সুস্থ জীবনের জন্য বেল

l ফয়জুল আল আমীন

 

বেল গাছ বড় ধরনের বৃক্ষ, যার উচ্চতা প্রায় ১০-১৬ মিটার। এর ফুলে মিষ্টি গন্ধ আছে; ফল বড়, গোলাকার ও শক্ত খোসাবিশিষ্ট। কাঁচা ও পাকা বেল সুস্বাদু খাবার। পাকা বেলের জুস তৈরি করে খাওয়া যায়। প্রতি ১০০ গ্রাম বেলের শাঁসে থাকে পানি ৫৪.৯৬-৬১.৫ গ্রাম; প্রোটিন ১.৮-২.৬২ গ্রাম; স্নেহপদার্থ ০.২-০.৩৯ গ্রাম; শর্করা ২৮.১১-৩১.৮ গ্রাম; ক্যারোটিন ৫৫ মিলিগ্রাম; থায়ামিন ০.১৩ মিলিগ্রাম; রিবোফ্লেবিন ১.১৯ মিলিগ্রাম; নিয়াসিন ১.১ মিলিগ্রাম; এসকর্বিক এসিড ৮-৬০ মিলিগ্রাম ও টারটারিক এসিড ২.১১ মিলিগ্রাম। এখানে বেলের পাতা ও ফলের কিছু ভেষজ গুণাগুণ তুলে ধরা হলো—

আলসার সারায় :কচি বেল টুকরা করে কেটে রোদে শুকিয়ে নিলে তাকে ‘বেলশুট’ বলে। যাদের আলসার আছে, তারা বেলশুটের সঙ্গে পরিমাণমতো বার্লি মিশিয়ে রান্না করে নিয়মিত খেলে আলসার দ্রুত সেরে যায়।

দেহের ক্লান্তিতে :গরমের সময় পরিশ্রমের পর বেলের এক গ্লাস শরবত খেলে ১০ মিনিটের মধ্যেই ক্লান্তিভাব দূর হয়।

শিশুর কানব্যথায় :শিশুদের কানের ব্যথা ও ইনফেকশন সারাতে বেলপাতার জুড়ি নেই। বেলপাতা ও তিলের তেল জ্বাল দিয়ে ওই তেল ড্রপার দিয়ে কানে দিলে ব্যথা সেরে যায়।

চোখের রোগে :বেলে থাকা ভিটামিন ‘এ’ চোখের বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ অঙ্গগুলোর পুষ্টি জোগায়। ফলে চোখের বিভিন্ন রোগ থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। এছাড়াও বেলে আছে ভিটামিন ‘সি’, যা গ্রীষ্মকালীন বহু রোগবালাই দূরে রাখে।

কোষ্ঠকাঠিন্যে :বেল পেটের নানা পীড়া সারাতে দারুণ কার্যকর। দীর্ঘমেয়াদী আমাশয়-ডায়রিয়া রোগে কাঁচা বেল নিয়মিত খেলে দ্রুত আরোগ্য লাভ করা যায়। বেলের শাঁস পিচ্ছিল বলে এই ফল পাকস্থলীতে উপকারী পরিবেশ সৃষ্টি করে এবং খাবার সঠিকভাবে হজমে সাহায্য করে। ফলে কোষ্ঠকাঠিন্য দূর হয়। যাদের পাইলস আছে, তাদের জন্য নিয়মিত বেল খাওয়া খুবই উপকারী।

পেট ফাঁপায় :অনেকের পেটব্যথা বা পেটখারাপ থাকে প্রায় সারা বছর। হজমের গোলযোগে পেটের ভেতর গড়গড় করা, ভুটভাট করা ও ফাঁপা সৃষ্টি হয়। যাদের এ ধরনের সমস্যা রয়েছে, তারা কাঁচা বেলের গায়ে আধা ইঞ্চি পুরু করে কাদা মাখিয়ে চুলার কাঠের আগুনে পুড়িয়ে নিয়ে সকাল-বিকাল ৩-৪ চামচ সামান্য গুড় বা চিনি দিয়ে টানা কয়েক দিন খেলে উপকার মিলে। এছাড়াও বেল পেট ঠান্ডা রাখে।

স্মৃতিশক্তি বাড়ায় :শিক্ষার্থীদের স্মৃতিশক্তি বাড়াতে ২/৩টি বেলপাতা ঘিয়ে ভেজে মচমচে করে মিছরির গুঁড়ার সঙ্গে টানা এক সপ্তাহ সকালে খাওয়ালে সুফল মিলবে।

ব্রণ সারায় :বেলে থাকে প্রচুর পরিমাণে ফাইবার বা আঁশ, যা মুখের ব্রণ সারাতে সাহায্য করে।

জন্ডিস সারায় :জন্ডিসের সময় পাকা বেল সামান্য মধু ও গোলমরিচের সঙ্গে শরবত করে খেলে উপকার পাওয়া যায়।

শুক্র তারল্যে :বেলগাছের শিকড় ভালো করে ধুয়ে সামান্য জিরার সঙ্গে বেটে নিয়ে ঘিয়ে মিশিয়ে খেলে শুক্র গাঢ় হয়।

দেহের ওজন কমায় :বেল পাতায় ‘aegeline’ নামক এক প্রকার উপাদান থাকে যা দেহের ওজন কমানোর চিকিত্সায় ব্যবহূত হয়।

সর্দি ও জ্বরজ্বর ভাবে :সর্দি হলে বা গায়ে ব্যথা এবং জ্বরজ্বর ভাব হলে বেলপাতা বেটে রস বের করে এক ফোটা মধুসহ টানা ৩-৪ দিন খেলে ভালো হয়।

গায়ের দুর্গন্ধে :অনেকের শরীর থেকে দুর্গন্ধ বের  হয়। এ জন্য দাম্পত্য কলহ—এমনকি বিবাহ বিচ্ছেদ পর্যন্ত হয়। তাদের পাশে কেউ বসতে পারে না। এক্ষেত্রে বেলপাতা দিয়ে পানি সিদ্ধ করে সেই পানিতে শরীর মুছলে বা সেই পানি দিয়ে গোসল করলে শরীরের দুর্গন্ধ দূরীভূত হয়।

সতর্কতা :বেলপাতা ব্যবহারে খুবই সাবধান থাকতে হয়। কেননা এর অপরিমিত ব্যবহারে উচ্চ রক্তচাপ বেড়ে গিয়ে হার্ট এ্যাটাক ও মানসিক ভারসাম্যহীনতার মতো সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে। ক্ষেত্রবিশেষ লিভারের ক্ষতি হয় বলেও বিভিন্ন গবেষণায় ওঠে এসেছে।