গ্যাসের মূল্য নির্ধারণে শুনানি

এলপিজির মূল্য বৃদ্ধির পাশাপাশি ভর্তুকির সুপারিশ

আন্তর্জাতিক বাজারে এলপি গ্যাসের উপাদানের দাম পরিবর্তনের সমান্তরালে দেশের বাজারেও এ জ্বালানি পণ্যের দাম পরিবর্তনের সুপারিশ করেছে এ খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে দেশীয় বাজার সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো বিবেচনায় একটি ফর্মুলা অনুসরণ করা হবে। সরকারি এলপিজির দাম বাড়িয়ে বেসরকারি এলপিজির সমান খুচরা মূল্য করা এবং এ খাতে সরকারের ভর্তুকি দেওয়া প্রয়োজন বলেও মনে করে সংস্থাটি। এর আগে সরকারের জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ে একই সুপারিশমালা জমা দেয় বিইআরসি।

গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর বিয়াম মিলনায়তনে দেশে প্রথমবারের মতো এলপিজির দাম নির্ধারণে গণশুনানি শুরু করে বিইআরসি। তবে বিইআরসির কারিগরি কমিটির মূল্যায়ন-সুপারিশের আইনি ও নীতিগত ভিত্তি নিয়ে           প্রশ্ন তুলেছে ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)। ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলমের প্রশ্নের সদুত্তর দিতে পারেননি বিইআরসির কর্মকর্তারা। দেশে এখনই প্রতি মাসে এলপিজির দাম নির্ধারণের দরকার নেই বলে মনে করেন অধ্যাপক শামসুল আলম। শুনানিতে তিনি বলেন, মাসে মাসে মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব বিইআরসি আইনের লঙ্ঘন। সম্প্রতি সংসদে আইন করে বছরে একাধিকবার জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির যে সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে তাও এভাবে মাসে মাসে মূল্যবৃদ্ধির উদ্যোগকে সমর্থন করে না। তাই কমিশন এ ধরনের চিন্তা পুনর্বিবেচনা করবে বলে আশা করি। আদালতের আদেশ পালন করা মানে এমন একটি সিদ্ধান্তে আসা নয় যা জনবান্ধব নয়।

১৯৭৮ সালে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান এলপি গ্যাস লিমিটেড বোতলজাত তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস বা এলপিজি বাজারজাত শুরু করে। ১৯৯৬ সালে এই ব্যবসায় যুক্ত হন বেসরকারি উদ্যোক্তারা। গত ছয়-সাত বছরে এলপিজির ব্যবহার কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। এমন পরিস্থিতিতে বাজার শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় মূল্যহার নির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

মূল্যহার নির্ধারণ প্রস্তাবনায় রাষ্ট্রীয় সংস্থা বিপিসির আওতাধীন এলপিজিএল সাড়ে ১২ কেজি ওজনের এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ৬০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৭০০ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করে। তবে বিইআরসির কারিগরি কমিটি সারা দেশে একই মূল্যে বিক্রির সুবিধার্থে এর সঙ্গে ক্রস সাবসিডি ফান্ডের অর্থ যোগ করে ৯০২ টাকা করার প্রস্তাব করে। সাবসিডি বাবদ ৩৩৩ টাকা যোগ করা না হলে দাম দাঁড়ায় ৫৬৯ টাকা। তবে ক্যাবের জেরার জবাবে সাবসিডি বাবদ ঐ অর্থ যোগ করার প্রয়োজন নেই বলে জানান এলপিজিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফজলুর রহমান খান।

বেসরকারি এলপি কোম্পানিগুলোর সম্মিলিত প্রস্তাবে বর্তমানে প্রতি কেজি ১০৪ টাকা ৯৩ পয়সা হিসাবে বিক্রি হচ্ছে বলে শুনানিতে উল্লেখ করা হয়। বিইআরসি এই মূল্য ৭২ টাকা ২৪ পয়সা নির্ধারণের সুপারিশ করে। এছাড়া ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডার খুচরা পর্যায়ে ১ হাজার ২৫৯ টাকা করার বেসরকারি কোম্পানিগুলোর প্রস্তাবের বিপরীতে কারিগরি কমিটি এটি ৮৬৬ টাকা নির্ধারণের মত দিয়েছে। এছাড়া ৩৫ কেজির সিলিন্ডারের দাম ২ হাজার ৫২৫ টাকা এবং ৪৫ কেজি সিলিন্ডারের দাম ৩ হাজার ২৪৬ টাকা করার প্রস্তাব দেয় কারিগরি কমিটি।

এই শুনানিতে সরকারি কোম্পানির গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির উদ্যোগের সমালোচনা করে ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা বলেন, এতে করে সরকারি প্রতিষ্ঠান প্রতিযোগিতা সক্ষমতা হারাবে। ফলে চিনিশিল্পের মতো পরিণতির দিকে যাবে। সিপিবির প্রতিনিধি রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, রাষ্ট্রীয় খাতের উন্নয়ন না করে তাদের পণ্যের দাম এমন পর্যায়ে নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে যাতে করে রাষ্ট্রীয় খাত ধ্বংস হয়, ব্যবসায়ীদের সুবিধা হয়। রাষ্ট্রীয় সুলভ মূল্যের গ্যাস সেনাবাহিনীকে দেওয়ার পর যা থাকে তা পরিকল্পিতভাবে দেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে বণ্টন করা যেতে পারে। গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি বলেন, এনার্জি কমিশনের যে নিজস্ব ক্ষমতা রয়েছে তার প্রয়োগ না ঘটার কারণে ভোক্তাদের তাদের দাবি আদায়ে আদালতে যেতে হয়। এই শুনানিতে সব পক্ষের স্বার্থ রক্ষা করা হবে বলে আশা করছি। উল্লেখ্য, দেশে বার্ষিক এলপিজি ব্যবহারের পরিমাণ প্রায় ১ লাখ টন। এর ৯৮ শতাংশ আসে বেসরকারি খাত থেকে। এলপি গ্যাসের চাহিদা ২০২৫ সালের মধ্যে ১ দশমিক ৮ মিলিয়ন টন এবং ২০৩০ সালে ২ দশমিক ৫ মিলিয়ন টনে উন্নীত হতে পারে।

গতকালের শুনানিতে বিইআরসির চেয়ারম্যান আব্দুল জলিল, সদস্য মোহম্মদ আবু ফারুক, মকবুল ই ইলাহি চৌধুরী, মোহাম্মদ বজলুর রহমান ও মো. কামরুজ্জামান উপস্থিত ছিলেন। লাইসেন্সধারী বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ওমেরা গ্যাসের সিইও শামসুল হক আহমেদ, বেক্সিমকো এলপিজির সিএফও মুনতাসির আলম, বসুন্ধরা এলপিজির হেড অব সেলস জাকারিয়া জালাল শুনানিতে অংশগ্রহণ করেন।