মাধব রায়, গল্পকার-প্রাবন্ধিক
সহকারী অধ্যাপক, ব্লু বার্ড হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজ, সিলেট
মোহাম্মদ রুহুল আমিনএর জন্ম ২৪ মার্চ ১৯৩৫ সালে, নোয়াখালী জেলার বেগমগঞ্জ থানার বাঘচাপড়া গ্রামে। পিতা মোহাম্মদ আজাহার পাটোয়ারি ছিলেন একজন কৃষিজীবী, মা মোছাম্মত্ জোলেখা খাতুন গৃহিণী। রুহুল আমিন পিতা-মাতার প্রথম সন্তান। কাজেই আদরে আদরেই বড় হয়েছেন। তাঁর জন্মের পরে আরও দুটি ভাই এবং চারটি বোনের জন্ম হয়।
রুহুল আমিন ছেলেবেলায় বাঘচাপড়া প্রাইমারি স্কুলে প্রাথমিক শিক্ষা লাভের পর আমিষাপাড়া হাইস্কুলে ভর্তি হন। কিন্তু তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ঢামাঢোলে পিতার আর্থিক অবস্থা অবনতির দিকে যেতে থাকে এবং তাঁর পক্ষে আর পড়ালেখা চালিয়ে যাবার মতো সঙ্গতি থাকে না।
পড়াশুনা ছেড়ে দিয়ে রুহুল আমিন কাজের সন্ধানে ঘুরছেন, একদিন খবর পেলেন নৌবাহিনিতে লোক নিয়োগ করা হচ্ছে। তিনি সেখানে গিয়ে দাঁড়ালেন এবং বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষায় উের গেলেন। ফলে নৌবাহিনির জুনিয়র মেকানিক হিসেবে নিয়োগ পেয়ে যান। ১৯৫৩ সালে তাঁকে প্রশিক্ষণের জন্য পাঠানো হয় করাচির অদূরে আরব সাগরের মনোরা দ্বীপে। সেখানে পাকিস্তান নৌবাহিনির কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পিএনএস কারসাজ এ তাঁর প্রশিক্ষণ চলে ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত। সেই কোর্স শেষ হলে কর্তৃপক্ষ তাঁকে মেকানিক্যাল কোর্সের জন্য নির্বাচিত করে। মেকানিক্যাল কোর্স সমাপ্ত করার পর তাঁকে নিয়োগ দেয়া হয় জাহাজের ইঞ্জিন রুমে আর্টিফিসার পদে। সেখানে তিনি ১৯৬৮ সাল পর্যন্ত কর্মরত ছিলেন। পরে বদলি করা হয় চট্টগ্রাম নৌঘাঁটির পিএনএস বখতিয়ার নামক যুদ্ধ জাহাজে। ১৯৭১ এর মার্চ মাস পর্যন্ত সেখানেই দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
কিন্তু সুদীর্ঘ এই চাকরি জীবনে বাঙালি ও পশ্চিম পাকিস্তানি নাগরিকদের মধ্যে মানসিকতার তারতম্যের বিষয়টা তিনি অবলোকন করেন। রুহুল আমিন এই বিষয়টা নিয়ে অনেক পীড়া অনুভব করতেন। ২৫ মার্চ রাতে যখন পাকবাহিনি বাঙালির অপর হত্যাযজ্ঞ পরিচালনা করে, তখন তাঁর মন বিদ্রোহী হয়ে উঠে। ঢাকাস্থ ইপিআর এবং চট্টগ্রামস্থ বেঙ্গল রেজিমেন্টএর বিদ্রোহের খবর পেয়ে তিনিও যুদ্ধে যাবার জন্য বখতিয়ার থেকে পালিয়ে যান। এরপর ত্রিপুরা সীমান্ত অতিক্রম করে সেখানে অবস্থানরত বেঙ্গল রেজিমেন্টএর সাথে যোগ দেন। মেজর শফিউলাহর নেতৃত্বে ২ নং সেক্টরে নিয়মিত বাহিনির সাথে অনেকগুলো স্থলযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন তিনি। এরপর সেপ্টেম্বর মাসে নৌবাহিনি গঠনের উদ্দেশে বিভিন্ন সেক্টর ও সাবসেক্টর থেকে নৌবাহিনির সদস্যদের আগরতলায় একত্রিত করা হয়। সেই দলে মোহাম্মদ রুহুল আমিন ও ছিলেন।
ভারতের মুর্শিদাবাদের পলাশি ও চব্বিশ পরগনা জেলার টাকিপুরে দুটি প্রশিক্ষণ ক্যাম্প স্থাপন করা হয়। সেখানে মেজর জিয়াউদ্দিন, রহমত উলাহ, জালালউদ্দিন, ভারতীয় নৌ কমান্ডার মনেন্দ্রনাথ সামন্ত, ক্যাপ্টেন শেফহার্ড, লেফটেন্যান্ট এসকে দাসসহ অনেকেই কমান্ডোদের প্রশিক্ষণে সহযোগিতা করেন। সেই ক্যাম্পগুলোতে বাঙালি নাবিকদের বিভিন্ন রকমের জলযুদ্ধের ট্রেনিং দেয়া হয়। লিম্পেট মাইন বহন করে শত্রু জাহাজে গিয়ে লাগিয়ে দিয়ে আসা এবং সময়মতো এর বিস্ফোরণ ঘটিয়ে সম্পূর্ণ জাহাজ ডুবিয়ে ফেলার মতো মৃত্যুঝুঁকিপূর্ণ প্রশিক্ষণও দেয়া হয়। ৩০ জুলাই ১৯৭১ প্রশিক্ষণ পর্ব শেষ হয় এবং অপারেশন জ্যাকপট পরিচালনা করে দেড় লক্ষ টন অস্ত্র-গোলাবারুদসহ বেশ কয়েকটি বড় ছোট জাহাজ ডুবিয়ে দিয়ে কার্যত চট্টগ্রাম, মংলা, নারায়ণগঞ্জ ও চাঁদপুর বন্দরে পাকিস্তানি বাহিনিকে কুপোকাত করে ফেলা হয়। পূর্ব পাকিস্তানের অবস্থা স্বাভাবিক-এ ধরনের খবর আর পাকিস্তান সরকার প্রচার করতে পারে না। ১৪ আগস্ট সুন্দরবনের হিরণ পয়েন্টে লাইটনিং থান্ডার নামে একটি জাহাজ ধ্বংস করা হয়। বেশ কয়েকটি স্পটে অপারেশন চালিয়ে অনেক ক্ষতিগ্রস্থ করা হয় পাকবাহিনিদের।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারত সরকার এবং ভারতের জনগণ নিরংকুশ সহযোগিতা করেছে। এর নিদর্শন স্বরূপ কলকাতা বন্দরে কর্তব্যরত দুটি টাগবোট উপহার হিসেবে দেয়া হয়। টাগদুটিকে কলকাতাস্থ গার্ডেন রিচ নৌ ওয়ার্কশপে নিয়ে কানাডিয় ধরনের দুটি বাফার গান এবং ব্রিটিশ ধরনের ৫০০ পাউন্ডের চারটি মার্ক মাইন বহনযোগ্য করে গানবোটে রূপান্তরিত করা হয়। গানবোট দুটির নামকরণ করা হয় বাংলার নদীর নামে-‘পদ্মা’ ও ফুলের নামে ‘পলাশ’। পলাশ এর গতিবেগ ঘন্টায় ১৫ মাইল। এর দৈর্ঘ্য ১০৫ ফুট, প্রস্থ ৩০ ফুট। কলকাতার তত্কালীন মেয়র প্রফুল্ল কুমার ঘোষ গার্ডেন রিচ জেটিতে আনুষ্ঠানিকভাবে গানবোট দুটিকে পানিতে ভাসান ১২ অক্টোবর তারিখে। গানবোট পলাশ এর ইঞ্জিন রুম আর্টিফিসার হিসাবে মোহাম্মদ রুহুল আমিনকে দায়িত্ব দেয়া হয়। এরপর শুরু হয় পদ্মা ও পলাশ এর বীরত্বগাঁথা। ৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ যশোর সেনানিবাস মুক্তিবাহিনির দখলে আসে। কিন্তু মংলা বন্দর তখনও পাকনৌবাহিনির দখলে। নৌঘাঁটি পিএনএস তিতুমীর দখলের পরিকল্পনা চলতে থাকে। মিত্রবাহিনির গানবোট পানভেল, মুক্তিবাহিনির পলাশ, পদ্মা হলদিয়াঘাট থেকে এবং ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনির পেট্রলক্রাফট চিত্রাঙ্গদা একযোগে মংলা বন্দরের উদ্দেশে রওয়ানা হয়। কোনও প্রতিরোধ ছাড়াই গানবোটগুলি হিরণ পয়েন্টে প্রবেশ করে এবং ১০ ডিসেম্বর ভোর ৪টার দিকে মংলা বন্দরে পৌঁছায়। প্রথমে গানবোট পানভেল, এরপর পলাশ, এরপর পদ্মা খুলনা শিপইয়ার্ড এর দিকে এগুতে থাকে। চিত্রাঙ্গদা মংলা বন্দরে থেকে যায়। পরের অংশ আগামীকাল