মাধব রায়, গল্পকার-প্রাবন্ধিক
সহকারী অধ্যাপক, ব্লু বার্ড হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজ, সিলেট
গতকালের পর
এই অপারেশনের নেতৃত্ব দেন ক্যাপ্টেন মনেন্দ্রনাথ সামন্ত। বেলা ১২টার দিকে গানবোটগুলো খুলনা শিপইয়ার্ডের কাছাকাছি পৌঁছায়। কিছুক্ষণ পর শুরু হবে অপারেশন। হঠাত্ অনেক উঁচুতে তিনটি জঙ্গিবিমান উড়তে দেখা যায়। বাংলাদেশ নৌবাহিনির তরফ থেকে ক্যাপ্টেন সামন্তকে জানানো হয় বিমানগুলো শত্রুপক্ষীয় এবং গোয়েন্দা কার্যে লিপ্ত রয়েছে। এগুলো ভূপাতিত করা প্রয়োজন, আপনার অনুমতি প্রার্থনা করছি। কিন্তু ক্যাপ্টেন সামন্ত বুঝতে ভুল করেন। তিনি বলেন এগুলো ভারতীয় বিমান, শত্রুপক্ষীয় নয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই বিমানগুলো হঠাত্ নিচে নেমে এসে গোলাবর্ষণ করতে থাকে। পদ্মার নাবিক এবং সেনাগণ হতাহত হয় এবং ইঞ্জিন রুমে আগুন ধরে যায়। পলাশ এবং পেনভেল তখনও আক্রান্ত হয়নি।
তখন পলাশের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কমান্ডার রায় চৌধুরী সবাইকে জাহাজ ত্যাগ করার নির্দেশ দেন। পলাশ এর ইঞ্জিন রুম আর্টিফিসার মোহাম্মদ রুহুল আমিন জাহাজ ত্যাগ করার নির্দেশ মেনে নিতে পারেননি। তিনি তখনও যুদ্ধ চালিয়ে যেতে এবং বিমান ভূপাতিত করার নির্দেশ এর অপেক্ষা করছেন, আর শক্ত হাতে ইঞ্জিন রুম পরিচালনা করছেন। তিনি চিত্কার করে জানতে চান জাহাজ ছাড়তে বলা হচ্ছে কেন? আর সবাইকে অনুরোধ করে বলতে থাকেন, জাহাজ যাতে না ছাড়ে। আমরা এগিয়ে যাব এবং যুদ্ধ করে জয়ী হব। তিনি বিমানের দিকে গুলি ছোড়ার নির্দেশ দেন।
এতে নৌসেনারা বিভ্রান্ত হয়ে পড়ল। একদিকে কমান্ডারের নির্দেশ জাহাজ ছাড়, অন্যদিকে ইঞ্জিন রুম আর্টিফিসার এর নির্দেশ গুলি ছোড়। ইতোমধ্যে বিমানগুলো পলাশের ওপর গোলাবর্ষণ শুরু করেছে। বিকট শব্দে পলাশের ইঞ্জিন রুম বিষ্ফোরিত হয়। রুহুল আমিন বুঝতে পারেন, আর পলাশকে বাঁচানো সম্ভব নয়, তিনি পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়লেন।
একদিকে কমান্ডারের অপছন্দের নির্দেশ, অন্যদিকে পলাশের ধ্বংসপ্রাপ্তি, সবকিছু মিলিয়ে তিনি ছিলেন ভীষণ ক্লান্ত, অবসন্ন এবং দিক ভুল করে ফেললেন। প্রবল ঢেউ ও স্রোত মোকাবেলা করে সাঁতরে উঠে গেলেন তার জন্য অপেক্ষারত রাজাকার বাহিনির দিকের তীরে। যখন বুঝতে পারলেন তখন আর কিছুই করার ছিল না। শত্রুবাহিনি তাকে ঘিরে ফেলে এবং বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে তাকে হত্যা করে। এরপর রূপসা ঘাটের পূর্বপারে মোহাম্মদ রুহুল আমিনের লাশ কবরস্থ করা হয়। দেশ স্বাধীন হয় তাঁর রক্তের বিনিময়ে। তাঁর সাহসিকতা, কর্তব্যবোধ এবং দায়িত্ববোধকে সম্মান জানাতে তাঁকে বীরশ্রেষ্ঠ উপাধি দেয়া হয়। ১৯৭৩ সালের ১৫ ডিসেম্বর এক সরকারি গেজেটে মোট সাতজনেক এই মরণোত্তর উপাধি দেয়া হয়।
বিশ্বের বুকে একটি নতুন মানচিত্র সৃষ্টি হয়েছে ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ। যতদিন এই গোটা বিশ্ব থাকবে, মানচিত্রটিও থাকবে। পৃথিবীর মানুষ, আগামী প্রজন্ম এই সাতজন বীরের কথা, তথা ত্রিশলক্ষ শহিদের বীরত্বগাঁথা মুগ্ধ হয়ে পড়বে। তাঁদের আত্মত্যাগের কাহিনি জেনে নিজেদেরকে দেশপ্রেমের আলোকে আলোকিত করবে। তবে বীর শহিদদের রক্তের ঋণ কখনও শোধ করা যাবে না।