চলচ্চিত্রে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস তুলে ধরুন

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের চলচ্চিত্রশিল্প টিকিয়ে রাখতে সম্ভব সবকিছু করার আশ্বাস  দিয়ে বিজয়ের ইতিহাস প্রজন্মান্তরে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য অধিক হারে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য সংশ্লিষ্টদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, ‘সঠিক ইতিহাস যাতে সবাই জানতে পারে। কারণ আমরা মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জনকারী বীরের জাতি। সেই বিজয়ের ইতিহাস প্রজন্মের পর প্রজন্ম যেন মনে রাখতে পারে, সেই ধরনের চলচ্চিত্র আরো নির্মাণ হওয়া দরকার। একই সঙ্গে শিশুদের জন্য এমনভাবে চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে হবে, যাতে তারা সেখান থেকে ভবিষ্যত্ জীবন গড়ার অনুপ্রেরণা পায়।’

গতকাল রবিবার সকালে ‘জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার-২০১৯’ প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী এ কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে তথ্য মন্ত্রণালয় আয়োজিত মূল অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন। ২০১৯ সালে ২৬টি ক্যাটাগরিতে ৩৩ জন শিল্পী এবং কলাকুশলীকে পুরস্কৃত করা হয়। প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ পুরস্কার বিজয়ীদের মধ্যে পদক, রেপ্লিকা, সম্মাননার চেক ও সনদ বিতরণ করেন। তারিক আনাম খান (আবার বসন্ত) এবং সুনেরাহ বিনতে কামাল (ন ডরাই) ২০১৯ সালের শ্রেষ্ঠ অভিনেতা ও অভিনেত্রীর পুরস্কার লাভ করেন। এছাড়া শ্রেষ্ঠ খল চরিত্রের জন্য জাহিদ হাসান (সাপলুডু) এবং শ্রেষ্ঠ পরিচালক হিসেবে তানিম রহমান অংশু (ন ডরাই) পুরস্কার লাভ করেন এবং যৌথভাবে ‘ন ডরাই’ ও ‘ফাগুন হাওয়ায়’ শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র মনোনীত হয়। মাসুদ পারভেজ সোহেল রানা ও কোহিনুর আক্তার সুচন্দা আজীবন সম্মাননা পুরস্কার লাভ করেন।

পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট জাতির পিতাকে হত্যার পর আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত করার অপচেষ্টা করা হয়েছে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমাদের চলচ্চিত্রে শিল্প ও সংস্কৃতি যেমন থাকবে, তেমনি বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য উপকরণও থাকতে হবে। পাশাপাশি সেখানে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বিজয়, নীতি-আদর্শ এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতিফলন থাকাটা দরকার।’ চলচ্চিত্রকে একটি শক্তিশালী গণমাধ্যম আখ্যায়িত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা রাজনীতিবিদেরা যত কথাই বলি না কেন; একটি নাটক, সিনেমা বা গান বা কবিতা দিয়ে অনেক কথা বলা যায় এবং মানুষের অন্তরে প্রবেশ করা যায়। মনের গহিনে প্রবেশ করা যায়। সেজন্য এর একটা আবেদন রয়েছে।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের দেশের সাধারণ মানুষের বিনোদনের একমাত্র মাধ্যম চলচ্চিত্র। অথচ এটি কিন্তু দিনে দিনে শেষ হয়ে যাচ্ছে। তাছাড়া এই ডিজিটাল যুগে, যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে না করা হলে এর আকর্ষণ যেমন থাকে না, তেমনি বাজারও পাওয়া যায় না। সেজন্যই বিএফডিসিকে উন্নত করায় তার সরকার একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে। ঢাকার নিকটে কালিয়াকৈরের কবিরপুরে ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ফিল্ম সিটি’ নির্মাণের প্রথম পর্যায়ের কাজ শেষ হয়েছে বলেও শেখ হাসিনা তার বক্তৃতায় উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘সেখানে আধুনিক সিনেমা তৈরি করতে যা যা প্রয়োজন, সেই ধরনের সব সুবিধা রাখা হচ্ছে। আমাদের চলচ্চিত্র কেবল দেশে নয়, বিদেশেও যাতে যেতে পারে সেদিকে লক্ষ্য রেখেই আমরা সেনসর সংক্রান্ত আইন ও বিধি আধুনিকভাবে তৈরি এবং সেগুলো কঠোরভাবে যেন মানা হয় সেদিকেও বিশেষভাবে দৃষ্টি দিচ্ছি।’ শেখ হাসিনা বলেন, ‘১ হাজার কোটি টাকার একটি ফান্ড আমরা তৈরি করব, যেখান থেকে অল্প সুদে টাকা নিয়ে সংশ্লিষ্টরা সিনেমা হল বা সিনেপ্লেক্স তৈরি করতে পারবে। এতে ঐ অঞ্চলের মানুষের বিনোদনের ব্যবস্থাটা হবে।’ তিনি বলেন, অনেকগুলো সিনেমা হল বন্ধ হয়ে গেছে। কাজেই সেগুলো পুনরায় চালু করা শুধু নয়, এর আধুনিকায়ন করা দরকার। ৩২৩ কোটি টাকা ব্যয়ে সরকারের বিএফডিসি কমপ্লেক্স নির্মাণের কাজ চলমান রয়েছে বলে তিনি জানান।

শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমাদের এই শিল্প নষ্ট হয়ে যাক কখনো সেটা আমরা চাই না। আমাদের দর্শক টানতে হবে। মানুষ যাতে সিনেমা দেখে তার ব্যবস্থা করতে হবে।’ প্রধানমন্ত্রী সুস্থধারার চলচ্চিত্রের পাশাপাশি শিশুদের জন্য শিক্ষণীয় শিশুতোষ চলচ্চিত্র নির্মাণের ওপরও গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, পরিবার-পরিজন নিয়ে দেখা যায় তেমন সিনেমা যেমন তৈরি করতে হবে, তেমনি শিশুদের জন্য চলচ্চিত্র নির্মাণটাও একান্তভাবে জরুরি। কারণ এর মাধ্যমেই একজন শিশু তার জীবনটাকে দেখতে পারবে এবং আগামীর জন্য নিজেকে তৈরি করতে পারবে। তিনি বলেন, তার সরকারের প্রচেষ্টায় ইতিহাস ও ঐতিহ্য সুরক্ষায় চলচ্চিত্রব্যবস্থার উন্নয়ন, ডিজিটাল পদ্ধতিতে সনাতন চলচ্চিত্রের সংরক্ষণ এবং বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভের কার্যক্রম পুনরুদ্ধার প্রকল্পের কাজ শেষ হয়েছে। বিশ্বমানের চলচ্চিত্র নির্মাণে প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্বারোপ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সরকার এজন্য ট্রেনিং ইনস্টিটিউট স্থাপন করেছে এবং বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউট ও জাতীয় গণমাধ্যম ইনস্টিটিউট ভবন সম্প্রসারণ করা হয়েছে। যেন যথাযথ প্রশিক্ষণ নিয়ে আমাদের শিল্পীরা উন্নতমানের চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে পারেন। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষ্যে বঙ্গবন্ধুর জীবনী নিয়ে বাংলাদেশ-ভারত যৌথ প্রযোজনায় একটি চলচ্চিত্র নির্মাণের কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। এজন্য ইতিমধ্যে বিখ্যাত ভারতীয় পরিচালক শ্যাম বেনেগালকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে।’

পুরস্কার বিতরণ ও আলোচনা পর্ব শেষে প্রধানমন্ত্রী চলচ্চিত্রশিল্পীদের পরিবেশনায় মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও উপভোগ করেন। তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন। তথ্যসচিব খাজা মিয়া স্বাগত বক্তৃতা করেন। পুরস্কার বিজয়ীদের পক্ষে আজীবন সম্মাননা বিজয়ী মাসুদ পারভেজ সোহেল রানা নিজস্ব অনুভূতি ব্যক্ত করে বক্তৃতা করেন। তথ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. মুরাদ হাসান, মন্ত্রিপরিষদ সদস্যবৃন্দ, সংসদ সদস্যবৃন্দ, অভিনেতা-অভিনেত্রীসহ কলাকুশলীবৃন্দ এবং আমন্ত্রিত অতিথিবৃন্দ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। অন্যদিকে গণভবনে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ড. আহমদ কায়কাউসসহ গণভবন এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ অনুষ্ঠানে বলেন, শিল্পের সমস্ত মাধ্যমকে একত্রিত করে যে শিল্প, সেটাই চলচ্চিত্র। বঙ্গবন্ধুর হাত ধরে যে চলচ্চিত্রশিল্পের যাত্রা শুরু, বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা শুধু এর স্বর্ণালি দিন ফিরিয়ে আনা নয়, বরং আমাদের চলচ্চিত্র যেন বিশ্ববাজারেও একটি স্থান দখল করে নিতে পারে, সেই লক্ষ্যে অনেকগুলো পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করে যাচ্ছেন।