-এর ছিলেন একান্ত খাদেম ও শাগরেদ। দিন প্রচারে ছিলেন একজন নিবেদিতপ্রাণ ব্যক্তিত্ব। ব্যক্তিগত জীবনে ছিলেন অত্যন্ত বিনয়ী ও পরহিতৈষী। তার স্বভাবে ছিল আল্লাহর ওলিগণের বৈশিষ্ট্য। ইলম ও আধ্যাত্মিকতায় তিনি পৌঁছেছিলেন এক উচ্চ মাকামে। ২০০৫ সালের ২৬ এপ্রিল ৮২ বছর বয়সে তিনি ইন্তেকাল করেন। দিনি খেদমতের অংশ হিসেবে মাদ্রাসা পরিচালনায় তার দক্ষতা, ত্যাগ-তিতিক্ষা ও দরদ ছিল সীমাহীন। কেউ কেউ তাকে ‘হাফিজুল হাদিস’ হিসেবেও আখ্যায়িত করেন। বিভিন্ন মাদ্রাসা ও মাহফিলের ছিলেন নিঃস্বার্থ পৃষ্ঠপোষক। তিনি নিজের তহবিল থেকে মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তি চালু করেন। দাওয়াত ও তাবলিগের কাজে ছিলেন ন্যায়নিষ্ঠ। শিরক ও বিদআতের বিরোধিতায় ছিলেন সামনের কাতারের মুজাহিদ। তিনি আল্লাহ আল্লাহ জিকির করতে করতে মৃত্যুবরণ করেন। তার জানাজায় কয়েক লাখ মানুষের সমাগম হয়।

গত বুধবার রাজধানী ঢাকার একটি হোটেলে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে আল্লামা নূরউদ্দীন আহমদ গহরপুরী (রহ)-এর ওপর প্রণীত একটি প্রামাণ্য স্মরকগ্রন্থ উদ্বোধন করা হয়। তার মৃত্যুর ১৫ বছর পর প্রকাশিত এই গ্রন্থে উঠে এসেছে তার জীবন-কর্ম ও সাধনার নানা দিক। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার ২৪১ জনের লেখায় সমৃদ্ধ হয়েছে স্মারকগ্রন্থটি। দেশের শীর্ষস্থানীয় আলেমদের পাশাপাশি এই গ্রন্থে রয়েছে এমপি-মন্ত্রী-মেয়রসহ সমাজের বিশিষ্টজনদের লেখাও। মোট ১২টি অধ্যায়ে বিভক্ত স্মারকগ্রন্থটির পরিশিষ্টে ইংরেজি ও আরবিতে দুটি গুরুত্বপূর্ণ লেখায় তুলে ধরা হয়েছে এই মনীষী-আলেমের সংক্ষিপ্ত জীবনী। প্রায় ৮০০ পৃষ্ঠার স্মারকগ্রন্থটি প্রকাশ করেছে আল্লামা গহরপুরী (রহ) ফাউন্ডেশন। ঝকঝকে প্রচ্ছদে মোড়ানো বোর্ড বাঁধাই রয়েল সাইজের স্মারকগ্রন্থটির শেষ দিকে ২৪ পৃষ্ঠা জুড়ে চার রঙের প্রামাণ্য ফটো অ্যালবাম রয়েছে। সমৃদ্ধ এই স্মারকগ্রন্থের সম্পাদক শরীফ মুহাম্মদ ও নির্বাহী সম্পাদক জহির উদ্দিন বাবর। আল্লামা গহরপুরী (রহ)-এর সাহেবজাদা ও গহরপুর জামিয়ার মুহতামিম মাওলানা মুসলেহুদ্দীন গহরপুরীর তত্ত্বাবধানে প্রকাশিত স্মারকগ্রন্থটির মূল্য ১০০০ টাকা। আল্লামা গহরপুরী (রহ)-এর মতো বরেণ্য আলেমকে স্মরণীয় ও বরণীয় করে রাখতে উদ্যোগটি নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় ও সাধুবাদযোগ্য। আমরা স্মারকগ্রন্থটির বহুল প্রচার কামনা করি।

লেখক :সাংবাদিক