দুর্নীতি, মাদক ও সন্ত্রাস নির্মূলে দলমত ভুলে কাজ করতে হবে

বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের ‘সোনার বাংলা’ গড়ে তুলতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সমুন্নত রেখে দেশ থেকে দুর্নীতি, মাদক, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ নির্মূলে দল-মতের পার্থক্য ভুলে আরো ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। ২০২১ সালের প্রথম সংসদ অধিবেশনের গতকাল সোমবার প্রথম বৈঠকে দেওয়া ভাষণে তিনি এই আহ্বান জানান। এটা চলতি একাদশ সংসদের একাদশ অধিবেশন।

রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘শত প্রতিকূলতার মধ্যেও সুশাসন সুসংহতকরণ, গণতন্ত্রের চর্চা ও উন্নয়ন কর্মসূচিতে সর্বস্তরের জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে সরকার নিরবচ্ছিন্ন প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে। আসুন, দল-মত-পথের পার্থক্য ভুলে ধর্ম-বর্ণ-গোত্রনির্বিশেষে শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে আমরা লাখো শহিদের রক্তের ঋণ পরিশোধ করি।’ জাতীয় সংসদকে দেশের জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার কেন্দ্রবিন্দু উল্লেখ করে তিনি বলেন, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, পরমতসহিষ্ণুতা, মানবাধিকার ও আইনের শাসন সংহতকরণ এবং জাতির অগ্রযাত্রায় সরকারি দলের পাশাপাশি বিরোধী দলকেও গঠনমূলক ভূমিকা পালন করতে হবে। গণতন্ত্রায়ণ, সুশাসন ও নিরবচ্ছিন্ন আর্থসামাজিক উন্নয়নে সব রাজনৈতিক দল, শ্রেণি-পেশানির্বিশেষে ঐকমত্য গড়ে তোলার সম্মিলিত উদ্যোগ গ্রহণ করার জন্য উদাত্ত আহ্বান জানান রাষ্ট্রপতি।

রাষ্ট্রপতি তার ভাষণের সংক্ষিপ্তসার অধিবেশনে পাঠ করেন। বিকাল সাড়ে ৪টায় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে অধিবেশন শুরু হয়। সংসদনেতা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অধিবেশনে উপস্থিত ছিলেন। অধিবেশন শুরুর পর শোক প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়। এরপর চলতি অধিবেশনের জন্য সভাপতিমণ্ডলী মনোনয়ন দেন স্পিকার। প্রতিবার বছরের প্রথম অধিবেশনের শুরুর দিন বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূতসহ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সংসদে আমন্ত্রণ জানানো হয়। তবে করোনা ভাইরাস মহামারির কারণে এবার তা করা হয়নি।

বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে সংসদের ‘উত্তর প্লাজা’ দিয়ে সংসদ ভবনে প্রবেশ করেন রাষ্ট্রপতি। স্পিকার রাষ্ট্রপতির আগমনের ঘোষণা দিলে সশস্ত্র বাহিনীর একটি বাদক দল বিউগলে ‘ফ্যানফেয়ার’ বাজিয়ে রাষ্ট্রপতিকে সম্ভাষণ জানায়। সংসদকক্ষে রাষ্ট্রপতির প্রবেশের পর নিয়ম অনুযায়ী জাতীয় সংগীত বাজানো হয়। পরে স্পিকারের ডান পাশে রাখা লাল রঙের গদিওয়ালা চেয়ারে বসেন রাষ্ট্রপতি। ১৪৭ পৃষ্ঠার মূল ভাষণের সংক্ষিপ্তসারে রাষ্ট্রপতি অর্থনীতি, বাণিজ্য-বিনিয়োগ, খাদ্য-কৃষি, পরিবেশ-জলবায়ু, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন খাতে সরকারের কার্যক্রম ও সাফল্য তুলে ধরেন। বিকাল ৫টার দিকে রাষ্ট্রপতি তার ভাষণ শুরু করেন। 

আবদুল হামিদ বলেন, ‘শান্তি, গণতন্ত্র, উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির যে পথে আমরা হাঁটছি, সে পথেই আমাদের আরো এগিয়ে যেতে হবে। এ বছর মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে আমরা স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালন করব। তবে আমাদের লক্ষ্য ২০৪১ সালে বিশ্বসভায় একটি উন্নত-সমৃদ্ধ দেশের মর্যাদায় অভিষিক্ত হওয়া। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে জনগণের সর্বাত্মক অংশগ্রহণের মাধ্যমে আমরা একটি কল্যাণমূলক, উন্নত-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠনে সক্ষম হব।’

রাষ্ট্রপতি বলেন, সরকার সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণে সব ক্ষেত্রেই অভূতপূর্ব অগ্রগতি অর্জন করেছে। সম্প্রতি সরকারের সবচেয়ে বড় অর্জন হলো সাফল্যের সঙ্গে কোভিড-১৯ নিয়ন্ত্রণ। পরিস্থিতি মোকাবিলায় জরুরি ভিত্তিতে ২ হাজার চিকিত্সক ও ৫ হাজার ৫৪ জন নার্স নিয়োগ, কোভিড ডেডিকেটেড হাসপাতালগুলোতে ১০ হাজার ৫২৫টি সাধারণ বেড, ৬৬৬টি আইসিইউ, ৭৩টি ডায়ালাইসিস বেড, ৫৫৪টি ভেন্টিলেটর, ১৩ হাজার ৫১৬টি অক্সিজেন সিলিন্ডার, ৬৭৮টি হাইফ্লো নেইজল ক্যানুলা এবং ৬৩৯টি অক্সিজেন কনসেনট্রেটরের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ৩ কোটি ডোজ টিকা কেনার প্রক্রিয়া চূড়ান্ত হওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমি আশা করছি সরকার খুব শিগিগর দেশের জনগণকে কোভিড-১৯-এর টিকা প্রদান করতে পারবে।’

আর্থিক খাত ব্যবস্থাপনায় সরকারের প্রশংসা করে আবদুল হামিদ বলেন, বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিক অর্জন বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত হয়েছে। করোনা ভাইরাস মহামারিতে ২০১৯-২০ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি কিছুটা হ্রাস পেয়ে দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ২৪ শতাংশে। তবে একই সময়ে মাথাপিছু জাতীয় আয় ৮ দশমিক ১২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৬৪ মার্কিন ডলারে। জিডিপি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখার পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি সহনীয় পর্যায়ে রাখা সম্ভব হয়েছে। আইএমএফের প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০২০ সালে সবচেয়ে বেশি জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করা শীর্ষ দেশসমূহের মধ্যে বাংলাদেশ তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে।

রাষ্ট্রপতি আরো বলেন, দুর্নীতি, মাদক ও সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে সরকার জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করছে। এ লক্ষ্যে ১৮টি সংশ্লিষ্ট আইন প্রণয়ন ও সময়োপযোগী করা হয়েছে। পুলিশ, অ্যাম্বুলেন্স ও ফায়ার সার্ভিসের সহায়তা পাওয়ার জন্য জাতীয় জরুরি সেবাসহ (৯৯৯) অনলাইন জিডি, নারী, শিশু ও প্রতিবন্ধীদের জন্য সব থানায় পৃথক ব্যবস্থা এবং বিভিন্ন অ্যাপসের মাধ্যমে পুলিশের সেবা দেওয়ার মানোন্নয়ন করা হয়েছে। রাষ্ট্রপতি আরো বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ নেতৃত্বে নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা বহুমুখী সেতুর দুই প্রান্তের মাওয়া ও জাজিরা সংযোগকারী সর্বশেষ ৪১তম স্প্যান স্থাপন করার মাধ্যমে সেতুর ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার মূল অবকাঠামো দৃশ্যমান হয়েছে। পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজ ২০২২ সালের জুলাই নাগাদ শেষ হবে। 

সভাপতিমণ্ডলী মনোনয়ন

অধিবেশনের শুরুতে স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী চলতি অধিবেশনের জন্য সভাপতিমণ্ডলী মনোনয়ন দেন। এবার অধিবেশনে সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য হয়েছেন নজরুল ইসলাম, আফতাব উদ্দিন সরকার, আব্দুস সালাম মুর্দেশী, আনিসুল ইসলাম মাহমুদ ও মমতাজ বেগম। স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের অনুপস্থিতিতে সভাপতিমণ্ডলীর সদস্যদের মধ্যে অগ্রবর্তীজন অধিবেশনে সভাপতিত্ব করবেন।

শোকপ্রস্তাব

সভাপতিমণ্ডলী মনোনয়নের পর স্পিকার শোকপ্রস্তাব উত্থাপন করেন। সাবেক ডেপুটি স্পিকার শওকত আলী, সাবেক মন্ত্রী চৌধুরী কামাল ইবনে ইউসুফ, সাবেক সংসদ সদস্য আ খ ম জাহাঙ্গীর  হোসাইন, খালেদুর রহমান টিটো, শাহ-ই-জাহান চৌধুরী, মোহাম্মদ আলী, মোহাম্মদ আবু হেনা, এম এ হাসেম, আনোয়ার হোসেন হাওলাদার, দেলোয়ার হোসেন খান, সামসুদ্দীন আহমেদ, নুরজাহান ইয়াসমিন ও খালেদা পান্নার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করা হয়। এছাড়া সংসদ সচিবালয়ের কর্মচারী কোরবান আলীর মৃত্যুতেও শোক জানায় সংসদ।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চাচি শেখ রাজিয়া নাসের ও জা রওশন আরা ওয়াহেদ, এমপি হাজি সেলিমের স্ত্রী গুলশান আরা, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা আয়শা খানম, কথাসাহিত্যিক রাবেয়া খাতুন, ভাষাসৈনিক জাহিদ হোসেন মুসা মিয়া, কবি মনজুরে মাওলা, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার সমন্বয়ক আবদুল হান্নান খান, অভিনেতা আলী যাকের, সংগীতজ্ঞ ওস্তাদ শাহাদাত্ হোসেন খান, বীর উত্তম ক্যাপ্টেন আকরাম আহমেদ, অভিনেতা আব্দুল কাদের, সাংবাদিক মিজানুর রহমান খান, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ইয়াফেস ওসমানের স্ত্রী বুলা আহাম্মেদ, অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের মৃত্যুতেও সংসদ শোক প্রকাশ করে। করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে দেশ-বিদেশে যারা মারা গেছেন, তাদের সবার মৃত্যুতেও শোক জানায় সংসদ।