বাংলার চিরায়ত মাছ ধরার উত্সব

তখনো ভোরের সূর্য চোখ মেলেনি। শীতের ভোরে কুয়াশার চাদরে চার পাশ ভালো করে দেখা যায় না। এরই মধ্যে দলবেঁধে মানুষের ঢল বিলের দিকে। কারো কাঁধে পলো, আবার কারো হাতে ঠেলা জাল, বাদাই জাল, খ্যাপলা জালসহ মাছ ধরার নানা উপকরণ। চলন বিলের হাজারো মানুষ নেমে এসেছেন বিলে। চলছে মাছ ধরার উত্সব।

প্রতি বছরই এমন চিত্র দেখা যায় চলনবিলে। পাবনার ভাঙ্গুড়া উপজেলার রহুল বিলে শুরু হয় মাছ ধরার উত্সব। আঞ্চলিক ভাষায় দলবেঁধে মাছ শিকারের এই আয়োজনের নাম ‘বাউত উত্সব’। আর পলো দিয়ে যারা মাছ ধরে তাদের বলা হয় ‘বাউত’। সে উত্সবে অংশ নেন চলনবিল অঞ্চলের মানুষ।

‘মাছে-ভাতে বাঙালি’ নদীমাতৃক বাংলাদেশের চিরাচরিত প্রবাদ। অসংখ্য নদী, খাল, বিল, হাওর-বাঁওড়, ডোবা, নালার এ দেশে পাওয়া যায় নানা স্বাদের মাছ। আকার আকৃতিতে এরা যেমন বিচিত্র, নামগুলোও তেমনি মজার। বউ মাছ, গুলশা, তপসে, চিতল, কাকিলা, কই, শিং, পাবদা আরো কত কি! তাই মাছপ্রিয় বাঙালির কাছে মাছ ধরাও পরিণত হয়েছে এক উত্সবে। শত শত বছর ধরে স্থানীয়ভাবে এ উত্সব পালিত হয়ে আসছে। পরিণত হয়েছে চিরায়ত গ্রামবাংলার ঐতিহ্যে। দীর্ঘদিন ধরে পাবনার বিল এলাকায় এই বাউত উত্সবের রেওয়াজ রয়েছে। বিলের পানি কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এই পদ্ধতিতে মাছ ধরা শুরু হয়। আগে বিলে প্রচুর মাছ ছিল। ফলে এই মৌসুমে প্রায় প্রতিদিনই পলো দিয়ে অসংখ্য মত্স্য শিকারি মাছ ধরত। কিন্তু এখন মাছ কমে গেছে। ফলে বিলপাড়ের ২০ থেকে ২৫টি গ্রামের মানুষ এক হয়ে এই উত্সবের আয়োজন করেন।

চলনবিলে বাউত উত্সব :পাবনার চলনবিলে মাছ ধরার ঐতিহ্যবাহী ?বাউত উত্সব সারা দেশেই মাছ ধরার উত্সবের জোয়ার এনে দিয়েছে। শত বছরের এই লোকজ উত্সবের সরকারি স্বীকৃতি চান স্থানীয়রা। প্রতি বছরের অগ্রহায়ণ মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে সপ্তাহে দুই দিন শনি ও মঙ্গলবার চলে এই মাছ শিকার। শীতকালে মাছ ধরার এই বাউত উত্সবে পাবনা ছাড়াও আশপাশের জেলার মানুষের সমাগম ঘটে। মাছ যা-ই মিলুক, সবাই মিলে মাছ ধরার আনন্দটাই সবার কাছে মুখ্য বলে জানান মাছ শিকারিরা।

সিলেটের গোয়াহরি বিলে মাছ ধরা :প্রতি বছর মাঘ মাসের প্রথম দিন ঘটা করে পলো দিয়ে মাছ ধরার উত্সব উদ্যাপন করা হয় সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলার গোয়াহরি বিলে। বিলের আশপাশের সব গ্রামে নির্দিষ্ট দিনে ঘোষণা দিয়ে উত্সব পালন করা হয়। মাছ ধরার দিন সকালে বিভিন্ন উপকরণ নিয়ে সবাই বিলে হাজির হয়ে যান। ভিন্ন এক উত্সবে পরিণত হয় দিনটি।

ঠাকুরগাঁওয়ের বুড়ির বাঁধে মাছ ধরা : ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার বুড়ির বাঁধে প্রতি বছরের একটি নির্দিষ্ট সময় হয় মাছ ধরার উত্সব। আর এ উত্সবে জাল, খইয়া জাল, পলো ও মাছ রাখার খলুই নিয়ে যোগ দেন মাছ শিকারি শত শত মানুষ। মাছ ধরার এ আয়োজনকে ঘিরে বুড়ির বাঁধ এলাকা পরিণত হয় মিলনমেলায়।

টাঙ্গাইলে ঐতিহ্যবাহী মাছ ধরার উত্সব :টাঙ্গাইলের সখীপুরের ঐতিহ্যবাহী শাইল-সিঁন্দুর খালে মাছ ধরা উত্সব পালন করেন স্থানীয় মত্স্যপ্রেমীরা। প্রতি বছরই এ উত্সবের আয়োজন করে থাকেন তারা। বছরের নির্দিষ্ট একটি দিনে শাইল-সিঁন্দুর খালে এই মাছ ধরা উত্সব পালন করা হয়। এ দিন সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত বিভিন্ন গ্রামের লোকজন মাছ ধরতে আসেন।