ঢাকা শহরের অভিভাবকহীন প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ভবিষ্যত্ প্রজন্মের শিক্ষা কতটা সুরক্ষিত। ভাগ্যসন্ধানী মানুষগুলো সৌভাগ্যের সন্ধানে ছুটে আসে রাজধানীতে। রাজপথের শহরে হাজারো গলিপথ। হতাশায় নিমজ্জিত বস্তিবাসীর ঘরে মানবতার সূর্য কখনোই সম্ভাবনার আলো নিয়ে পৌঁছে না। কোভিড-সংকট নিঃস্ব এই জনগোষ্ঠীকে আরো প্রান্তিক পর্যায়ে নিয়ে গেছে। কোভিড সংক্রামণের এই সময়টি নতুন গণ্য হলেও ভাইরাসের অস্তিত্বের সঙ্গে আমাদের বসবাস নতুন না হলেও এবারের বিষয়টি একেবারে অচেনা। এমন সংকটে কীভাবে দিন পার করছে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী কিংবা তাদের প্রজন্ম । কেমন আছে নিত্যযুদ্ধে টিকে থাকা সোনালি স্বপ্নের খুদে কোমল শিক্ষার্থীরা। কোভিডের প্রাদুর্ভাব এড়িয়ে কীভাবে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সন্তানদের শিক্ষায় অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে তাদের আগামীতে সুরক্ষিত রাখা যায়, সেটিই প্রধান বিবেচ্য। বিভিন্ন গবেষণাপত্র ও গণমাধ্যম সূত্রে জানা গেছে, ভাইরাস সংক্রমণ ভবিষ্যত্ পৃথিবীতে আরো নতুন নতুন রূপে আসতে পারে। সেক্ষেত্রে এ ধরনের অবস্থায় শহরের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর শিক্ষার্থীরা কীভাবে সংক্রমণ এড়িয়ে শিক্ষা ও সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়ায় অন্তুর্ভুক্তির মাধ্যমে সুরক্ষিত হয়ে এগিয়ে যাবে সম্মুখে, এখন এটাই বড় চ্যালেঞ্জ।
কোভিড প্রাদুর্ভাব সত্ত্বেও সবার কাছে শিক্ষা সুযোগ পৌঁছে দিতে অনলাইনভিত্তিক আনুষ্ঠানিক শিক্ষাকার্যক্রাম চলমান রয়েছে। শিশুরা যাতে যথাযথ সামাজিক দূরত্বে থাকে—সে জন্য টিভি, রেডিও, মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেট প্ল্যাটফরম ব্যবহার করে তাদের লেখাপড়া চালিয়ে যেতে সহযোগিতার লক্ষ্যে সরকারের সঙ্গে কাজ করছে ইউনিসেফসহ আরো অনেক সহযোগী সংস্থা। আধুনিক প্রযুক্তির কল্যাণে বাজারে বিভিন্ন নামে মানুষের হাতে পৌঁছে গেছে ফোরজি ইন্টারনেট সংযোজিত স্মার্টফোন। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর আর্থিক টানাপোড়েনে বাটনফোন কেনারই সামর্থ্যই প্রায় অবর্তমান। আবার কারো কারো স্মার্টফোন থাকলেও ডাটার খরচ জোগান অনেকাংশেই কষ্টসাধ্য। ডাটা কিনে দুই-চারটা ক্লাস অনলাইনে অংশগ্রহণ করলেও বাকিটা প্রায়ই অনুপস্থিত থেকে যায়। অধিকাংশের ক্ষেত্রেই বাবা-মায়ের ব্যবহূত স্মার্টফোনটি সংগত কারণে যখন ঘরের বাইরে কর্মস্থলে চলে যান তারা, তখন সন্তানেরা অনলাইনে ক্লাসে সংযুক্ত হতে পারে না। করোনাকালীন প্রান্তিক অভিভাবকদের শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষা উপকরণ হিসেবে স্মার্টফোন/ল্যাপটপ ও ডাটা প্রণোদনা হিসেবে অথবা স্বল্পমূল্যে সরবরাহ করা যেতে পারত। স্মার্টফোন/ল্যাপটপ ও ডাটা ইত্যাদি গ্যাজেট এখন আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার একটি অত্যন্ত অপরিহার্য উপকরণ। ফলে বাংলাদেশকে ডিজিটালাইজড হিসেবে গড়ে তুলতেও এসব উপকরণসমূহের মূল্য ও সরবরাহ সহজলভ্য করা প্রয়োজন।
অনলাইন সুরক্ষা, বিষয়টি স্পর্শকাতর এবং জরুরি। শিশুদের লেখাপড়ায় রাখা, খেলায় অংশগ্রহণ ও বন্ধুদের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ রক্ষা তথা সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়ায় ডিজিটাল প্ল্যাটফরম একটি বিরাট সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে, তবে অনলাইন সুবিধা শিশুর নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা রক্ষায় বড় ঝুঁকিও তৈরি করছে। কোনো কোনো বিষয়ে সাবধানতা প্রয়োজন, অনলাইন প্ল্যাটফরমে কী ধরনের আচরণ করতে হয়, ইত্যাদি বিষয়ে উঠতি শিশু-কিশোররা এখনো তেমন শিক্ষা অর্জন করেনি বা অবগতই নয়। তাই অনলাইনে শিশুদের শিক্ষা সুরক্ষায় ঝুঁকি কমাতে সরকারি-বেসরকারি প্রচারমাধ্যম ব্যবহার করে ডিভাইস ব্যবহারে অভিভাবকের জানতে ও শিখাতে হবে। শিশু-কিশোরদের ডিভাইস ব্যবহারে প্যারেনটাল কন্ট্রোল সেট করা, সুস্থ বিনোদনের জন্য অনলাইনের সঠিক টুলস চিহ্নিত করা, বয়স উপযোগী অ্যাপস, খেলা ও অন্যান্য অনলাইন বিনোদনের পরামর্শ দেওয়া অত্যাবশ্যক। এছাড়াও শিক্ষার্থীদের জানাতে হবে—যদি অনলাইনে নিপীড়নের কোনো ঘটনা ঘটে অথবা আপত্তিকর কিছু চলে আসে, তবে বিষয়টি না লুকিয়ে বাবা-মা, স্কুল কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় প্রশাসনকে জানাতে হবে। অনলাইনে শিক্ষাকে সুরক্ষিত করণে সুস্থ ও নিরাপদ ডিজিটাল কালচার গড়ে তুলতে হবে। দেখা গেছে, শিক্ষার্থীরা অনলাইন ক্লাসে শিক্ষকের লেকচারে যতটা মনোনিবেশ করে তার চেয়ে বেশি নিযুক্ত হয় বন্ধুদের সঙ্গে ফেসবুক চ্যাটিংয়ে। এক জন অভিভাবকের খেদোক্তি করে বলেছিলেন, ‘আগে সন্তাকে ফোন ধরতে নিষেধ করতাম, আর এখন সেই স্মার্টফোনই ডাটাসহ তার হাতে তুলে দিয়েছি। সন্তান এখন সারা দিনই সেটি নিয়ে বসে থাকে’। করোনা-পরবর্তী শিক্ষা সুরক্ষায় ক্লাসরুমভিত্তিক শিক্ষাকার্যক্রমের পাশাপাশি ডিজিটাল প্ল্যাটফরর্মে শিক্ষাগ্রহণ প্রক্রিয়া চালু রাখা উচিত। শারীরিকপ্রতিবন্ধী, প্রান্তিক জনপদ বা যে কোনো শিক্ষার্থী যেন শিক্ষা গ্রহণে বঞ্চিত না থাকে, সেই সঙ্গে শিক্ষার উপকরণ হিসেবে ল্যাপটপ, স্মার্টফোন এবং ডাটার সহজলভ্যতার দিকে খেয়াল রাখতে হবে। তা না হলে, ঘোড়ার আগে গাড়ি বেঁধে দেওয়ার মতো হবে আমাদের অনলাইন শিক্ষাকার্যক্রম।
লেখক :পিএইচডি গবেষক স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ও উন্নয়নকর্মী