২০০৭ সালের কথা। আমরা সবে দ্বিতীয় বর্ষে উঠেছি। বন্ধু মিজান একদিন বলল, কাল থেকে থমাস হার্ডির উপন্যাস ‘টেস অব দ্য ডা’রবারভাইলস্’ পড়ানো শুরু হবে। আমি বললাম, কে পড়াবেন? ও বলল, প্রফেসর কাশীনাথ রায় (সংক্ষেপে কেএনআর)। তখনো স্যারের সম্পর্কে কিছুই জানতাম না। ফলে একজন অজানা, অচেনা শিক্ষকের পাঠদান সম্পর্কে জানার আগ্রহ নিয়েই তাঁর ক্লাসে গেলাম। দেখলাম, সাদা পাঞ্জাবি-পায়জামা পরিহিত, দেখামাত্র শ্রদ্ধা আসে—এমন একজন মানুষ আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে, চোখেমুখে কেমন যেন একটা আত্মবিশ্বাসের ছাপ, চশমার কাচের ওপারে চোখজোড়া যেন আমাদের চুম্বকের মতো কাছে টানছিল! তাঁর উচ্চারিত একেকটা ইংরেজি শব্দ মগজে বিঁধে যাচ্ছিল। তিনি যেন সমুদ্র মন্থন করে এসে আমাদের ক্লাস নিচ্ছিলেন। হার্ডির টেস যেন তাঁর হাতের তালুতে বন্দি। তাঁর কথার জাদুতে সকলে মজে গিয়েছিলাম। একে একে হার্ডির উপন্যাসের চরিত্রগুলোর সঙ্গে তিনি আমাদের পরিচয় করিয়ে দিলেন। তাঁর বর্ণনা শুনে উপন্যাসে বর্ণিত জায়গাগুলো চোখের সামনে ভেসে উঠল। ঐ দিন লেকচার শেষে তিনি বেরুনোমাত্রই গোটা ক্লাস তাঁর বাচনভঙ্গির প্রশংসায় ছিল মুখর। পরে এ উপন্যাস নিয়ে স্যারের নেওয়া প্রতিটি ক্লাসই আমরা নিবিষ্টচিত্তে করেছিলাম। এভাবেই একজন জাত শিক্ষকের সঙ্গে আমাদের তীব্র বন্ধন তৈরি হলো।
এখানে বলে রাখি, ছাত্রাবস্থায় হার্ডিকে নিয়ে আমার বিশেষ কোনো আগ্রহ ছিল না, এখনো খুব একটা নেই। একবার প্রিয় লেখক ভি. এস. নাইপল বলেছিলেন, হার্ডির মতো একঘেয়ে ঔপন্যাসিককে পড়ে তিনি তাঁর যৌবনের গুরুত্বপূর্ণ সময় নষ্ট করেছেন। হার্ডির লেখা পড়ে আমিও কিছুটা ক্লান্ত বোধ করতাম। এ কথাটি বলার জন্য হার্ডি-ভক্তদের কাছে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। তবে এটি বলতেই হবে যে, কাশীনাথ স্যার টেস-এর বিষয়-আশয়কে এতটাই সাবলীলভাবে উপস্থাপন করেছিলেন যে হার্ডির টেস চরিত্রটার প্রতি একধরনের মায়া তৈরি হলো, সেইসঙ্গে হার্ডির প্রতি জন্মানো বিতৃষ্ণাটাও উবে গেল। তবে এটা এখনো বিশ্বাস করি, হার্ডির যেকোনো রচনার বর্ণনার ধরন কিছুটা একঘেয়ে, এবং খানিক বিরক্তিকরও, তবে তাঁর বিষয় বিবেচনাকে খাটো করে দেখার যত্সামান্য সাহস অন্তত আমার নেই। বলতে দ্বিধা নেই, হার্ডির জন্য আমার সামান্য যে ভালোবাসা জন্মেছে তার বেশিরভাগই তৈরি করে দিয়েছিলেন অধ্যাপক কাশীনাথ রায়।
এ মুহূর্তে মনে পড়ছে, একটি নাটকও কাশীনাথ স্যার আমাদের পড়িয়েছিলেন। জে. এম. সিনেজর লেখা ‘দ্য প্লেবয় অব দ্য ওয়েস্টার্ন ওয়ার্ল্ড’। আইরিশ নাট্যকারের এই নাটকটি আমাদের অনেকেরই প্রিয় ছিল, আমার তো খুবই প্রিয়। বর্তমানে শিক্ষকতায় আছি বিধায় এ নাটকটি প্রায়ই পড়াতে হয়। যতবার ক্লাসে এ নাটকটি পড়াতে যাই—মনে পড়ে যায় কাশীনাথ স্যারের কথা। এ নাটক পড়ানোর সময় তাঁর সেন্স অব হিউমার আমাদের দারুণ আকৃষ্ট করেছিল। আমরা অনেকেই ক্লাস শেষে বের হয়ে স্যারের কথাগুলো নিজেরা বলাবলি করতাম। আজও ভুলতে পারি না, পিগিন ও ক্রিস্টি ম্যাহন চরিত্র দুটির বর্ণনা। স্যার কবিতা পড়ার ঢঙে নাটকটি আমাদের উদ্দেশে পড়তেন, মনে হতো যেন আবৃত্তি করছেন। এভাবে একটি বিষয় নিয়ে অনর্গল বলতে পারাটা নিঃসন্দেহে তাঁর প্রজ্ঞার পরিচয়।
এবারে প্রফেসর কাশীনাথ থেকে কবি কাশীনাথে যাই। তাঁর অনেক ছাত্র ও প্রিয়জনদের ভাষ্যমতে, কবি কাশীনাথ রায়কে আবিষ্কার করা সত্যিই দুষ্কর ছিল। তিনি কখনোই নিজেকে কবি হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেননি। যখন জানতে পারলাম—স্যার কবিতা লেখেন—গেলাম তাঁর সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলতে। জিজ্ঞেস করতেই বললেন, লিখি, তবে বলার মতো তেমন কিছু না। বললাম, ছাপেন না কেন, স্যার? বললেন, ‘ওসব ছাপার যোগ্য না।’ পরে শুনেছি, লেখেন সেই সত্তরের দশক থেকে, কিন্তু প্রকাশ করেন না। এমনই নিভৃতে থাকতে ভালোবাসতেন কবি ও প্রফেসর কাশীনাথ রায়।
অনেকেই জেনে থাকবেন, ২০০৮ সালে তাঁর প্রথম কবিতার বই বের হয় ‘জীবনানন্দ দেখুন’ শিরোনামে। তারপর ২০১১ সালে বের হয় ‘আমি যাহা দিতে পারি’। ‘ডিভাইন কমেডি’ নামে একটি চমত্কার নাটকও আছে তাঁর, এটি প্রকাশিত হয় ২০০৭ সালে। তাঁর কবিতা বোদ্ধামহলে প্রশংসা কুড়িয়েছে। অনেকেই বলেছেন, এত ভালো কবিতা লিখেও কেন তিনি প্রকাশ করতেন না? মূলত ব্যক্তি কাশীনাথ রায়ের অনাড়ম্বর জীবনযাপন, তাঁর গভীর জীবনবোধ তাঁকে আর দশটা মানুষ থেকে আলাদা করেছিল। বর্তমান সময়ের ঘুণেধরা সমাজের সঙ্গে তাল মিলিয়ে তিনি চলতে চাননি। জীবনকে এগিয়ে নিতে এমন সিদ্ধান্তই তাঁকে আপাদমস্তক নিভৃতচারী করে তুলেছিল। আর এসব কারণেই কাশীনাথ রায় অপ্রতিম।
প্রফেসর কাশীনাথ রায়কে নিয়ে এমন স্মৃতিচারণামূলক লেখা হয়তো অনেকেই লিখেছেন এবং ভবিষ্যতে আরো লিখবেন, বোধ করি। এই লেখাটি স্যারকে নিয়ে লেখা অন্যান্য লেখার মতো হয়তো আপনাদের মন কাড়বে না, কিন্তু তা যদি আপনাদেরকে তাঁর সম্পর্কে আরো জানতে উস্কে দেয় তবে খানিক নিজেকে সার্থক মনে করব। কাশীনাথ রায়ের কবিতা থেকে কয়েক পঙিক্ত এ লেখার ইতি টানবে।
কি করে তোমাকে দুঃখ দিই বলো! কি করে তোমার
ভীষণ নরম হাতে রাখি এই দাহ-দীণ হাত!
পাছে বৃক্ষে থেমে যায় বায়ুর উদ্বিগ্ন অভিসার
পাছে কলঙ্কের নাম মিথ্যে হয়! মূর্খ পারিজাত
ফুটে ওঠে এ-শহরে! বরং প্রেমের নামে একা
তুমিই আঘাত ক’রো—দুঃখ দিও—দুঃখের সমান
গাঢ় কোন প্রেম আছে? দুঃখের অদেখা
কোন প্রেমগাথা আছে সুখের প্রমাণ?
(‘দুঃখ গাথা’, আমি যাহা দিতে পারি, কাশীনাথ রায়)
কাশীনাথ রায় [১৯৪৭—২০২১]