নয়নাভিরাম সৌন্দর্যের আধার পাবনা-সিরাজগঞ্জ-নাটোরের চলনবিলই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বিল। মত্স্য ভান্ডারখ্যাত এই বিল শুধু বিলই নয়, এ যেন প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক অপরূপ লীলাভূমি। ভ্রমণপিপাসু মানুষ এই বিলের সৌন্দর্য দেখতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রায়ই এখানে ছুটে আসেন। দেশের সবচেয়ে বড় এ জলাভূমি এককালে মাছ ও দেশি-বিদেশি পাখির জন্য বিখ্যাত ছিল। এখন মুক্ত জলাশয়ের মাছের পরিমাণ কমে এলেও মাছের পরিমাণ একেবারেই ফুরিয়ে যায়নি।
যে বিশাল এলাকা নিয়ে এই বিলাঞ্চল, তার মধ্যে রয়েছে সিংড়া, গুরুদাসপুর, বড়াইগ্রাম, চাটমোহর, ফরিদপুর, ভাঙ্গুড়া, সলঙ্গা, উল্লাপাড়া ও তাড়াশ উপজেলা। বর্ষায় এই বিলের কূলকিনারাহীন ঢেউ ভ্রমণপিয়াসি মানুষকে মুগ্ধ করে। চলনবিলের মধ্য দিয়ে হাটিকুমরুল-বনপাড়া মহাসড়কে বর্ষা মৌসুমের প্রায় প্রতিদিন দেশি-বিদেশি পর্যটক চলনবিলের মুগ্ধতা অনুভব করে। অনেকেই মনে করেন, এখানে পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলা হলে তা কক্সবাজার, সেন্টমার্টিন বা কুয়াকাটার চেয়েও দর্শনীয় হবে। চলনবিল অঞ্চলে প্রচলিত প্রবাদ বাক্যে আছে, ‘বিল দেখতে চলন-গ্রাম দেখতে কলম-আর শিব দেখতে তালম’। দেখার ও জানার এই তিনটি বিষয় একই সঙ্গে পাবেন চলনবিলের পর্যটকরা। এক সময় এই বিলাঞ্চলে কোনো মানুষের বসবাস ছিল না। কালক্রমে নদীবাহিত পলিমাটির চর গড়ে ওঠে বিলের নানা জায়গায়। আর সেখানে দুর্দান্ত প্রকৃতির সাহসী মানুষ মাছ ও পাখি শিকারের মানসে চলনবিলের মধ্যে পুকুর বা দীঘি খনন করে তার পাড়ে গড়ে তোলে বসতি। সেখান থেকেই সৃষ্টি হয়েছে গ্রাম।
এখানকার বিশাল বিশাল দীঘির মধ্যে রয়েছে জয়সাগর দীঘি, উলিপুর দীঘি, তাড়াশের কুঞ্জবন, নওগাঁয় ভানুসিংহ দীঘি, বাজার দীঘি, মথুরা দীঘি, ধানচালা দীঘি, দেবীপুরের ভটের দীঘি, মুনিয়া দীঘি, শীতলাই জমিদার বাড়ীর দীঘি, সগুনা দীঘি, সুলতানপুর দীঘি, ভায়াটের দীঘি, উনুখার দীঘিসহ বড় বড় আরো অনেক পুকুর রয়েছে। এসব দীঘি এখন মত্স্য চাষের খামারে পরিণত হয়েছে। চলনবিল থেকে জেলেদের আহরিত মাছ বিক্রি করার জন্য চাটমোহর ও তাড়াশ উপজেলার বিভিন্ন বাজারে এবং বিলের এক প্রান্তে বিশ্বরোডসংলগ্ন মহিষলুটি বাজারে গড়ে উঠেছে বিশাল আড়ত্। সকাল ৬টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত এ আড়তে মনোমুগ্ধকর বিভিন্ন প্রজাতির মাছ, যেমন—পবা, কই, বাচা, চিতল, কাতল, বেলে, বউ মাছ, বাঁশপাতা, শোল-গজার, রুই, মাগুর, টেংরা, পুঁটি, আইড়, বোয়াল, ফলি, চিংড়ি, টাকি, বাইন মাছ পাওয়া যায়।
বর্ষায় পানিতে যেমন ডুবে টইটম্বুর থাকে এই চলনবিল, আর শুকনো মৌসুমে মাঠ জুড়ে ফুটে থাকে সরিষা ফুল আর বোরো ধানের মাঠে সবুজের সমারোহ, এ যেন এক টুকরো বাংলাদেশ। মধ্যখানে গাঢ় সবুজের বুকে হলুদের ছিটা। এই সৌন্দর্য খুব কাছ থেকে দেখার মানসে, কাজের ফাঁকে ক্লান্তি দূর করতে এশিয়ার এই সর্ব বৃহত্ বিলে নিত্যদিনই ছুটে আসে হাজার হাজার মানুষ।
সরিষা ফুলের সমারোহে নয়নাভিরাম চলনবিলের সৌন্দর্য বহুকাল ধরেই মানুষকে মুহিত করেছে। বর্ষাকালে চতুর্দিকে শুধু পানি আর পানির বিপরীতে শুষ্ক মৌসুমে চারিপাশ জুড়ে থাকে শুধুই সরিষার খেত। বিল নয়, এ যেন একটা ছোট্ট ভূস্বর্গ। প্রকৃতির এই অপার সুন্দর্যে মুগ্ধ হতে প্রতিদিনই এখানে এসে জড়ো হয় হাজারো মানুষ।
দেশের বৃহত্তম বিল চলনবিলকে ঘিরে বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও সরকারি বেসরকারিভাবে বিনিয়োগ, প্রয়োজনীয় উদ্যোগ ও সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে সেখানে পর্যটনশিল্প গড়ে উঠছে না। পর্যটকদের জন্য খাদ্য, নিরাপত্তা, যাতায়াত, আবাসন সুবিধাসহ কয়েকটি দর্শনীয় স্পটের অবকাঠামোগত উন্নয়ন চলনবিলকে দেশের অন্যতম পর্যটন এলাকায় পরিণত করতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
n লেখক :শিক্ষার্থী,
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।