‘মানুষ যদি সে না হয় মানুষ’

মানুষকে বলা হয় আশরাফুল মাকলুকাত—সৃষ্টির সেরা জীব। কিন্তু কিছু মানুষ কখনোসখনো এমন কিছু অমানবিক কাজ করিয়া বসে—যাহা তাহার মনুষ্যত্বকে প্রশ্নের মুখে ফেলিয়া দেয়। বহু বত্সর ধরিয়া ভূপেন হাজারিকার একটি গান ভীষণ জনপ্রিয়তা অর্জন করিয়াছে—‘মানুষ মানুষের জন্য, জীবন জীবনের জন্য, একটু সহানুভূতি কি মানুষ পেতে পারে না?’ কিন্তু ক্রমবর্ধমান চাহিদা ও প্রতিযোগিতার যুগে মানুষ বড় বেশি আত্মকেন্দ্রিক হইয়া পড়িয়াছে। দেখা যাইতেছে, আমরা যেই সমাজে বাস করিতেছি সেইখানে মানুষে-মানুষে বিশ্বাস, আস্থা, ভালোবাসা, ত্যাগ-তিতিক্ষা, সৌহার্দ-সম্প্রীতি যেন অভিধানের ভিতরেই আবদ্ধ হইয়া পড়িতেছে। শুক্রবার ইত্তেফাকের প্রথম পৃষ্ঠায় প্রকাশিত এমনই একটি ছোট্ট সংবাদ আমাদের বুঝাইয়া দেয়—মানুষ তাহার মনুষত্বের বোধ বহুক্ষেত্রেই বর্গা দিয়াছে স্বার্থের বলিকাষ্ঠে। ঘটনাটি খুলনা মহানগরীর হরিণটানা থানার রিয়াবাজার এলাকায়। প্রকাশিত সংবাদ হইতে জানা যায়, মাত্র ৪ হাজার টাকা অগ্রিম ঘরভাড়া দিতে বিলম্ব করিয়াছিলেন এক কাঠমিস্ত্রি দম্পতি। বাড়িওয়ালার নিকট কাঠমিস্ত্রির স্ত্রী তামান্না অগ্রিম বাড়িভাড়া প্রদানে কয়েক দিন অতিরিক্ত সময় চাহিলে বাড়িওয়ালা নওশের ক্ষিপ্ত হইয়া ভাড়াটিয়া তামান্না আর তাহার ছয় মাসের দুগ্ধপোষ্য শিশু আজিজা তাসমিয়াকে ঘরে ঢুকাইয়া তালাবদ্ধ করিয়া রাখিয়াছিল। কাঠমিস্ত্রি স্বামী তাহার কাঠের কাজের জন্য স্ত্রী সন্তান হইতে দূরে ছিলেন। এই অবস্থায় পাঁচ দিন তালাবদ্ধ থাকিয়া ক্ষুধার জ্বালায় কাতরাইয়াছে তামান্না। কিন্তু পাষণ্ড বাড়িওয়ালার মন গলে নাই। এইদিকে তালাবদ্ধ ঘরে বালতির পানিতে খেলিতে গিয়া শিশু আজিজা হঠাত্ উলটাইয়া যায়। শিশুটিকে ঐ অবস্থা হইতে তাহার মা উদ্ধার করিলেও বাহির হইতে ঘর তালাবদ্ধ থাকায় চিকিত্সকের নিকট লইয়া যাইতে পারেন নাই। অভাগা মা বদ্ধঘরের জানালা দিয়া অনেকক্ষণ ধরিয়া চিত্কার করিলে পর আশপাশের লোকজন তালা ভাঙিয়া তাহাদের উদ্ধার করে। কিন্তু শিশুটিকে হাসপাতালে যখন নেওয়া হয় তখন তাহার দেহে আর প্রাণের চিহ্ন ছিল না।

সমাজবিজ্ঞান বলে, সহজাত প্রবৃত্তির কারণেই মানুষ সমাজবদ্ধ হইয়া বসবাস করিয়া থাকে। মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব এবং প্রকৃতিগত প্রেমবোধই তাহাকে পরস্পরের সহিত মানবিক আচরণে উদ্বুদ্ধ করে। ফলে একজন মানুষ অন্যের কোনো উপকারে আসিতে পারিলে চেতনে-অবচেতনে তিনি অকৃত্রিম প্রশান্তি বা তৃপ্তি লাভ করিয়া থাকেন। ভূপেনের গানে একটি জায়গায় বলা আছে—‘বলো কি তোমার ক্ষতি, জীবনের অথই নদী, পার হয় তোমাকে ধরে দুর্বল মানুষ যদি।’ সত্যিই তো! এই করোনার দুর্বিষহ কালবেলায় বহুদিন ধরিয়া কাজ না পাওয়া অনেক ছিন্নমূল দুর্বল মানুষের দিকে তুলনামূলক সামর্থ্যবান মানুষেরা যদি সহযোগিতার হাত না বাড়াইয়া দেয়—তাহা হইলে কীসের মনুষ্যত্ব? এই ক্ষেত্রে বাড়িওয়ালা নওশের মানবিকতা দেখানো দূরের কথা, উলটে ঘর তালাবদ্ধ করিয়া শিশুটির মৃত্যুর পথ প্রশস্ত করিয়াছে। সত্যিকার অর্থে, কাহারো অন্যেকে সহযোগিতা করিবার সামর্থ্য থাকাটাও সৃষ্টিকর্তার একটি নেয়ামত। এই নেয়ামতকে কাজে না লাগাইলে ঐ মানুষটি মানুষত্বের কঠিন পরীক্ষায় অনুত্তীর্ণ হইয়া থাকেন। সেই যে বলা হইয়াছে—‘মানুষ যদি সে না হয় মানুষ, দানব কখনো হয় না মানুষ। যদি দানব কখনো বা হয় মানুষ লজ্জা কি তুমি পাবে না?’ নওশেরের মতো মানুষ দানবের সমার্থক। তাহাদের লজ্জা থাকিবে কী করিয়া?

ছোট্ট আজিজা মরিয়া প্রমাণ করিল—কিছু মানুষ তাহার স্বার্থের হাড়িকাষ্ঠে সকল কিছু বলি দিতে পারে। সংবাদে ইহাও জানা গিয়াছে, আজিজার মৃত্যুর পর বাড়িওয়ালার বিরুদ্ধে মামলা গ্রহণ করিতে গড়িমসি করিয়াছিল সংশ্লিষ্ট থানা। গরিব ভুক্তভোগীদের মামলা গ্রহণ না করিবার অভিযোগটি অনেক পুরাতন। এই ব্যাপারটিও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে যাচাই ও তদন্ত করিয়া দেখা প্রয়োজন, যাহাতে দেশের কোথাও কোনো অসহায় মানুষ থানায় গিয়া নূতন করিয়া জটিলতায় না পড়ে। রাষ্ট্র যদি গরিব-বান্ধব না হয়, তাহা হইলে গরিব মানুষগুলি কোথায় যাইবে?