মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে এতকালের প্রচলিত ধারা ভেঙে অনেক ক্ষেত্রে ট্রাম্প সম্পূর্ণ ভিন্ন অবস্থান নিয়েছিল। তার সিদ্ধান্ত প্রায়ই অনিশ্চয়তায় ভরা থাকত। ফলে আগে থেকে তার উদ্দেশ্য বোঝা প্রায়ই অসম্ভব হত। বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী দেশের প্রধান কর্ণধারের এমন খামখেয়ালিপনা আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা কাঠামোর স্থিতিশীলতার জন্য মোটেই সহায়ক ছিল না। নির্বাচনে জয়লাভের পর হঠাত্ করেই বিনা প্রজ্ঞাপনে বড় বড় সিদ্ধান্ত নিয়ে সেগুলো বাস্তবায়ন করেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। এসবের মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বুদ্ধিপ্রতিবন্ধীদের জন্য প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার নামে ‘ওবামাকেয়ার’ সেবা চালু করা হয়েছিল তা বাতিল করে দিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। সিরিয়া থেকে শরণার্থী আগমন এবং সাতটি মুসলিম দেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে আগমনে নিষেধাজ্ঞা জারি করে নির্বাহী আদেশ জারি করেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। এর পরই শুরু হয় নানা বিশৃঙ্খলা। আকাশপথে যুক্তরাষ্ট্রগামী বহু যাত্রীকে বাইরের বিমানবন্দরেই আটকে দেওয়া হয়। নিউ ইয়র্কের ফেডারেল আদালত নির্বাহী আদেশের ফলে কোনো অভিবাসীকে জোরপূর্বক বিতাড়নের ওপর সাময়িক নিষেধাজ্ঞার আদেশ জারি করেন। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশ জারির সময় ঐ সব দেশ থেকে যেসব যাত্রী ফ্লাইটে ছিলেন, তাদের অনেককে যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবন্দরে নেমে সমস্যায় পড়তে হয়।
ট্রাম্পের শাসনামলে যে বিতর্কিত, অদূরদর্শী এবং হাস্যকর কর্মকাণ্ডের সঙ্গে মার্কিনিরা পরিচিত হয়েছে অন্য কোনো রাষ্ট্রপতির সময়ে এরকম হয়েছে বলে কোনো নজির পাওয়া যায় না। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের একমাত্র প্রেসিডেন্ট যিনি দুবার অভিশংসিত হয়েছেন এবং কংগ্রেসের পক্ষ থেকে যাকে অপরাধ সংগঠনে জড়িত থাকার কারণে অভিযুক্ত করা হয়েছে। তার নিজের দল রিপাবলিকান এর ১০ জন সদস্য ট্রাম্পের বিপক্ষে গিয়ে ভোট দিয়ে তাকে অভিশংসিত করে। ট্রাম্পের অভিশংসনের পক্ষে ২৩২ ভোট এবং বিপক্ষে ১৯৭ ভোট পড়ে। ক্যাপিটলের দাঙ্গার ঘটনায় বিদ্রোহে উসকানি দেওয়ার কারণে দ্বিতীয়বার তাকে অভিশংসিত হতে হলো। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এ পর্যন্ত সবচেয়ে বিতর্কিত রাষ্ট্রপতি হিসেবে ট্রাম্পের অবস্থান সবার ওপরে। টানা চার বছর স্বেচ্ছাচারিতা, খামখেয়ালিপনা, জোরপূর্বক নিজের সিদ্ধান্ত সবার ওপর চাপিয়ে দেওয়াসহ আরো অমূলক কাজ করেছেন তিনি। এবারের নির্বাচনে যদিও যত্সামান্য অসামঞ্জস্যতা চোখে পড়েছে কিন্তু সেটা ধর্তব্য নয়। এই নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ভোট কারচুপির অভিযোগসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ তুলেছেন। যদিও এসব অভিযোগের পেছনে কোনো প্রমাণ দেখাতে পারেননি। অর্থাত্ চার বছর আগে নির্বাচনে ট্রাম্প জয়লাভের পর যেসব বিদ্বেষমূলক কথাবার্তার সম্মুখীন হয়েছিলেন সেই একই রকম কথার পুনরাবৃত্তি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প করেছেন, এখনো করছেন। নির্বাচনে হেরে যাওয়ার পর এটাকে বানচাল করতে যা যা করা প্রয়োজন সব চেষ্টাই করেছেন। এমনকি সর্বশেষ ক্যাপিটল হিলে যে দাঙ্গা হয় সেটার পেছনেও ট্রাম্পের উসকানিমূলক বক্তব্য ছিল। আর এই উসকানিমূলক বক্তব্যের জন্যই দ্বিতীয়বারের মতো তাকে অভিশংসনের মুখোমুখি হতে হয়েছে। ট্রাম্পের এরকম উন্মাদনার জন্য মনে করা হচ্ছে যে আসন্ন রাষ্ট্রপতির শপথ অনুষ্ঠানেও ট্রাম্পের উগ্র সমর্থকরা ঝামেলা বাধাতে পারে।
এফবিআইয়ের পরিচালক ক্রিস্টোফার রে এর আগে বাইডেনের শপথ অনুষ্ঠান ঘিরে নিরাপত্তা হুমকির আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছিলেন, তারা ঐসব ব্যক্তিদের খুঁজছেন যারা নতুন প্রেসিডেন্টের শপথ অনুষ্ঠানে নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারেন। সাধারণত যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্টের শপথ অনুষ্ঠানে যোগ দিতে সারা দেশ থেকে হাজার হাজার মানুষ ওয়াশিংটনে যান। কিন্তু কোভিড-১৯ মহামারির কারণে এবার এমনিতেই দর্শক উপস্থিতিতে লাগাম টানার কথা ছিল। তার সঙ্গে এখন যোগ হয়েছে নিরাপত্তা উদ্বেগ। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে নির্বাচন এবং ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে এরকম টালমাটাল অবস্থা এর আগে কখনো তৈরি হয়নি। ট্রাম্প তার রাষ্ট্রপতি থাকাকালে জনপ্রিয়তা বাড়ার পরিবর্তে কমেছে। সর্বশেষ বেশ জোরালোভাবে অপমানিতও হয়েছেন। টুইটার থেকে তার অ্যাকাউন্ট সাসপেন্ড করা হয়েছে, ক্ষমতা হস্তান্তরের কিছুদিন আগে দ্বিতীয়বারের মতো অভিশংসন করা হয়েছে। বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর শাসকের জন্য এসব কর্মকাণ্ড সত্যিই লজ্জাজনক। আশাকরি বাইডেন ট্রাম্পের মতো স্বেচ্ছাচারী, অদূরদর্শী, অবিবেচক হবেন না। তার আগে যারা ধারাবাহিকভাবে পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করেছেন, তাদের মতো তিনিও ধারাবাহিকতা বজায় রাখবেন, গণতন্ত্রকে পুনরুজ্জীবিত করবেন। জাতীয়, আন্তর্জাতিক সব অঙ্গনে সাম্যের গান গাইবেন।
n লেখক :শিক্ষার্থী, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ,
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়