বাইডেনের শপথ আজ

যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বয়স্ক প্রেসিডেন্ট হিসেবে আজ শপথ নিচ্ছেন জো বাইডেন। তার পুরো নাম জোসেফ রবিনেট বাইডেন জুনিয়র। ৭৮ বছর বয়সি বাইডেন যুক্তরাষ্ট্রের ৪৬তম প্রেসিডেন্ট হচ্ছেন। মার্কিন ইতিহাসে তিনি সবচেয়ে বেশি পপুলার ভোট পেয়েছেন। তার সঙ্গে শপথ নেবেন নির্বাচিত ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিসও। প্রতি বছরের চেয়ে এবারের শপথ অনুষ্ঠান ব্যতিক্রম। করোনা মহামারি ও নিরাপত্তার কারণে এবারের অনুষ্ঠানে ওয়াশিংটন ডিসি ভূতুড়ে নগরীতে পরিণত হয়েছে। সেনাবেষ্টনীর মধ্যেই শপথ নিতে হচ্ছে বাইডেন ও হ্যারিসকে। তবে অনুষ্ঠানে নামিদামি সব তারকার উপস্থিতি ঘটবে। এদিকে পেন্টাগনের প্রধান নাশকতামূলক হামলার শঙ্কা উড়িয়ে দিয়েছেন। যদিও বাইডেনের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন মেয়ে অ্যাশলে। যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে ১১টায় (বাংলাদেশ সময়, রাত সাড়ে ১০টায়) অভিষেক অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার কথা। খবর সিএনএন, ডেইলি মেইল ও বিবিসির

নিরাপত্তার কারণে ভূতুড়ে নগরী ওয়াশিংটন

সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার শপথ অনুষ্ঠানে ২০ লাখের বেশি মানুষের সমাগম ঘটেছিল। আমন্ত্রিত অতিথি ছাড়াও দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে মানুষ ওয়াশিংটন ডিসিতে আসত অভিষেক অনুষ্ঠান দেখতে। কিন্তু এবার করোনার কারণে আগে থেকেই সাধারণ মানুষকে অনুষ্ঠানে না আসার অনুরোধ করা হয়েছে। এরপর গত ৬ জানুয়ারি ক্যাপিটল হিলে হামলার পর নিরাপত্তাব্যবস্থা আরো জোরদার করা হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের শপথ অনুষ্ঠানে যেখানে ১০ হাজার ন্যাশনাল গার্ড মোতায়েন ছিল, এবার সেখানে ২৫ হাজার ন্যাশনাল গার্ড। ১৮৬৫ সালে মার্কিন গৃহযুদ্ধের পর ন্যাশনাল গার্ডের এত বেশি সদস্য রাজধানীতে জড়ো করা হয়নি। গোয়েন্দা সংস্থাগুলো অভিষেক অনুষ্ঠানের নিরাপত্তা জোরদারে  জোরদার করা হয়েছে নিরাপত্তা।

নিরাপত্তা ব্যবস্থা দেখভাল করছে প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা সিক্রেট সার্ভিস। রবিবার হোয়াইট হাউজের কাছ দিয়ে হেঁটে যাওয়া ডানা ও’ কনোর বলেন, সৈন্য ছাড়া ওয়াশিংটন ডিসি যেন এক ভূতুড়ে নগরীতে পরিণত হয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শী এবং সাংবাদিকরা বলছেন, এমনকি ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর সন্ত্রাসী হামলার পরও ওয়াশিংটনে এমন চেহারা দেখা যায়নি। ৯/১১তে ওয়াশিংটনের আকাশে যুদ্ধবিমান ছিল কিন্তু মাটিতে এতো সৈন্য ছিল না।

নিরাপত্তাব্যবস্থায় কেবল সরকার নজর দিয়েছে তা নয়, বিভিন্ন বিমান সংস্থা, রেলওয়ে, বাসও নিজস্ব পদ্ধতিতে নিরাপত্তা জোরদার করেছে। কয়েকটি বিমান সংস্থা ইতিমধ্যে সতর্ক করেছে যে, কারো লাগেজে বন্দুক থাকতে পারবে না। রেলওয়েও একই সতর্কতা জারি করেছে। বাইডেন ডেলাওয়ার রাজ্যের তার বাসা থেকে ট্রেনে আসতে চেয়েছিলেন, কিন্তু নিরাপত্তার কারণে সেই পরিকল্পনা বাতিল করা হয়েছে। ওয়াশিংটনের মেয়র মুরিয়েল বাউজার রবিবার বলেন, ক্যাপিটল হিলে হামলার পর নিরাপত্তাব্যবস্থা কঠোর করা ছাড়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আর কোনো উপায় নেই। কারণ তথাকথিত দেশপ্রেমিকেরা সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে পুলিশের ওপরও হামলা করেছিল। তিনি এনবিসি নিউজকে বলেন, ‘আমরা বেড়া দেখতে চাই না, রাস্তায় সশস্ত্র সৈন্যও দেখতে চাই না।’ কিন্তু এর বাইরে কিছু করারও নেই। এবারের শপথ উপলক্ষ্যে ওয়াশিংটন ডিসির ব্যবসা-বাণিজ্যেও ধস নামছে। স্থানীয় সময় দুপুর ১২টার দিকে প্রথমে কমলা হ্যারিস এবং পরে জো বাইডেন শপথ নেবেন। এরপর বিকেলে বাইডেন হোয়াইট হাউজে যাবেন। অনুষ্ঠানে জাতীয় সংগীত পরিবেশন করবেন তারকা লেডি গাগা। এছাড়া জনপ্রিয় তারকা জাস্টিন টিম বারলেক, জেনিফার লোপেজ, গার্থ ব্রুকস, ডেমি লোভাটো, অ্যান্ট ক্লিমনস, জন বন জোভি, জন লিজেন্ডসহ অনেকে অংশ নেবেন।

অভিষেক অনুষ্ঠানে হাজিরের সুযোগ দিতে এর আগে দুই লাখের মতো টিকেট দেওয়া হতো। কিন্তু এবার মাত্র এক হাজার টিকেট দেওয়া হবে। নেতাকর্মী, সর্মথক ও কর্মকর্তাসহ মাত্র তিন হাজার মানুষকে শপথ অনুষ্ঠানে প্রবেশের সুযোগ দেওয়া হবে। ন্যাশনাল মলে এক লাখ ৯১ হাজার ৫০০ পতাকা লাগানো হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ৫০টি অঙ্গরাজ্য, ডিসি, ও পাঁচটি অঞ্চলের প্রতীক হিসেবে মলের ৫৬টি পিলার আলোকসজ্জিত করা হয়েছে। করোনায় মারা যাওয়া চার লাখ আমেরিকানকে শ্রদ্ধা জানাতে লিংকন মেমোরিয়ালের আশেপাশে ৪০০ বাতি জ্বালানো হবে। এর বাইরে বর্নিল রঙে সাজানো হয়েছে এম্পায়ার স্টেট বিল্ডিং, সিয়াটলের স্পেস নিডল।

সম্ভাব্য নাশকতার তথ্য নেই

গত সোমবার বিভিন্ন মিডিয়ায় মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগনের কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হয় যে, অভিষেক অনুষ্ঠানে অন্তর্ঘাতমূলক হামলার ঘটনা ঘটতে পারে। অর্থাত্, সরকারি বাহিনীরই কেউ হামলা চালাতে পারে। অস্থায়ী প্রতিরক্ষামন্ত্রী ক্রিস্টোফার মিলার সোমবার এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, জো বাইডেনের অভিষেক ঘিরে সম্ভাব্য নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যাপিটল হিলের সুরক্ষায় সহায়তা করতে ২৫ হাজারেরও বেশি ন্যাশনাল গার্ড সেনা মোতায়েন করা হয়েছে এবং তাদের প্রত্যেকের অতীত জীবন পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে। আর এ কাজে এফবিআই সামরিক বাহিনীকে সহায়তা করছে। তিনি বলেন, যদিও আমাদের কাছে অভ্যন্তরীণ হুমকির কোনো গোয়েন্দা তথ্য নেই, তার পরও বড় ধরনের নিরাপত্তা ইভেন্টের ক্ষেত্রে এই পরীক্ষা স্বাভাবিক, রাজধানীকে সুরক্ষিত করতে ‘কোনো পাথরই উলটে দেখতে’ বাকি রাখছি না আমরা। যদিও বাইডেনের মেয়ে অ্যাশলে বাইডেন এক সাক্ষাত্কারে বাবার নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এমনকি তিনি মেলানিয়া ট্রাম্পেরও সমালোচনা করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, মেলানিয়া প্রটোকল রক্ষা করছেন না। রীতি অনুযায়ী, পরবর্তী ফার্স্ট লেডির কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করতে হয়। কিন্তু সেই রীতিটুকুও মানছেন না মেলানিয়া ট্রাম্প।

কেন সেনাবাহিনীকে নিয়েই এই সন্দেহ-উদ্বেগ?

ক্যাপিটলে হামলা এবং ভাংচুরে সেনাবাহিনীতে কর্মরত এবং অবসরপ্রাপ্ত বেশ কজন সদস্যের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের প্রমাণ পাওয়া গেছে। ভিডিও ফুটেজ দেখে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হামলায় জড়িত অনেকের সামরিক প্রশিক্ষণ ছিল। তাদের মধ্যে যে পূর্ব-পরিকল্পনা এবং সমন্বয় ছিল তারও ইঙ্গিত রয়েছে। হামলায় ন্যাশনাল গার্ডের অন্তত দুজন সদস্যের সংশ্লিষ্টতা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া গেছে। নৌ বাহিনীর সাবেক এক সদস্যের সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত হয়েছে। মার্কিন টিভি নেটওয়ার্ক সিবিএস খবর দিয়েছে, নর্থ ক্যারোলিনার পোর্ট ব্রাগ থকে কতজন সৈনিক ক্যাপ্টেন রেইনির সঙ্গে ওয়াশিংটনে গিয়েছিলেন সেনাবাহিনী তা তদন্ত করছে। ওয়াশিংটন পোস্ট পত্রিকার সাম্প্রতিক এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, উগ্রবাদী তত্পরতা নিয়ে ২০২০ সালে এফবিআই যে ১৪৩টি তদন্ত করেছে তার ৬০টির সঙ্গে বর্তমানে কর্মরত এবং সাবেক সেনা সদস্যের সংশ্লিষ্টতা ছিল।