শাটডাউন আর কতদিন

বরকতুল্লাহ সুজন

 

বিশ্ব নেতৃত্ব বা অন্য আর কিছুতে না হোক, সরকারি পরিষেবা দীর্ঘদিন বন্ধ রেখে রেকর্ড করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। যাকে বলা হচ্ছে, গভর্নমেন্ট শাটডাউন। চার সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে চলছে এই অচলাবস্থা। বেকার হয়ে পড়েছে কেন্দ ীয় সরকারের প্রায় আট লাখ কর্মী। এই শাটডাউনের মূলে রয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মেক্সিকো সীমান্তে দেয়াল নির্মাণের স্বপ্ন। যা ছিল তাঁর নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি। নিয়মানুয়ায়ী প্রেসিডেন্টের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে অর্থ বরাদ্দ অনুমোদন করে থাকে কংগ্রেস। এই বরাদ্দ বিলে যুক্ত থাকে কেন্দ ীয় সরকারের অধীনে থাকা গণপরিষেবাসমূহের ব্যয়ও। ডেমোক্র্যাট সদস্যদের বিরোধিতায় কংগ্রেসে আটকে আছে ওই বিল। ফলে নির্দিষ্ট মেয়াদান্তে তথা গত ২২ ডিসেম্বর থেকে বন্ধ হয়ে যায় সরকারি পরিষেবাসমূহ। বাড়ছে দুরবস্থা। একদিকে বেকার হওয়া শ্রমিকদের নাজুক অবস্থা, অন্যদিকে শাটডাউনের পর জরুরি কাজের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে কৃষি, অভ্যন্তরীণ রাজস্ব সেবা এবং কেন্দ ীয় বেসরকারি বিমান প্রশাসন বিভাগ। এতে বলা হয়েছে অনতিবিলম্বে পঞ্চাশ হাজারেরও বেশি জরুরি স্বেচ্ছাসেবী প্রয়োজন।

এই শাটডাউনকে দীর্ঘায়িত বললেও অনাকাঙ্ক্ষিত বলছেন না কেউই। কংগ্রেসে অর্থবিল প্রস্তাবের পরই তা অনুমোদনের জন্য চাপ সৃষ্টি করতে এই হুমকিই দিয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। তিনি বলেছিলেন, বরাদ্দ বিল পাস না হলে এবারের শাটডাউন দীর্ঘায়িত হবে। তবে চার সপ্তাহ অচলাবস্থার পর কিছুটা নমনীয় হন ট্রাম্প। রাজি হন কিঞ্চিত্ ছাড় দিতে। কিন্তু ওই প্রস্তাবও প্রত্যাখ্যান করেছেন ডেমোক্র্যাট নেতারা। ট্রাম্প নতুন যে প্রস্তাব দিয়েছেন, তার মূল কথা হলো শাটডাউন পরিস্থিতির আংশিক সমাধান হবে। বিনিময়ে সীমান্তে দেয়াল নির্মাণে উল্লেখিত ৫৭০ কোটি মার্কিন ডলার বরাদ্দ দিতে হবে। নতুন প্রস্তাবে একটি সমঝোতার কথাও বলেছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। সেটা হলো সীমান্ত দিয়ে কিশোর বয়সে বাবা-মায়ের সাথে অবৈধভাবে আসা ব্যক্তিদের স্বীকৃতি। যাদের বলা হচ্ছে, ড্রিমার্স।

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভেবেছিলেন, নতুন প্রস্তাবে খুশি হয়ে বাজেট অনুমোদন করবেন ডেমোক্রেটিক পার্টির নেতারা। কিন্তু তেমনটি হলো না। ডেমোক্র্যাটদের সাফ কথা সীমান্তে কোনো দেয়াল নয়। নতুন প্রস্তাব দিয়ে ট্রাম্প যে ভাষণ দেন, তাতে তিনি বলেন, শরণার্থীদের স্বাগত জানানোর গর্ব করার মতো ইতিহাস রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের; কিন্তু বহুদিন ধরেই ওই পদ্ধতিতে পচন ধরেছে। একই সাথে তিনি সীমান্তে দেয়াল নির্মাণের কারণ ব্যাখ্যা করেন। ট্রাম্প বলেন, সীমান্তে এই দেয়াল কোনো চলমান কাঠামো হবে না। বরং বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি স্থানে নির্মাণ করা হবে স্টিলের প্রতিবন্ধকতা। কিন্তু এর নির্মাণ খরচ একই রাখা হয়েছে, ৫৭০ কোটি ডলার।

সীমান্ত পাড়ি দিয়ে অনুপ্রবেশকারী শরণার্থীদের দু’টি স্ট্যাটাসে ভাগ করে মার্কিন প্রশাসন। একটি হলো- ড্রিমার্স, যারা ছোট থাকতেই বাবা-মায়ের সাথে ঢুকে পড়েছে। আর একটা হলো টিপিএস, অর্থাত্ টেমপোরারি প্রোটেকশন স্ট্যাটাস। ড্রিমার্সদের সংখ্যা প্রায় সাত লাখ। একটি কর্মসূচির আওতায় বর্তমানে তারা কাজের সুযোগ পাচ্ছে। তবে তারা যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব পাবে না এবং তাদের জোর করে নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হবে না। এর আগে এই কর্মসূচি বাতিলের চেষ্টা করেছিলেন ট্রাম্প। কিন্তু এখন তিনি বলছেন, ড্রিমার্সদের সুরক্ষা আরো তিন বছরের জন্য তিনি বাড়াতে চান। টিপিএসদের জন্যও ভিসার মেয়াদ তিন বছর পর্যন্ত বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দেন ট্রাম্প। তাদের সংখ্যা তিন লাখেরও বেশি। যারা যুদ্ধবিধ্বস্ত বা দুর্যোগপীড়িত বিভিন্ন দেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয় নিয়েছেন। টিপিএসধারীদের কাজ করার সুযোগ রাখারও বিরোধী ট্রাম্প। কংগ্রেসকে ট্রাম্প আরেকটি প্রস্তাব দেন। সেটি হলো- জরুরি মানবিক সাহায্য হিসেবে আশি কোটি মার্কিন ডলার বরাদ্দ দেয়া। যা সীমান্তরক্ষীদের জন্য ব্যয় হবে।

মার্কিন পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি সভা এখন ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণে। আর এ কারণেই যত বিপত্তি। প্রেসিডেন্ট চাইলেই যে কোনো বিল কংগ্রেসে পাস করাতে পারবেন না। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সমঝোতার আগ্রহ কিছুটা চাপ সৃষ্টি করবে বিরোধী শিবিরে। সেটা হলো আলোচনায় ফেরার শিষ্টাচার দেখানো। তবে এখন পর্যন্ত ডেমোক্র্যাটরা মনে করছেন, সবকিছুই প্রেসিডেন্টের হাতে। দলের প্রভাবশালী নেত্রী ন্যান্সি পেলোসির মতে, মানুষের জীবন বাঁচাতে ট্রাম্প ভালো কিছু করার চেষ্টা করতে পারেন বলে মনে হয় না।