মসলিন আমাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে জড়িত। এটি এক বিশেষ ধরনের সূক্ষ্ম সুতা দিয়ে তৈরি কাপড়। ফুটি কার্পাস নামের বিশেষ তুলা থেকে অতি চিকন সুতা তৈরি করে চরকা দিয়ে কেটে হাতে বোনা বিশেষ শৈল্পিক দক্ষতায় তৈরি হতো ঢাকাই মসলিন। মসলিনের সুখ্যাতি সারা বিশ্বে ছড়িয়ে গিয়েছিল। এই বিখ্যাত কাপড় ইংরেজ শাসনামল শুরুর কয়েক দশকের মধ্যেই বিলুপ্ত হয়। ইংরেজরা মসলিন কাপড়ের ওপর মাত্রাতিরিক্ত কর বসিয়ে দেশিয়ো শিল্পকে ধ্বংস করে। তাদের দেশের কাপড়ের প্রাধান্য দেওয়ার কারণে এ শিল্পের শিল্পীরা কাজ ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। ‘মসলিন’ শব্দটি এসেছে ইরাকের এক বিখ্যাত নগরী মসুল থেকে। মসুল নগরীতে এমন সূক্ষ্ম কাপড় তৈরি বলে ঐ শহরের নামানুসারে ঢাকার এই কাপড়ের নাম হয় ‘মসলিন’।
ঢাকাইয়া মসলিন কাপড় তৈরি হতো বর্তমান নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁওয়ে অবস্থিত পানাম নগরের গ্রামগুলোতে। মসলিন কাপড় বুননের দক্ষ কারিগররা এই কাপড়কে ঘিরেই তত্কালীন বৃহত্ ব্যবসায়িক কেন্দ্র পানাম নগর গড়ে তোলেন। এই কাপড়ের অন্যতম প্রধান পৃষ্ঠপোষক ও ব্যবহারকারী ছিলেন মুঘল শাসকরা। কথিত আছে, একটি ছোট আংটির ভেতর দিয়ে মসলিন পুরো একটি কাপড় চলে যেত। ১৮৫১ সালে বিলেতে প্রদশির্ত অর্ধ টুকরো (১০গজ*০১গজ) মসলিন কাপড়ের ওজন মাত্র ৮ তোলা ছিল। ঢাকার জাতীয় জাদুঘরে রক্ষিত মসলিন কাপড়ের ওজন ৭ তোলা। সুতার ওপর নির্ভর করে মূলত কাপড়ের মান নির্ধারণ হতো। যে সুতা যত সূক্ষ্ম সে সুতার তৈরি কাপড়ও তত মিহি আর কদরও বেশি। মিশরীয় প্রাচীন সভ্যতার মমিগুলোর গায়ে মসলিন কাপড় পাওয়া গেছে। এমনকি রোমান নারীরাও মসলিন কাপড় খুব পছন্দ করতেন বলে জানা যায়।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ২০১৪ সালে ঘোষণা করেন—যে ভাবেই হোক মসলিন কাপড় ফিরিয়ে আনতে হবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ঐ ঘোষণা অনুযায়ী প্রায় ১৭০ বছর পর ২০২০ সালে ঐতিহাসিক ঢাকাইয়া মসলিন শাড়ি তৈরি হয়। এক একটি শাড়ির উত্পাদন মূল্য প্রায় ৩ লাখ ৬০ হাজার টাকা পড়ে। তবে গবেষকরা বলেছেন, শাড়ির উত্পাদন মূল্য আস্তে আস্তে কমিয়ে সাধারণ মানুষের সাধ্যের মধ্যে নিয়ে আসা সম্ভব। ২০২০ সালের ২৮ ডিসেম্বর ঢাকাই মসলিনকে জিআইপি পণ্য ভৌগোলিক নির্দেশক স্বত্বের অনুমোদন দেওয়া হয়।
আল-আমিন হক