ঢাকার কলাবাগানে এক স্কুলছাত্রীর মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনার মধ্য দিয়ে কিশোর অপরাধের আবারো এক ভয়ংকর চিত্র ফুটে উঠেছে। পুলিশের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা দেশে কিশোর অপরাধ বৃদ্ধির জন্য প্রধানত মাদককেই দায়ী করেছেন। তিনি সন্তানের ব্যাপারে পরিবারের সদস্যদের সচেতন হতে পরামর্শ দিয়েছেন এবং বলেছেন, সন্তানের জন্ম যেহেতু দিয়েছেন, কাজেই সন্তানের দায়িত্ব মা-বাবা ও পরিবারকেই নিতে হবে।
সন্তানের প্রতি অবশ্যই পরিবারের দায়িত্ব ও কর্তব্য রয়েছে। সন্তান কখন কোথায় যায়, কাদের সাথে মেশে, কী করে সময় কাটায় ইত্যাদি ব্যাপারে অবশ্যই মা-বাবা ও পরিবারের সদস্যদের খোঁজখবর রাখতে হবে এবং সন্তানকে ঠিক পথে পরিচালিত করতে সব সময় সতর্ক থাকতে হবে। তবে আমাদের মনে রাখতে হবে, মা-বাবা সন্তান জন্ম দিলেও এরাই দেশ ও জাতির ভবিষ্যত্ প্রজন্ম এবং ভবিষ্যতে এরাই দেশ পরিচালনা করবে। কাজেই শিশু-কিশোর ও তরুণদের সঠিক পথে পরিচালিত করার এবং এদেরকে সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার দায়িত্ব রাষ্ট্রেরও রয়েছে। মা-বাবা যেমন দায়িত্ব এড়াতে পারেন না, তেমনি রাষ্ট্রও পারে না এই দায়িত্ব এড়াতে। সর্বত্র ব্যাপক দুর্নীতি, অনিয়ম, বিশৃঙ্খলা এবং সুস্থ ধারার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভাব ইত্যাদি পারিবারিক ও সামাজিক মূল্যবোধের চরম অবক্ষয় ঘটাচ্ছে। যা শিশু-কিশোর ও তরুণদের স্বাভাবিক চিন্তাধারাকে প্রভাবিত করছে এবং অনেক ক্ষেত্রেই তাদেরকে অপরাধপ্রবণ করে তুলছে।
কিশোর অপরাধ এবং নারী ও শিশু নির্যাতনসহ বিভিন্ন ধরনের সামাজিক অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধির একটি প্রধান কারণ হলো মাদকের সহজপ্রাপ্যতা। কিশোর ও তরুণদের মধ্যে মাদকাসক্তের প্রবণতা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। অবশ্যই এই মাদক মা-বাবা ও পরিবারের সদস্যরা সন্তানের হাতে তুলে দেন না। বর্তমানে দেশের সর্বত্র মাদক সহজেই পাওয়া যায়। মাদক নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব যাঁদের ওপর, তাঁরা যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করছেন না বলেই খুব সহজেই তরুণদের হাতে পৌঁছে যাচ্ছে। কাজেই তরুণ সমাজকে মাদকের অভিশাপ থেকে মুক্ত করতে হলে মা-বাবা ও পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের আরো দায়িত্বশীল হতে হবে। মাদকবিরোধী অভিযানকে দুর্নীতিমুক্ত এবং সর্বত্র ডোপ টেস্টের ব্যবস্থা জরুরি।
কিশোর অপরাধ ও সামাজিক অপরাধ বৃদ্ধির পিছনে মাদকের পাশাপাশি ইন্টারনেটের অবাধ ও অপব্যবহারও আরেকটি বড় কারণ। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ব্যাপক প্রসার তরুণ সমাজের মধ্যে ইতিবাচক প্রভাবের চেয়ে নেতিবাচক প্রভাবই বেশি ফেলছে। অন্যদিকে পাসনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা শিশু-কিশোর ও তরুণদের মধ্যে লেখাপড়ার প্রতি ব্যাপক অনীহা সৃষ্টি করছে। করোনা মহামারির কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষাব্যবস্থার অনিশ্চয়তা এই সমস্যাকে আরো তীব্র করে তুলছে। যে কারণে শুধু শহরেই নয়, বরং গ্রামগঞ্জেও কিশোর গ্যাং বড় সামাজিক সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। দেশ ও জাতির মঙ্গলের জন্যই মাদকমুক্ত পরিবেশ এবং ইন্টারনেটের ইতিবাচক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। এ লক্ষ্যে মাদক ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপের বিকল্প নেই।
ফরিদপুর