নিষিদ্ধ কিন্তু বাজার সয়লাব, বলুন তো কী?

 

পলিথিন ব্যাগ পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি—এটা আমরা কমবেশি সবাই জানি। তারপরও ব্যবহার থেমে নেই। প্রশ্ন হচ্ছে, নিষিদ্ধ পলিথিন ব্যাগ প্রকাশ্যে বিস্তারের দায় কার? জনসাধারণকে এর জন্য দায়ী করা মোটেও সমীচীন নয়। পলিথিন ব্যাগের উত্পাদন, বাজারজাতকরণ এবং বিক্রির সঙ্গে যারা জড়িত, এ দায় তাদের। পরিবেশ আইনের যথাযথ প্রয়োগে যাঁরা ব্যর্থ, এ দায় তাঁদেরও। তাছাড়া পলিথিন ব্যাগের বিকল্প সহজলভ্য ও সস্তা কোনো ব্যাগের সন্ধান জনসাধারণ পর্যায়ে এখনো সেভাবে পৌঁছায়নি! ফলে খোলাখুলিভাবে চলছে পলিথিন ব্যাগের ব্যবহার। পলিথিন ব্যাগ পরিবেশের শত্রু—শহরের জলাবদ্ধতা ও কৃষিজমিতে মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব বিস্তার করে চলেছে। কাগজের ঠোঙা, কাপড়ের ব্যাগ কিংবা পাটের ব্যাগ সহজপ্রাপ্য ও কম দাম না হওয়ায় ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়ই পরিবেশবান্ধব এইসব ব্যাগ ব্যবহারে নিরুত্সাহিত হচ্ছেন।

কোপেনহেগেনভিত্তিক সংস্থা ‘দ্য ওয়ার্ল্ড কাউন্টস’-এর তথ্যমতে, প্রতি বছর বিশ্বে ৫ লাখ কোটি টন পলিথিন ব্যাগ ব্যবহার করা হচ্ছে। এর মাত্র ১ শতাংশই পুনঃব্যবহারের জন্য রিসাইক্লিং করা হয়। পলিথিনের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে সাধারণ মানুষ খুব কমই জানে! ‘পবার’ (পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন) তথ্যমতে, ঢাকায় প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি পলিথিন ব্যাগ জমা হচ্ছে, যেগুলো একবার ব্যবহার করেই ফেলে দেওয়া হচ্ছে। ঢাকার ৮০ শতাংশ জলাবদ্ধতার কারণ পলিথিন। তথ্যমতে, ঢাকায় প্রায় ১০০ কোটি পলিথিন ব্যাগ পরিত্যক্ত অবস্থায় আছে। পলিব্যাগ জমে নগরীর স্যুয়ের, স্টর্ম স্যুয়ের, নালা-নর্দমাগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। পলিথিন ব্যাগ স্বাস্থ্যের জন্যও মারাত্মক ক্ষতির কারণ। পলিথিনে খাদ্যদ্রব্য রাখলে তা দ্রুত রাসায়নিক বিষক্রিয়া তৈরি করে। ময়লার ভাগাড়ে কিংবা উন্মুক্ত স্থানে পলিথিন ব্যাগ পোড়ানোর দৃশ্যও চোখে পড়ে। এর ফলে বিষাক্ত হাইড্রোজেন সায়ানাইড গ্যাস নির্গত হয়, যা পরিবেশ ও স্বাস্থ্যের জন্য হুমকিস্বরূপ। পরিবেশবাদী সংগঠনের আন্দোলনের মুখে ২০০২ সালে আইন করে সব রকম পলিব্যাগ উত্পাদন, আমদানি, বাজারজাতকরণ, ক্রয়-বিক্রয়ের জন্য প্রদর্শন, মজুদ, বিতরণ, বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে পরিবহন ও ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয় (তবে রেণু পোনা পরিবহন ও পণ্যের মোড়ক হিসেবে একটু মোটা প্লাস্টিকের মোড়ক বৈধ)।

পলিথিন ব্যাগের বিস্তার রোধে সবার আগে উত্পাদন কারখানাগুলো বন্ধ করে দিতে হবে। উত্পাদন বন্ধ করলে  বিক্রেতা-ক্রেতা পর্যায়ে এগুলো পৌঁছাবে না। সেইসঙ্গে পরিবেশবান্ধব ব্যাগ যেমন কাগজের ঠোঙা, কাপড়ের ব্যাগ, পাটের ব্যাগ ব্যবহারে জনসাধারণকে সচেতন ও উত্সাহিত করতে হবে। পাটের সোনালি ব্যাগ ও টিস্যুর ব্যাগ বাজারে আসার কথা শোনা যাচ্ছে। পরিবেশবান্ধব এই ব্যাগ যত দ্রুত বাজারে আসবে ততই মঙ্গল।

পাটের ব্যাগের দাম নাগালের মধ্যে আনতে হবে। শুরুতে পাটের ব্যাগের ব্যবহার বাড়াতে ও জনপ্রিয় করতে দরকার হলে এর ওপর ভর্তুকি দিতে হবে! পরিবেশ রক্ষায় আইন বাস্তবায়নের দায়িত্ব পরিবেশ অধিদপ্তরের। বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ (সংশোধিত ২০১০) অনুযায়ী নিষিদ্ধ পলিথিন উত্পাদন, আমদানি ও বাজারজাতকরণের শাস্তি দুই বছরের জেল বা দুই লাখ টাকা জরিমানা। একসঙ্গে দুটি দণ্ডও হতে পারে। আবার বিক্রি, প্রদর্শন, মজুদ, বিতরণ, বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে পরিবহন বা ব্যবহারের অপরাধে শাস্তি এক বছরের কারাদণ্ড বা ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড অথবা দুটোই। এমন সময়োপযোগী আইন থাকতেও এর ব্যবহার নেই বললেই চলে। এই আইন উত্পাদনকারী, ক্রেতা ও বিক্রেতাদের জানা আছে বলে মনে হয় না! জানা থাকলে অন্তত প্রকাশ্যে পলিথিনের ব্যবহার হতো না! জনসাধারণের মধ্যে পলিথিনের ক্ষতিকর দিকগুলো তুলে ধরে পলিথিন ব্যাগ ব্যবহারে নিরুত্সাহিত করা জরুরি। এ ব্যাপারে পরিবেশ অধিদপ্তরের পাশাপাশি গণমাধ্যমকে এগিয়ে আসতে হবে। কেননা পরিবেশ রক্ষার দায় কারো একার নয়, আমাদের সবার।

ঢাকা