জঙ্গিবাদের ভুল বুঝে আত্মসমর্পণ করলেন ৯ জঙ্গি

নবদিগন্তের পথে তারা

জঙ্গিবাদের ভুল বুঝতে পেরে আত্মসমর্পণ করলেন ৯ জঙ্গি। তারা এখন নবদিগন্তের পথে। গতকাল বৃহস্পতিবার র?্যাব সদর দপ্তরে এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তারা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও আইজিপির কাছে আত্মসমর্পণ করেন। ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে পড়েতেই সিলেটের তরুণ শাওন মুনতাহা ইবনে শওকত জড়িয়ে পড়েছিলেন উগ্রবাদী এক সংগঠনে। পরে ডাক্তার স্ত্রী নুসরাত আলী জুহিকেও সেই জালে জড়িয়ে নেন। সংগঠনের নির্দেশে চার বছর আগে দুই শিশু সন্তানকে নিয়ে পরিবার থেকেও আলাদা হয়ে যান। কিন্তু সেসবই যে ভুল ছিল, এখন তা বুঝতে পারছেন তারা। সমাজের মূল ধারায়, স্বাভাবিক জীবনে ফেরার আশা নিয়ে শাওন ও জুহির সঙ্গে আরো সাত তরুণ-তরুণী বৃহস্পতিবার আত্মসমর্পণ করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও আইজিপির কাছে যারা বিভিন্ন সময় জঙ্গিবাদে জড়িয়ে কথিত হিজরতের নামে ঘর ছেড়েছেন। এরপর থেকেই বিভিন্ন স্থানে আত্মগোপনে পালিয়ে বেড়াচ্ছিলেন। র্যাবের মধ্যস্থতায় তারা আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরেছেন। চার বছর পর গতকাল সন্তানকে কাছে পেয়ে আবেগ-আপ্লুত ও অশ্রুসিক্ত হয়ে পড়েন বাবা-মা।

গ্রেফতার করে শাস্তির পথে না গিয়ে এখন জঙ্গিদের পুনর্বাসনের মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে সাহায্য করা হবে বলে জানিয়েছে র্যাব, যারা দীর্ঘদিন ধরে এই তরুণ-তরুণীদের উগ্রবাদী কর্মকাণ্ডের ওপর নজর রাখছিল। র্যাব বলছে ‘ডি-র্যাডিকালাইজেশন অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশন প্রোগ্রাম’র মাধ্যমে তাদের পুনর্বাসন করা হচ্ছে। আত্মসমর্পণ করা ৯ জঙ্গির মধ্যে ছয় জন জেএমবির এবং তিন জন আনসার আল ইসলামের সদস্য ছিলেন। এরা হলেন—সিলেটের শাওন মুনতাহা ইবনে শওকত (৩৪), ডা. নুসরাত আলী জুহি (২৯), কুমিল্লার আবিদা জান্নাত আসমা ওরফে তারাদ ওরফে রামিসা (১৮), আবদুর রহমান সোহেল (২৮), চাঁদপুরের মোহাম্মদ হোসেন ওরফে হাসান গাজী (২৩), মো. সাইফুল্লাহ (৩৭), ঝিনাইদহের মো. সাইফুল ইসলাম (৩১), চুয়াডাঙ্গার মো. আবদুল্লাহ আল মামুন (২৬) ও মো. সাইদুর রহমান (২২)। অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে ফুলের তোড়া দিয়ে তারা স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। এ সময় মন্ত্রী ফিরে আসা ৯ জনকে তাদের অভিভাবকের হাতে তুলে দেন এবং তাদের পুনর্বাসনের জন্য সহায়তা দেন।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, আমরা শুধু জঙ্গিবাদ কঠোর হস্তে দমন করছি তা নয়, পাশাপাশি ডি-র্যাডিকালাইজেশনের মাধ্যমে তাদের ভুল পথ থেকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশ কখনো জঙ্গিবাদকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয় না। প্রধানমন্ত্রী জিরো টলারেন্সের কথা ঘোষণা করেছিলেন। এটা আমরা কখনো বলি না, জঙ্গিবাদকে মূলোত্পাটন করেছি। বলেছি, জঙ্গিবাদকে আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছি।’ তিনি বলেন, ‘আমি অনেক দেশেই গিয়েছি। অনেকেই জিজ্ঞাসা করেছে, তোমরা কীভাবে জঙ্গিবাদকে মোকাবিলা করছো? বলেছি, বাংলাদেশের জনগণ কখনো জঙ্গিবাদকে সমর্থন করে না বলেই আমরা সেটি নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছি।’

আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, ‘পঞ্চগড়ে হিন্দু ইস্কন মন্দিরে পুরোহিত হত্যা, বৌদ্ধ পুরোহিত হত্যা, শিয়া মসজিদে নামাজরত অবস্থায় ইমামকে গুলির দৃশ্য দেখেছিলাম। এখন সে অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। বিশেষ করে র্যাব এক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। আজ তারই প্রতিফলন এই আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠান।’ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘যারা বিভ্রান্ত হয়েছিল, পথ হারিয়েছিলেন, যারা ভুল পথে ভুল আদর্শ বুকে নিয়েছিলেন তারা আজ বাবা-মার কাছে ফিরেছেন। বাবা-মার মুখে হাসি ফুটিয়েছেন, যা অনেক দিন পর দেখছি। ক্যামেরাবন্দি এ দৃশ্য দেখবে দেশের মানুষ। এজন্য র্যাবকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। এদের মধ্যে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার ও শিক্ষক রয়েছেন। তাদের বোঝানো ততটা সহজ ছিল না। কিন্তু সেই কঠিন কাজটি করেছে র্যাব।’

অনুষ্ঠানে পুলিশের মহাপরিদর্শক ড. বেনজীর আহমদ জঙ্গিবাদ থেকে ফিরে আসাদের অভিনন্দন জানিয়ে অন্যদেরও এই পথ অনুসরণের আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘যারা এখনো ঐ পথে আছ, তোমরা ফিরে এসো। ঐ ককটেল, জর্দার কৌটা বা এ জাতীয় জিনিসপত্র দিয়ে তোমরা কারো বিরুদ্ধেই বিজয়ী হতে পারবে না। বরং ঐ পথে গিয়ে তোমরা পরিবার-সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আছ। প্রাণ যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। এই অন্ধকার জগত্ তোমার নিজেদের, পরিবারকে এবং রাষ্ট্রকে বিপদে ফেলতে পারে।’ জঙ্গিদের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে যাওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়ে আইজিপি বলেন, ‘এখনো যারা এ ধরনের কাজে জড়িত আছে, তাদের প্রতি আমাদের নজরদারি অব্যাহত আছে। র্যাব, অ্যান্টি টেরোরিজম ইউনিট, কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটসহ একাধিক টিম তাদেরকে নজরদারিতে রেখেছে। আমাদের গোয়েন্দা কমিউনিটিও এ বিষয়ে তত্পর রয়েছে। হয়তো পরিপূর্ণভাবে সব ঘটনা শুরুতে বিনষ্ট করতে পারিনি। শতভাগ না হলেও ৯০ ভাগেরও বেশি ঘটনা শুরুতেই বিনষ্ট করতে সক্ষম হয়েছি।’

তিনি বলেন, বাংলাদেশ বার বার জঙ্গিবাদে আক্রান্ত হয়েছে। তবে এর কোনোটাই বাংলাদেশ থেকে সৃষ্টি হয়নি। প্রতিবারই বাইরের দেশ থেকে এসেছে। তিনি বলেন, ‘হলি আর্টিজানের পর পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ আমাদেরকে নানা বিধি-নিষেধ দিয়েছে। অনেকে বলেছে, বাংলাদেশ আর ঘুরে দাঁড়াতে পারবে না। পৃথিবীর কোনো দেশ আমাদের তখন সহায়তা করেনি। কিন্তু দেশের মানুষকে সঙ্গে নিয়ে আমরা জঙ্গিবাদকে পরাজিত করেছি। জঙ্গিবাদ বার বার মাথা চাড়া দিয়ে উঠলে আমরা বার বার পরাজিত করব। কোনোক্রমেই দেশে জঙ্গিবাদের কার্যক্রম সফল হতে দেব না।’

ভুল বুঝতে পেরে যারা জঙ্গিবাদ থেকে ফিরে এসেছে, তাদের সমাজে গ্রহণ করার জন্য সবার প্রতি অনুরোধ জানিয়ে র্যাবের মহাপরিচালক চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, তাদেরকে এই সমাজ যেন আন্তরিকতার সঙ্গে গ্রহণ করে নেয়। ‘তুই জঙ্গি’ বলে যেন তাকে আবারও নেতিবাচক পথে ঠেলে দেওয়া না হয়। র্যাবের মহাপরিচালক মামুন বলেন, ‘জঙ্গিবাদ একটা আদর্শিক সমস্যা। এটা মোকাবেলার জন্য প্রয়োজন সঠিক ধর্মীয় ব্যাখ্যা। তাদেরকে সমাজের মূল স্রোতধারায় ফিরিয়ে আনতে চাই।’ তিনি জানান, বৃহস্পতিবার আত্মসমর্পণকারী ৯ জনের মধ্যে আটজনই তাদের পরিবারের কাছে ফেরত যাবেন। একজন আইনি কার্যক্রমের মাধ্যমে পরবর্তীকালে ফেরত যাবেন। মামুন বলেন, ‘জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে আমরা আভিযানিক কার্যক্রম আরো বেগবান করব। কোথাও জঙ্গিরা টিকে থাকতে পারবেন না। তাই যারা পলাতক আছেন, আইনের কাছে আত্মসমর্পণ করুন। বাংলাদেশকে একটি শান্তিপূর্ণ রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে সহায়তা করুন।’

র্যাবের আয়োজনে এই আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানের নাম দেওয়া হয়েছে ‘নব দিগন্তের পথে’। এ বাহিনীর অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন্স) কর্নেল তোফায়েল মোস্তফা সারোয়ার তার স্বাগত বক্তব্যে ‘ডি-র্যাডিকালাইজেশন অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশন প্রোগ্রাম’-এর প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘র্যাব এক্ষেত্রে মাত্র ২৫ দশমিক ৭ শতাংশ করতে পারে, বাকিটা অন্যদের করতে হবে। আমরা তাদের জঙ্গি থেকে পৃথক করতে চাই।’ যারা আত্মসমর্পণ করেছেন, তাদের মধ্যে মামুনকে ফার্মেসি, সাইফুল্লাহ ও সোহেলকে গাভী, সাইদুর, হাসান ও সাইফুলকে ট্রাক্টর দিয়ে পুনর্বাসন করা হচ্ছে বলে তিনি জানান।

যেভাবে তারা অন্ধকার জগতে যান

আত্মসমর্পণকারী শাওন মুনতাহা ইবনে শওকত: বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভিন্ন ‘ধর্মীয় ব্যাখ্যায়’ আকৃষ্ট হয়ে ২০০৯ সালে তিনি হিযবুত তাহরীর সঙ্গে যুক্ত হন। কয়েকজন বন্ধুকেও ঐ সংগঠনে যুক্ত হতে উত্সাহ দেন। ২০১১ সালে মেডিক্যাল ছাত্রী জুহির সঙ্গে বিয়ে হয় শাওনের। স্বামীর উত্সাহে জুহিও একসময় ঐ সংগঠনে যোগ দেন।  শাওন বলেন, এখন পর্যন্ত কোনো ধরনের নাশকতার কাজে তারা জড়াননি। ২০১৬ সালের পর থেকে সংগঠন থেকে তাদের বলা হয়, পরিবার থেকে আলাদা হয়ে যেতে হবে। সে অনুযায়ী ২০১৭ সালে দুই শিশু সন্তানকে নিয়ে তারা ঢাকায় এসে থাকতে শুরু করেন। বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর আমার স্ত্রী একজন চিকিত্সক, কিন্তু এভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকতে থাকতে তার জীবনে অশান্তি আর গ্লানি নেমে আসে। এক কথায় আমাদের সামাজিক ও পারিবারিক জীবন বলতে কিছু ছিল না। তাছাড়া আমার দুই শিশু সন্তানের ভবিষ্যত্ আছে।

শাওন বলেন, ‘একটা সময় আমি আমার ভুল বুঝতে পারি। বুঝতে পারি, আমি ধর্মীয় অপব্যাখ্যার শিকার। আমার ভেতরে নতুন করে বোধোদয় হয়। তখন পরিবারের সঙ্গে আলোচনা করি, নতুন করে বেঁচে থাকার কথা বলি—তারপর এখানে আসা।’ শাওন-জুহির পরিবারের সদস্যরাও উপস্থিত ছিলেন র্যাব সদর দপ্তরে এই আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে। চার বছর পর ছেলে আর ছেলের বউকে কাছে পেয়ে আবেগ আপ্লুত হয়ে পড়েন শাওনের বাবা শওকতুর রহমান। নিজে একজন ব্যাংকার ছিলেন জানিয়ে শওকত বলেন, তার ছেলে কীভাবে জঙ্গিবাদে জড়িয়ে গেল, তিনি তা বুঝতেও পারেননি। কান্নাভেজা কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘কারো সন্তান যাতে এভাবে জঙ্গিবাদে না জড়ায়, সবাইকে এ বিষয়ে এগিয়ে আসতে হবে।’

আবিদা জান্নাত আসমা ওরফে তারাদা রামিসা: উগ্রবাদে আকৃষ্ট হওয়ার পর বাবা-মাকে না জানিয়ে ২০১৮ সালে আনসার আল ইসলামের এক সদস্যকে সাংগঠনিক সিদ্ধান্তে বিয়ে করেন। শুরু হয় স্বামীর সঙ্গে আত্মগোপনের জীবন। আর্থিকভাবে সচ্ছল পরিবারের সন্তান হওয়ায় তিনি ফেরারি জীবনের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েন। ফলে সাংগঠনিকভাবে পরিচিত স্বজনের কাছে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার ইচ্ছা ব্যক্ত করেন। গতকালের অনুষ্ঠানে আসমার মা শাহিনা সুলতানা বলেন, ‘আমার মেয়ে মেধাবী ছিল। ভাবতাম, সে অনেক কিছু করবে সমাজের, অনেক বড় অফিসার হবে। কিন্তু কীভাবে যে কী হলো? এখন আমার মেয়ের জন্য আপনারা দোয়া করবেন।’ ২০১৯ সালে এসএসসি পাশ করার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এক তরুণের সঙ্গে পরিচয়ের পর বিয়ে করে ফেলেন এই কিশোরী। সেই তরুণের মাধ্যমেই জড়িয়ে পড়েন জঙ্গিবাদে। এরপর সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নিঃসঙ্গ জীবনের যে কষ্ট, সে কথা তুলে ধরে আসমা বলেন, ‘আমি ভুল করে এ পথে এসেছিলাম। ভুল বুঝতে পেরে আত্মসমর্পণ করেছি। আশা করছি আমার স্বামীও স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসবে।’ অনুরূপ বক্তব্য দেন আত্মসমর্পণকারী মো. সাইফুল্লাহ, মো. হোসেন, মো. সাইফুল, মো. আবদুল্লাহ আল মামুন ও আবদুর রহমান সোহেল।

র?্যাব মহাপরিচালক চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের প্রফেসর ও সেন্টার ফর জেনোসাইড স্টাডিজের পরিচালক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ, এফবিসিসিআইয়ের শেখ ফজলে রহিম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগের প্রধান খন্দকার ফারজানা রহমান প্রমুখ।