স্বাধীনতা মানে কি দুমুঠো খেতে পাওয়া?

স্বাধীনতা চার-পাঁচ বর্ণের এক শব্দ। মানবিক চাহিদার এক অনন্য নাম। বাংলা ব্যাকরণের পদের পরিচয়ে বিশেষ্য পদ। এর শাব্দিক অর্থ পরাধীনতার বিপরীত হলেও ভাবগত অর্থে ঢের তাত্পর্য বহন করে। সময়ের আবর্তনে ও প্রেক্ষাপটের বিচারে এর ডেফিনেশন প্রায়শই পরিবর্তন হয়। কারো কাছে ৭১-পরবর্তী সময়টাই স্বাধীনতার মানে, কেউবা নিজ মতের রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় থাকলেই স্বাধীনতা খুঁজে পায়, কেউবা বিত্তশালী হতে পারলে হয়তো স্বাধীনতা খুঁজে পাবে বলে বিশ্বাস করে, অনেকে শত ব্যস্ততা ছেড়ে দুদণ্ড পরিবার-পরিজনকে পাশে পাওয়াকেও স্বাধীনতা মনে করে?

আমি তো মাঝেমধ্যে ক্লাস-পরীক্ষা-অ্যাসাইনমেন্ট শেষ হলেও স্বাধীনতার স্বাদ খুঁজে পাই। আবার চারদিকের অবিচার-অপকর্মের মধ্যে পরাধীনতার গন্ধ শুঁকতে শুঁকতে অনীহা সরষে স্বাধীনতা শব্দকেও বর্জন করতে চাই? একের পর এক ধর্ষণের পর যখন সন্তানহারা বাবার আর্তনাদ শুনতে পাই বিচারের জন্য, তখন স্বাধীনতাকে ভূলুণ্ঠিত মনে হয়। নিরাপত্তার জন্য যাদের কাছে যাওয়া হয়, সেই রক্ষক যখন বক্ষক হয় তখন স্বাধীনতার মানে আসলেই কী—আবার জানতে ইচ্ছে হয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের রন্ধ্রে রন্ধ্রে যখন দুর্নীতি দেখতে পাই, আমার পরবর্তী প্রজন্মকে স্বাধীনতার ব্যাখ্যা কী দেব—এই ভাবনায় চেতনাহীন হই। এবার চিন্তা করলাম নিজে নিজে স্বাধীনতার মানে না ভেবে একটু বাহিরে গিয়ে দেখি, ভাবলাম মানবিক প্রয়োজন, ক্ষুধা ও তাড়না নিয়ে যারা নিত্য সংগ্রাম করে বেঁচে আছে তাদের স্বাধীনতার স্বরূপ একটু খুঁজে দেখি। নয়তো রবি ঠাকুরের ঐ চরণখানাই না আবার প্রতিফলিত হয় : ‘বাঙালী মোরা ভদ্র অতি পোষমানা এ প্রাণ/ বোতাম আঁটা জামার নীচে শান্তিতে শয়ান।/ ইহার চেয়ে হতেম যদি আরব বেদুইন/ চরণ তলে বিশাল মরু দিগন্তে বিলীন’।

রাজধানী আমার বেড়ে ওঠার জায়গায় হলেও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার কল্যাণে বরিশালে বর্তমান আবাসস্থল। এখানকার বেশির ভাগ মানুষ-ই কমবেশি সংগ্রাম করে টিকে থাকে, তন্মধ্যেও কিছু মানুষ থাকে জগেশ্রষ্ঠ। উদাহরণ স্বরূপ ধরতে পারেন—যুদ্ধের ময়দানে অনেকেই সংগ্রাম করে কিন্তু বেলা শেষে গুটিকয়েক জনের গলায় বীরশ্রেষ্ঠর মালা জোটে, কারণ তাদের সর্বস্বই তো ঐ ময়দানে দিয়ে এসেছে। তাদের একটা বড় অংশের দেখা মেলে লঞ্চ টার্মিনাল, বেলস পার্ক, মুক্তিযোদ্ধা পার্ক ও পোর্ট রোডের আশপাশে। এবার গিয়ে দেখা হলো মোতালেব চাচার (৬৭) সঙ্গে। পেশায় পান-সিগারেট বিক্রেতা। হেঁটে হেঁটে ফেরি করেন। তার কাছে স্বাধীনতার মানে :‘রাইতে যহন ঘুমাইতে যাই একটা কথাই মাথায় আহে, কী করলাম সারাজীবন!! ৬৭ বছর!! একেবারে কম সময় না। কিন্তু মনে হয় এইতো কয়দিন আগের কথা। ঘুড়ি উড়াইন্না, বিলের ভিতর দিয়া ছোট নৌকা নিয়া পাল্লা—তাও সেদিনের কথা-ই তো...।

বিয়ের সময় বয়স ছিল কম। প্রথমদিকে আব্বায় খরচ চালাইত আমি যা পারতাম করতাম। পরে সব চাপ যখন মাথায় পড়ল তখন আর ডাইনে-বামে তাকানোর সুযোগ পাই নাই। যখন যা পারতাম তাই করতাম। পরিশ্রম তো অনেক করছি, জমা হয় নাই কিছুই। তখন যদি একটু বুঝ মাথায় থাকত!!! শেষ বয়সটা অন্যরকম হইলেও পারত! জীবনে কারো ভরসা করা খুব খারাপ কাম। পোলাপান, আত্মীয়স্বজন, বন্ধু—টাকার কাছে সব ছোট। তখনকার এই বুঝটা ছিল না। বুঝছি যখন, তখন আর শক্তি নাই। এহন পোলাপান দুইডারে ঠিকঠাক মতো পার কইরা দিতারলেই মুক্তি।

নিজের অজান্তেই আঁখি ছলছল করে ওঠে। শীতে আমার একটা মাত্র হুডি বলে মাঝেমধ্যে বিষণ্ন হতাম, ওর কথা আর মুখভরা হাসি দেখে নিজের মধ্যে মোটিভেশন সঞ্চার হলো। কাপড় দিলে নিবে কি না—জিজ্ঞেস করেছি, খুশিতে হয়তো কিছু বলার শব্দ পায় নাই। কাপড়ের সঙ্গে আসার সময় হাজির বিরিয়ানির প্যাকেটখানা দেওয়ার পর যে উচ্ছ্বাস ঐ চোখ জোড়ায় দেখেছি তাতে মনে হয়েছে—স্বাধীনতা মানে দুটুকরো কাপড় আর দুমুঠো খেতে পাওয়া।

* শিক্ষার্থী :রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়।