দুস্থদের জন্য বরাদ্দের বিপুল অর্থ ‘লোপাট’

বগুড়ার ৩০ কোটি ৫৫ লাখ ৭০ হাজার টাকার প্রকল্পের অধিকাংশ ক্ষেত্রে শতভাগ ব্যয় দেখানো হলেও সেসব ক্ষেত্রে বাস্তবে কোনো কাজ হয়নি। লুটপাট করা হয়েছে হতদরিদ্রদের জন্য বরাদ্দের কোটি কোটি টাকা। সরকারের পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরীবিক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের এক মনিটরিং প্রতিবেদনে এ চিত্র উঠে এসেছে।

বগুড়া জেলার সারিয়াকান্দি ও সোনাতলা উপজেলার চর এলাকায় বসবাসরত ‘দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন প্রকল্প’ নামে প্রকল্পটি হাতে নেয় স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার ও সমবায় বিভাগ। প্রকল্পের মেয়াদ ছিল গত বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত, পরে চলতি বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে দেওয়া হয় বগুড়া পল্লী উন্নয়ন একাডেমিকে। এই প্রকল্পের পিডি (প্রকল্প পরিচালক) আরডিএর প্রশিক্ষণ বিভাগের পরিচালক ড. সমীর কুমার সরকার। উপপ্রকল্প পরিচালক ছিলেন একই প্রতিষ্ঠানের উপপরিচালক মো. মহিউদ্দিন।

কাজ না করেই এই প্রকল্পের টাকা তছরুপের বিষয়টি ধরা পড়ে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের মনিটরিং রিপোর্টে। এই প্রকল্প মনিটরিং করেন পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরীবিক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের কর্মকর্তা মোহাম্মদ হামিদুর রহমান। বিষয়টি মনিটরিং করে গত ৩ ডিসেম্বর তিনি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন জমা দেন। সেই প্রতিবেদনে কোটি কোটি টাকা তছরুপের চিত্র উঠে আসে।

প্রতিবেদন সূত্রে জানা গেছে, উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা অনুযায়ী গত জুনের মধ্যে ৬ হাজার পরিবারকে ৩ হাজার গরু ও ৩ হাজার ছাগল দেওয়ার কথা ছিল। এ খাতে ব্যয় নির্ধারণ ছিল ৮ কোটি ১০ লাখ টাকা। সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ২ হাজার ৯১২টি গরু ও ২ হাজার ৯৩১টি ছাগল বিতরণ করা হয়েছে। এ খাতে ব্যয় করা হয়েছে ৭ কোটি ৮৬ লাখ ৯৫ হাজার টাকা। ৩ হাজার গরু ও ৩ হাজার ছাগলের চিকিত্সা ও খাদ্যসহায়তায় স্টাইপেন্ড        দেওয়ার জন্য ৩ কোটি ৭৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ করা হয়। গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিতরণ করা গরু ও ছাগলের চিকিত্সা ও খাদ্যসহায়তায় স্টাইপেন্ড দেওয়ার জন্য ২ কোটি ৮৩ লাখ ৫৭ হাজার টাকা নির্ধারণ ছিল। কিন্তু ব্যয় করা হয়েছে ২ কোটি ৭৭ লাখ ৪২ হাজার টাকা। কাজটি মোবাইল ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠান বিকাশের সঙ্গে প্রকল্প দপ্তরের সমঝোতা চুক্তি হয়। গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সুফলভোগীদের বিকাশ নম্বরে (সেলফোন) ১ কোটি ৬২ লাখ ২৫ হাজার ৫৪০ টাকা দেওয়া হয়েছে। অর্থাত্, এই খাতে ১ কোটি ১৫ হাজার টাকা গায়েব করা হয়েছে।

এ প্রকল্পে ১২ হাজার ২২০ জন সুফলভোগীকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য ৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা বরাদ্দ রয়েছে। গত অক্টোবর পর্যন্ত প্রশিক্ষণের জন্য ২ কোটি ৬৭ লাখ ২৬ হাজার (বরাদ্দের ৮৮.৯৩%) টাকা ব্যয় করা হয়েছে। অথচ প্রশিক্ষণ পেয়েছেন মাত্র ৪৫০ জন। অর্থাত্, লক্ষ্যমাত্রার ৩ দশমিক ৭০ শতাংশ সুফলভোগীকে প্রশিক্ষণ দিতেই বরাদ্দের প্রায় ৮৯ শতাংশ ব্যয় দেখানো হয়েছে। প্রকল্পে দুটি কৃত্রিম প্রজনন ইউনিট করার বিধান রয়েছে। এ খাতে ৮৪ লাখ ৭৫ হাজার টাকা বরাদ্দ ছিল। অক্টোবর পর্যন্ত ৭৩ লাখ ৬৮ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে। বরাদ্দের ৮৭ শতাংশ অর্থ ব্যয় করে ৪০ শতাংশেরও কম কাজ করা হয়েছে। এ খাতে কাজের ক্ষেত্রে নির্দেশনা মানা হয়নি। কেবল তাই নয়, অধিকাংশ কাজ না করেই ব্যয় দেখানো হয়েছে। স্যাটেলাইট স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র স্থাপনের জন্য ৪৫ লাখ টাকা বরাদ্দ রয়েছে। বাস্তবে এ খাতের ‘শতভাগ’ টাকা খরচ দেখানো হলেও কোনো ক্লিনিক (স্যাটেলাইট স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র) স্থাপন করা হয়নি। ৩০টি সাইলেজ চপিং মেশিন, আটটি নছিমন (চরের গাড়ি), ৩০০ পরিবারে অন্যান্য সামগ্রী সরবরাহের জন্য ৪৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ রয়েছে। এ খাতেও শতভাগ টাকা ব্যয় করা হয়েছে, কিন্তু কোনো নছিমন অথবা সাইলেজ চপিং মেশিনের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। গরু মোটাতাজাকরণ ও উদ্যোক্তা তৈরি খাতে ৭৫০টি ফিডিং সিস্টেমসহ গরুর শেড নির্মাণের জন্য ৫৬ লাখ ২৫ হাজার টাকা ও ৭৫০ পরিবারকে গরু মোটাতাজাকরণের জন্য চার মাসব্যাপী খাবার সরবরাহের জন্য ৪৫ লাখ টাকা বরাদ্দ রয়েছে। এক্ষেত্রে শতভাগ ব্যয় দেখানো হয়েছে।

জানতে চাইলে মনিটরিং কর্মকর্তা মোহাম্মদ হামিদুর রহমান বলেন, এই প্রকল্পের  বিষয়টি মাঠ পর্যায়ে মনিটরিং করে বিষয়গুলো উঠে এসেছে। এটা ব্যক্তিগত কোনো বিষয় নয়। প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মিত একটি প্রক্রিয়া। মনিটরিং শেষে সুপারিশসহ রিপোর্ট সংশ্লিষ্ট দপ্তরে জমা দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ‘প্রকল্পের সিংহভাগ অর্থই তো কাজ না করে তুলে নিয়েছেন। প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধি না হলে তারা কী করতেন?’

যোগাযোগ করা হলে প্রকল্প পরিচালক ড. সমীর কুমার সরকার দাবি করেন, ‘পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরীবিক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের প্রতিবেদন সঠিক নয়। এই প্রকল্পের কিছু কাজ বাকি ছিল করোনার কারণে। সেই কাজগুলো করে ফেলেছি। এ বিষয়ে অভ্যন্তরীণ একটি টিমও গঠন করা হয়েছে বিষয়গুলো দেখার জন্য।’