বাড়িওয়ালার নির্মমতায় পাঁচ দিন তালাবদ্ধ ঘরে প্রাণ গেল ছয় মাসের শিশুর

৪ হাজার টাকা অগ্রিম ঘরভাড়া দিতে বিলম্ব হয়েছিল কাঠমিস্ত্রি দম্পতি ইমদাদুল ইসলাম ও তার স্ত্রী তামান্না ইসলামের। স্বামী ইমদাদুল ইসলাম ছিলেন চট্টগ্রামের ঝিউধরা এলাকায় কাঠের কাজে। ভাড়া পরিশোধে কয়দিন সময় চেয়েছিলেন তামান্না। তাতেই প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত হয় বাড়িওয়ালা মো. নওশের। ভাড়াটিয়া তামান্না আর তার ছয় মাসের দুগ্ধপোষ্য শিশু আজিজা তাসমিয়াকে ঘরে ঢুকিয়ে তালা মেরে পাহারা বসায় নওশের। পাঁচ দিন তালাবদ্ধ থাকা অবস্থায় খাবারের জন্য কাতরিয়েছে তামান্না। কিন্তু পাষণ্ড বাড়িওয়ালার মন গলেনি তাতে। সোমবার তালাবদ্ধ ঘরে বালতির পানিতে খেলতে গিয়ে শিশুটি হঠাত্ উলটে যায়। তিনি শিশুটিকে ঐ অবস্থা থেকে উদ্ধার করলেও বাইরে থেকে ঘর তালাবদ্ধ থাকায় চিকিত্সকের কাছে নিতে পারেননি। শিশুটির মা তামান্না জানালা দিয়ে অনেক্ষণ চিত্কারের পর আশপাশের লোকজন তালা ভেঙে তাদের উদ্ধার করেন। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে শিশুটিকে মৃত্যু ঘোষণা করেন চিকিত্সকরা।

মর্মান্তিক এই ঘটনা ঘটেছে খুলনা মহানগরীর হরিণটানা থানার রিয়াবাজার এলাকায়। বুধবার শিশুটির বাবা-মা বাড়িওয়ালা নওশেরকে দায়ী করে থানায় অভিযোগ দিলেও পুলিশ তা গ্রহণ করেনি। উলটো পুলিশ তাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করে বলে অভিযোগ। পরে এই ঘটনায় একটি অপমৃত্যু মামলা নেয় পুলিশ। পরে তারা আদালতে এসে আইনজীবীদের কাছে অভিযোগ দেন। ঘটনার পর থেকে বাড়িওয়ালা নওশের পলাতক। স্থানীয়রা এ ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তারা বাড়িওয়ালার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছে। গতকাল এক বিবৃতিতে ভাড়াটিয়া পরিষদ নেতৃবৃন্দ এ ঘটনায় সম্পূর্ণভাবে নওশেরকে দায়ী করে অবিলম্বে তাকে গ্রেফতারের দাবি জানিয়েছে। অন্যথায় সর্বস্তরের ভাড়াটিয়াকে সঙ্গে নিয়ে আন্দোলন গড়ে তোলা হবে বলে জানান তারা।

ঘটনার বিবরনে জানা যায়, ২০২০ সালের ডিসেম্বর মাসে কাঠের ডিজাইন মিস্ত্রি ইমদাদুল ইসলাম ও তার স্ত্রী তামান্না মাসে ৪ হাজার টাকার চুক্তিতে রিয়াবাজার এলাকায় একতলা বাড়ির দুটি কক্ষ ভাড়া নেন। কিন্তু জানুয়ারি মাসের অগ্রিম ভাড়া দিতে না পারায় ৬ জানুয়ারি থেকে ঘরে শিশুসন্তানসহ তামান্নাকে তালাবদ্ধ করে রাখে নওশের। এ সময় তামান্নার স্বামী চট্টগ্রামের মোংলা ঝিউধরা এলাকায় কাঠের কাজ করছিলেন। ইমদাদুল বলেন, সংসারে অভাব-অনটন থাকলেও সন্তানকে জীবন দিয়ে ভালোবাসতাম। কিন্তু বাড়িওয়ালার নির্মমতায় আজ সেই সন্তানকে হারাতে হলো। স্থানীয় জলমা ইউপি সদস্য শহিদুল ইসলাম লিটন জানান, শিশুটির মা জানালা দিয়ে চিত্কার দিলে আশপাশের লোকজন তালা ভেঙে তাদের উদ্ধার করেন। ততক্ষণে বাচ্চাটি মারা যায়। বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থার খুলনা জেলার কো-অর্ডিনেটর অ্যাডভোকেট মোমিনুল ইসলাম বলেন, অসহায় বাবা-মা থানায় লিখিত অভিযোগ দিলেও পুলিশ মামলা নেয়নি। গতকাল বৃহস্পতিবার শিশুটির ডেথ সার্টিফিকেট ও থানায় করা ইউডি মামলার কপি হাতে পেয়েছি। আগামী সোমবার খুলনা চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের আমলি আদালত ‘লবণচরা অঞ্চল’ এ ঘটনায় মামলা দায়ের করা হবে। এ বিষয়ে লবণচরা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সমীর কুমার সরকার বলেন, মায়ের অবহেলার কারণেই তার শিশু সন্তান পানিতে ডুবে মারা গেছে। এ কারণেই অপমৃত্যু মামলা নেওয়া হয়েছে। বাড়িওয়ালা বাইরে থেকে ঘর তালাবদ্ধ করেছিল কি না সেটি তার জানা নেই। এ বিষয়ে অভিযোগ পেলে বাড়িওয়ালার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।