প্রাণিজগত্ বিড়াল

 

পৃথিবীর আদিমতম প্রাণীদের মধ্যে বিড়াল অন্যতম। জানা যায়, প্রায় এক লাখ বছর আগে থেকে মধ্যপ্রাচ্যের বিস্তৃত অংশ নিয়ে আফ্রিকার আটলান্টিক উপকূল পর্যন্ত বিড়ালের বিচরণ ছিল। তখন ওরা ছিল বন্যবিড়াল প্রজাতির প্রাণী। জিনগত পরিবর্তনে আট হাজার খ্রিস্টপূর্বাব্দের মধ্যে বন্যবিড়াল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গার্হস্থ্য বিড়াল হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ হতে থাকে। সাড়ে সাত হাজার খ্রিস্টপূর্বাব্দে প্রাচীন মিশরে বিড়াল পূজার নির্দশন পাওয়া যায়। নব্য প্রস্তরযুগে বিড়াল গৃহপালিত প্রাণী হিসাবে পরিচিতি পেতে থাকে। সাড়ে পাঁচ হাজার খ্রিস্টপূর্বাব্দে চীনে বিভিন্ন প্রজাতির বির্বতন হয়ে পুরোপুরি স্বাধীন গৃহপালিত বিড়ালে পরিণত হওয়ার হদিস পাওয়া যায়। প্রজাতি ভেদে গৃহপালিত ও বন্যবিড়াল মিলে ৭৩ জাতের বিড়ালের খোঁজ মিলেছে। ইন্টারন্যাশনাল ক্যাট অ্যাসেসিয়েশনের হিসাবে বিড়ালের প্রজাতি ৫৮, এই প্রজাতি ভাগাভাগিতে লোমের বিষয়টি গণ্য করা হয়নি। ছোট-বড় লোমস বিড়ালের আলাদা জাত নেই। জনপ্রিয়তার শীর্ষে আছে পার্সিয়ান প্রজাতির বিড়াল। বাংলাদেশেও বিচিত্র রঙের নকশাধার অত্যধিক লোমবিশিষ্ট এই পার্সিয়ান বিড়ালের জনপ্রিয়তা। ১৬০০ শতকের দিকে ভ্রমণকারীদের মাধ্যমে এই বিড়ালপ্রজাতি ইউরোপ, আমেরিকা, ব্রিটেন, ফ্রান্স ঘুরে বাংলাদেশে আসে। সমতল মুখায়বরের গোলাকার মুখমণ্ডলে হূষ্টপুষ্ট খাটো, শান্ত স্বভাবের এই প্রজাতি শৌখিন বিড়ালপ্রেমীদের প্রিয়। হালকা ছাই, ধূসর, সোনালি, রুপালি, বাদামি, সাদা-কালো, কমলা রঙে ডোরাকাটা নকশার কারণে খুব সহজেই আকর্ষণ জাগে।

ক্যাট ফ্যান্সিস অ্যাসোসিয়েশনের জরিপে সারা পৃথিবীতে গৃহপালিত বিড়ালের সংখ্যা ৫০০ মিলিয়ন। বিড়ালপ্রেমী ও গবেষকগণ বিড়ালের প্রতি মানুষের দুনির্বার আকর্ষণ অনুভবের নানা সুখকর কারণ উদ্ভাবন করেছেন। ঘরের নিরাপত্তা, সুরক্ষা এমনকি স্বাস্থ্যক্ষেত্রেও বিড়াল নিরাপদ। জীবনের দুই-তৃতীয়াংশ সময় ঘুমিয়ে পার করা এই প্রাণীর মিউমিউ ধ্বনি বিশ্বের সবচেয়ে আনন্দধ্বনিগুলির মধ্যে একটি। এই ধ্বনি মানুষের অস্থিসন্ধি ও মাংশপেশির চিকিত্সায় থেরাপি হিসাবে কাজ করে। বিড়াল অন্ধকারে পরিষ্কার দেখতে পায়। ঘুটঘুটে আঁধারেও সাধারণ মানুষের চেয়ে ১৩গুণ বেশি। শব্দহীন হাঁটাচলা করতে পারে। যাঁরা বিড়াল পোষেন তাঁদের ঘুম ভালো হয়। বিড়ালের সঙ্গে সময় কাটালে মানুষের শরীরের আরামদায়ক রাসায়নিক পদার্থ নিঃসরণ বাড়ে; ফল মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ, দুশ্চিন্তামুক্ত রাগ-উদ্বেগহীন প্রশান্তির জীবন।

গৃহপালিত অন্যসব প্রাণীর চেয়ে বিড়াল অনেক বেশি পরিবেশ উপকারী। যন্ত্রণা উপশমদায়ক। বিশেষ করে ইঁদুর অতিষ্ঠতার ক্ষেত্রে। যাঁদের অতিপ্রাকৃতিক অপশক্তিতে বিশ্বাস, বিড়াল তাঁদের উদ্ধারকর্তা। প্রকৃত বন্ধু। যাঁদের অখণ্ড অবসর, বিড়াল হতে পারে তাঁদের সঙ্গী, আনন্দ-প্রশান্তির অপার অনুষঙ্গ। হূদরোগের ঝুঁকিও নাকি কমে, মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণে আনার ফলে শতাংশের হিসাবে তা ৩০ শতাংশ পর্যন্ত!

খন রঞ্জন রায়